নির্বাচনের বাতাবরণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি

মাসকাওয়াথ আহসান

আসন্ন বাংলাদেশ নির্বাচন নিয়ে প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নিহত ভোটাধিকারের পুনর্জন্ম ঘটবে নাকি জনগণকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হবে! read more

Read More

তরুণদের মনে লোভের পোকা ঢোকালো কে ?

বিপথগামী হওায়ার অনুকুল পরিবেশ জিইয়ে রেখেছে কে?

তরুণদের মনন বৃদ্ধি ও বিকাশের নিরাপত্তার জন্য কয়টা সিসিটিভি ক্যামেরা আছে সমাজ ও রাষ্ট্রে ? নিখাদভাবে তরুণদের জন্য ভাবতে ভাবতে রাতের ঘুম হারাম করেছে এমন ব্যক্তি কে, কয়জন আছে ? বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে অদ্যবধি তরুণশক্তির পাড়া ডিমগুলো দিয়ে ওমলেট বানিয়ে কাটাঁচামচে কেঁটে গলায় নামিয়েছে কে?  তরুণদেরকে ক্ষমতার পাহাড়াদার বা লাঠিয়াল বাহিনী বানালো কে ?” জিন্স প্যান্ট,, টাইট গেন্জি,, কানে দুল,, হাতে চুরি সদৃশ রিং ও মোটরবাইককে তারুণ্য বলে বাজারে চালিয়ে দিচ্ছে কে ? উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর দেশটিতে কোটি সংখ্যক যুবক বেকার কেন ?” তরুণদের সামনে সাম্য,, ন্যায়বিচার,, সুষম উন্নয়নের উদাহরণ বেশি,, না খুব কম ?” সরকারি বেসরকারি চাকরি বা কর্মসংস্হানপ্রত্যাশী বেকার শিক্ষিত তরুণদের বয়স কিংবা কোটার বিধিনিষেধে ডান্ডাবেড়ি পরিয়েছে কে ?”
এ প্রজন্মের একজন তরুণ হয়ে এমন অসংখ্য কে বা কারাযুক্ত প্রশ্নমালা মনে জাগে সারাক্ষণ। কিন্তুু প্রশ্নমালা উত্থাপন ও উত্তরমালা পাওয়ার মঞ্চ কোথায় ?” স্বাধীণ দেশ আমার ! স্বাধীন নাকি গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মঞ্চ ! অথচ তরুণদের সর্বনাশের সমূহ কারণের শিকড় অনুসন্ধান ও উপড়ে ফেলার তাগিদ আছে কি কোথাও ?”  তাগিদ নেই একেবারে তাও নয়। তাগিদ আছে–” তরুণদের গ্লানি করার ,, সমালোচনা করার,, অতীতের তারুণ্যর গল্প শুনিয়ে বর্তমানকে বিদ্রুপ করার। তরুণদের মুল্যবোধের অবক্ষয়ের গল্প পাতায় পাতায় ছাপা হয়। কেন মা,, মাটি,, দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অনাচারের মহামারিতেও তরুণরা জাগে না তা নিয়ে আক্ষেপ হয়। তরুণরা কেন বারবার ডিম পাড়ছে না তা নিয়ে তিরষ্কার হয়। কিন্তুু তরুণদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত কোন প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা কারো কিংবা কোন মহলের কর্ণকূহরে পৌঁছে না। ষোল কোটি মানুষের দেশটিতে যদি বিরাট সম্ভাবনাময় অংশটির নাম হয়, “তরুণ ” তাহলে সে অনুপাতে কি এরা যত্ন পাচ্ছে ?  নাকি পাচ্ছে এতটুকু স্নেহের পরশ ? বৈজ্ঞানিক এমন কোন যন্ত্র যদি পরিমাপ করতে পারতো তরুণরা স্নেহের নামে কতটুকু অযত্ন অবহেলা পাচ্ছে বা ক্ষেত্রবিশেষ কারো স্বার্থের দাবার গুটি হচ্ছে, তাহলে সে যন্ত্রটিও বাংলাদেশের লম্বা গলাওয়ালাদের ধিক্কার জানাতো।
এই নিবন্ধকারও বয়সে তরুণ (৩৪)। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার প্রত্যন্ত বন্দরখড়িবাড়ি গ্রামে বাস। পিঠে নেই কোন রাজনৈতিক দলের সিল ছাপ্পর। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে দরিদ্রতার নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হতে হতে বেড়ে ওঠা। গার্মেন্টসে হেলপারি থেকে শুরু করে পানবিড়ির দোকানদারি,, রিক্সা চালানো,, মানুষের বাসায় লজিং থাকা,, পল্লী বিদ্যুতে ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্হা ব্র্যাকে চাকরি ইত্যাদি এমন কোন কায়িক বা মানসিক শ্রমের পথ নেই যেখানে সে চিহ্ন রাখেনি বা রাখছে না। কিন্তুু লোভ কিংবা মুল্যবোধের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে এমন চিহ্নও নেই ৫৬০০০ বর্গমাইলে। শুধুমাত্র শ্রমের বিনিময়ে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টাটুকু সবকিছু ছাপিয়ে জয় পেয়েছে। হাতের কাছে, চোখের কাছে বিপথে যাওয়ার লকলকে অফার কিলবিল করছে। কই পারেনি তো জীবনের সত্যকার গান থেকে তাকে ফেরাতে !  আজকের বাংলাদেশে এমন তরুণ কি বিরল ? নিশ্চয় নয়।” চোখের ভিতরের চোখটা খুলুন না  ;; দেখুন বাংলাদেশের অগণিত ঘরে ঘরে এমন  তরুণ আছে ও কেউ কেউ কুঁকরে আছে। কিন্তুু না, আপনারা সে সব দেখবেন না, দেখতে চাবেন না। আপনারা দু-চার, দশটা ঘুনে ধরা ( যে ঘুনটাও কারো না কারো সৃষ্ট) তরুণের নাম প্রমাণ হিসেবে হাতে ও ঠোঁটে রেখে সমগ্র অংশকে মন্দ বলতে অভ্যস্ততা লাভ করেছেন। রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজের কোন অংশ, কোন পেশায় র্দুবৃত্তায়ন হয়নি ?” পারছেন কি সে সব আঙ্গুল উচিঁয়ে বলতে ?” পারছেন না !” পারছেন শুধু তরুণদের বেলায় পঁচে গেছে,, পঁচে গেছে রব তুলতে !” আজকাল
লড়াইয়ে-সংগ্রামে,, গঠনে-নির্মাণে তরুণদের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় জরাগ্রস্হ,, বার্ধক্যওয়ালাদের কাছে। কিন্তুু ফলভোগের পুরো অধিকার বৃদ্ধদের। ক্রেডিট পকেটে তুলতে এক পা কবরে যাওয়া অশীতিপরও খাড়া।
তরুণরা দেশপ্রেমের সংজ্ঞা পাচ্ছে না। তাই দেশপ্রেম এখন যে প্রচার/বিজ্ঞাপণ চালাতে পারে তাঁর !” দেশপ্রেমিক তরুণরা নয়  ;; তরুণরা কাজের ছেলে বা শুধুমাত্র কর্মচারি।  ওদিকে দেশপ্রেমিকের পুরো দাবীদার বলে প্রচার চালাচ্ছে হোমরা–চোমরা পক্ষ। অথচ ঘোষণাবাজ দেশপ্রেমিক গোষ্ঠী নিজ দায়িত্বে একবারও জবাব দিবে না,, দিতে চাবে না, কিভাবে এত বিপুলসংখ্যক সম্ভাবনাময়,, সবুজ,, ভাবুক তরুণরা দেশপ্রেমিক খেতাব থেকে বঞ্চিত হওায়ার উপযুক্ত হলো ?”
তরুণদের মাঝে মা তুল্য দেশের প্রশ্নে বিভক্তি কোথা থেকে এলো ?” কেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেড়ে ওঠা একজন সদ্য যৌবন পাওয়া তরুণকে “খামোশ” বলে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে পরদেশের প্রতি অনুরাগের ভিত্তিহীন অভিযোগে ?” এ সংস্কৃতি দিয়ে কি তরুণদের বিকাশের গালে কষে থাপ্পর মারা হচ্ছে না ! কালা–ধোলা, ডাঙ্গর–বেটে,, মুসলিম–হিন্দু সব তরুণের রক্ত কি এক নয় ;; সবার বুক,, পেট কি একই বৈশিষ্ট্য বহন করে না ?” তাহলে বিভেদ,,বঞ্চনা,, বৈষম্য ও তারুণ্যকে জুতা মেরে গরু দান করে,, কি করে তারুণ্যর ডিম পাড়া আমরা আশা করছি ?” বেশ কয়েকবছর আগে এই নিবন্ধকার একটি বাংলা সিনেমা দেখেছিল। সিনেমার নাম–” শান্ত কেন মাস্তান ?” সিনেমায় নায়ক ছিলেন প্রয়াত মান্না। সিনেমায় নায়ক মান্না আর দশটা  স্বাভাবিক পরিবারের স্বাভাবিক গুন ও মুল্যবোধসম্পন্নই ছিল। কিন্তুু ভিলেনের দল একটি অশুভ সিস্টেম দিয়ে তাঁকে মাস্তানই বানিয়ে ছেড়েছিল। আজ বাস্তবের বাংলাদেশে তারুণ্যর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা তরুণরা কি বলতে পারছি–” আমরা কেন মাস্তান ?”
না।” কোন প্রশ্ন করা যাবে না কোথাও ।”
জবাব মুখস্হ রেখেছে উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষ ;; ব্যক্তিগত হতাশা,, বিচ্ছিন্ন ঘটনা,, উন্নয়নবিরোধী,, দেশবিরোধী প্রভৃতি।
এদেশের ভিতরে লক্ষ লক্ষ তরুণের বুকের আগ্নেয়গিরি অবলীলায় হয়ে যায় কারো কারো কাছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিভাবে তরুণরা তাহলে বোঝাবে–অবিচ্ছিন্ন ঘটনার রঙ কেমন ?” এতদসত্ত্বেও তো এক বুক বঞ্চনা, বৈষম্যে কাতর হয়ে, হাটুতে মুখ লাগিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে আছে লক্ষ লক্ষ তরুণ একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্নে।
সেখানেও হানা পড়েছে, চোখ পড়েছে। ভাল নেই।”
বুকে ভয় জারি রয়েছে কে,, কখন না জানি দেশবিরোধীর সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয় পিঠে।
তাহলে কি দেশপ্রেমিক হতে গেলে রাজনৈতিক রোবট হওায়া ছাড়া উপায় মিলবে না তরুণদের কপালে ?”
তাহলে তাঁরা সামনে দু”পা এগোবে কেমন করে ?  হয়তো সামনে দু”পা এগোনোর জন্য কখনও কখনও এক পা পিছানো যেতে পারে। কিন্তুু আমাদেরকে ; তরুণদের কত সহস্র পা পিছিয়ে দিচ্ছেন ? read more

Read More

জিগাতলাতে আজকে রবিবার যা হল তার একটুকরো অংশ: প্রত্যক্ষদর্শীর জবান

সকালে শাহবাগে প্রায় তিন হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিল অনুজদের উপর গতকাল সাইন্সল্যাব ও জিগাতলায় পুলিশি হামলার প্রতিবাদে। কিছুক্ষণ পর সেই জমায়েত যখন সাইন্সল্যাবের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার ডাক দেয় তখন কিছুক্ষণের মাঝেই স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দিলে সাইন্সল্যাবের মুখে সেটি ৫ থেকে ৬ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীর এক বিশাল মিছিলে পরিণত হয়। পুরো মিছিল খুবই শান্তিপূর্ণভাবে এগুচ্ছিল জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের দিকে। read more

Read More

এগুলো সাহসী তরুণদের অপমানের শামিল

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী যখন এরশাদীয় কায়দায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের ঘোষণা দিলেন তারপর বুধবার রাত থেকে যারা শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার, ক্লাসে ফেরার পরামর্শ বিতরণ করছেন তারা নিশ্চয় এখন বুঝতে পারছেন তাদের এইসব পরামর্শের তোয়াক্কা শিক্ষার্থীরা করেন না; তাদের পরামর্শ নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়নি – তাদের পরামর্শ চাইলে এই আন্দোলন হতো না| যারা এই জন্যে শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপত্তার’ অজুহাত খাড়া করছেন তারা বরঞ্চ যে বা যারা নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটাতে পারে তাদের মোকাবেলা করুন – এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কারণে নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটেনি| নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটেছে লেলিয়ে দেয়া পেটোয়া বাহিনীর কারণে| read more

Read More

মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াই

যারা বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করতে চান তারা মূলত রাষ্ট্রের যে সমস্ত অগণতান্ত্রিক আইন, বিধি, নীতিমালা, প্রশাসনিক, বিচারিক কাঠামো বিদ্যমান সেইগুলি পরিবর্তনের জন্য জনগণকে সংগঠিত করা এবং নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো বা রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করবেন। এই লক্ষেই আন্দোলন, সংগ্রাম এবং গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রীয় রূপান্তর ঘটানোর জন্য দেশব্যাপী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার কাজ হাতে নিতে হবে। read more

Read More

গুটেনবার্গের মুদ্রণালয়, স্বৈরতন্ত্র ও সৃষ্টিশীল ধবংসের ভয়

আলোকচিত্র ফ্রানসেসকো লোলি

১৪৪৫এ জার্মান শহর মেইঞ্জে জোহানেস গুটেনবার্গ নামের এক লোক একটা আশ্চর্য আবিষ্কার করলেন। আবিষ্কারটা হচ্ছে মুদ্রণালয়, যার টাইপগুলো ছিলো স্থানান্তরযোগ্য। এর আগ পর্যন্ত সারা দুনিয়ায় বইপত্র হয় স্ক্রাইবরা হাতে লিখে কপি করতেন, যা ছিলো খুবই ধীর ও পরিশ্রমসাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া, অথবা প্রতি পৃষ্ঠার জন্য আলাদা আলাদা কাঠের টুকরো ব্যবহার করে ব্লক-প্রিন্ট করা হত। বইপত্র ছিলো দুর্মূল্য। আর দুষ্প্রাপ্যও বটে। গুটেনবার্গের এই আবিষ্কার সবকিছু চিরতরে বদলে দিলো। বই আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ছাপা হতে লাগলো, বেশ সহজলভ্যও হয়ে উঠলো তা। read more

Read More

কেনো কোটার সংস্কার চাই, কেমন কোটার সংস্কার চাই

সারা পৃথিবীতে সরকারি চাকরিতে কোটা রাখা হয় বৈষম্যের প্রতিকার করার জন্য। অথচ এই দেশে কোটার ব্যবস্থাপনা বৈষম্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান সরকারি চাকরিতে কোটা ও মেধার অনুপাত ৫৬ বনাম ৪৪ শতাংশ। কোটার বরাদ্দ যথাক্রমে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পোষ্যদের ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, আদিবাসী ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ। ফলে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ পান মাত্র ৪৪ শতাংশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেছেন, ‘পৃথিবীর এমন কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কোটা মেধাকে ছাপিয়ে যেতে পারে। আমরা পারছি। অর্থাৎ উল্টো যাত্রায় আমরাই প্রথম।’ আমরা দেখলাম কোটা সংস্কার আজ জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। এই দাবির সপক্ষে সাধারণ ছাত্রজনতা রাজপথেও নেমে এসেছে। তবে এই দাবি নিয়ে আগানোর পথে আমাদের অবশ্যই একটি পরিবর্তনের রূপরেখা নিয়ে আগাতে হবে। বর্তমান কোটাবিন্যাসের ঠিক কেমন পরিবর্তন আমরা চাই, সেটি আমাদের পরিষ্কার করে জানাতে হবে। নামকাওয়াস্তে সংস্কার যেমন আমরা মেনে নিতে পারি না, তেমনি সকল কোটা বাতিলের যে কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। পরিষ্কার এবং শক্তিশালী সংস্কার আমাদের প্রয়োজন। সবার প্রথমেই যে কোটার সবচেয়ে বড় সংস্কারের কথা বারবার বলা হয়েছে, সেটি হলো মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এমনকি মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটার শতকরা হার কমিয়ে আনার সুপারিশ করেছে খোদ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। কমিশন মনে করে, সরকারি সার্ভিসের গতিশীলতা আনতে, কোটাপদ্ধতি ও কোটাবিন্যাস পদ্ধতির পুনর্বিবেচনা ও পুনঃপর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ১০০ ভাগের ৩০ ভাগ বরাদ্দ নিঃসন্দেহে অনেক বেশি, তবে সেটিই মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে একমাত্র চিন্তার বিষয় নয়। এর বাইরেও রয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুবিধা লুটতে চাওয়া ক্ষমতাবান গোষ্ঠীকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। ১৯৮৬ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকা অনুসারে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৮৩৩, অথচ বর্তমান সরকারের প্রথম দিকের একটি তালিকায় ২ লাখ ২ হাজার ৩০০ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রকাশিত হয়। তাঁদের মধ্যে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন—এই মর্মে আপত্তি দাখিল হয় ৬২ হাজার। এইভাবে কোটার লোভে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে তালিকা ভরানো কেবল দুঃসহনীয় একটি দুর্নীতিই নয়, বরং আত্মত্যাগী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চরম অবমাননাও বটে। যেকোনো কোটার ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানের দুর্নীতির উপায় থেকে যায়। যেহেতু পিএসসির মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডগুলো সাধারণত একজন পিএসসি সদস্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং যেহেতু পিএসসি সদস্য হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের আত্মীয়স্বজন নিয়োগপ্রাপ্ত হন, কাজেই তাঁরা যে মৌখিক পরীক্ষায় সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করবেন, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। এমতাবস্থায় যদি মৌখিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোটার হিসেবে ক্ষমতাবানদের দাপট টিকে থাকে, তাহলে সাধারণ ক্ষমতাহীন মেধাবী ছাত্রদের জনপ্রশাসনে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে আসে। আয়ের হিসাবে কোটার হিসাব হলে এই কোটা নিয়ে দুর্নীতি করার সুযোগটি কিছুটা হলেও সংকুচিত হয়ে আসে। আয়ের হিসাব ব্যতীত দ্বিতীয় যে হিসাবটি মাথায় রাখতে হবে, সেটি হলো বেসরকারি খাতে বৈষম্যের পরিমাপ। যদি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সামাজিক দীনতার কারণে বেসরকারি খাতে চাকরি পেতে অথবা স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করতে নির্দিষ্ট কিছু বাধার সম্মুখীন হয়, তবে তাদের জন্য কোটার সুবিধা রাখা যেতে পারে। এমন কাঠামোগতভাবে বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিবাসী, প্রতিবন্ধী এবং প্রত্যন্ত জেলার বাসিন্দারা, যারা সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধার থেকে বঞ্চিত হন। তাঁদের জন্য ৪ শতাংশ করে মোট ১৬ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রেখে দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের জন্য ৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হলে বর্তমান কোটাব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি গণমুখী এবং কার্যকরী একটি বিন্যাসের দিকে আমরা আগাতে পারব। আয়ের হিসাব দিয়ে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তদের হিসাব করলে এমন বিন্যাসটিই এসব জনগোষ্ঠীর জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা। নিজেদের হিসাব অনুযায়ী সরকার এর মাঝে চাইলে কমবেশি করতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই সব মিলিয়ে মোট কোটার পরিমাণ ২০ শতাংশের বেশি রাখা সমীচীন হবে না। কোটার বাইরে থাকা উচ্চবিত্ত আর উচ্চমধ্যবিত্ত তরুণেরা সরকারি চাকরি চাইলে অবশ্যই করতে পারবে, তবে তাদের মেধার লড়াইয়ে টিকে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। কোটাব্যবস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি। দেশের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে আজ বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪০ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয় (নট ইন এমপ্লয়মেন্ট, এডুকেশন অর ট্রেনিং)। জাতিসংঘঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন করতে হলে আমাদের এই হার কমিয়ে আনতে হবে। কোটাব্যবস্থার সংস্কার হতে পারে সেই লক্ষ্যে একটি পদক্ষেপ। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলি খান রেগুলেটরি কমিশনের প্রধান হিসেবে ২০০৮ সালের মার্চ মাসে কোটাব্যবস্থা নিয়ে একটি গবেষণাকর্ম সম্পাদন করেছেন। এতে বলা হয়েছে, মেধার ভিত্তিতে মাত্র শতকরা ৪৪ জনকে নিয়োগ সংবিধানসম্মত নয়। যে বৈষম্যহীন সোনার বাংলা গড়ার জন্য একাত্তর সালে ৩০ লাখ শহীদ জীবন দিয়েছেন, বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসা কোটাব্যবস্থার জালে পড়ে তার আজ নাভিশ্বাস উঠেছে। এই দুরবস্থার থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের এমনভাবে কোটাব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে করে সরকারি বৈষম্যের হাতিয়ার না হয়ে বেসরকারি বৈষম্যের প্রতিকার হয়ে ওঠে কোটা। আয়ের হিসাব, বৈষম্যের হিসাব আর সীমিত শতকরার হিসাবই সেটি করবার জন্য সর্বোত্তম উপায়।

অনুপম দেবাশীষ রায়, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াশিংটন ডিসি। read more

Read More