রাষ্ট্রের মিথ্যা উৎপাদন প্রকল্প

সামান্তা শারমিন

রাষ্ট্র শব্দটা কঠিন হলেও এর কাজটা খুবই সহজ। কিন্তু আমাদের কানে রাষ্ট্র শব্দটা খটমটে শোনানোর মূল কারণ সুবিধা ও ভীতি। আর এ দুটো তৈরি করার মূল উপায় হলো মিথ্যা। রাষ্ট্র আসলে একটি ব্যবস্থাপক পক্ষ যা এই সমাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে (জবাবদিহিতার)। অন্যভাবে ভাবতে গেলে এও বলা যায় সমাজের আস্থাভাজন, বিশ্বাসী ও সর্বদা প্রস্তুত ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের অংশ হবেন। তবে এতে করে তাদের ব্যক্তিক সততার উপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে হয় বলে আমি রাষ্ট্রের পদধারিদের ভাবতে চাই চাকরিজীবী বা পেশাজীবী হিসেবে। কারো বৈজ্ঞানিক কাজ-কারবার পচ্ছন্দ হলে সে বৈজ্ঞানিক হয়। সেবা করতে চাইলে ডাক্তার হয়। ছবি আঁকতে চাইলে শিল্পী হয় এবং এরা সবাই মিলে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা পূরণ করেন। তেমনি কেউ যদি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রত্যাশার ভার সামলাতে ভালোবাসেন তাহলে তিনি হবেন সরকারি/ রাষ্ট্রীয় চাকরিজীবী। read more

Read More

মার্ক্স ও মানুষের মুক্তির সংগ্রাম

পারভেজ আলম

মার্ক্সের লেখায় প্রলেতারিয়েতদেরকে ঐতিহাসিক কর্তা হিসাবে দেখা হয়েছে তাই তাদের মুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, মানব মুক্তির জন্যে। কিন্তু প্রলেতারিয়েত মাত্রই কারখানার শ্রমিক না, অথবা শ্রমিক মাত্রই প্রলেতারিয়েত (শ্রেণী সচেতন অর্থে) না। মার্ক্সের লেখায় মানুষ মাত্রই শ্রমিক, যেহেতু সে শ্রমের মাধ্যমেই সবকিছুর পরিবর্তন করে, এবং মানসিক ও দৈহিক উভয় শ্রমকেই মার্ক্স সমান ভাবে শ্রম হিসাবেই দেখেছেন। যেমন মার্ক্স তার ‘পুঁজি’তে পণ্য উৎপাদন এবং ভাষা উৎপাদনকে একি ধরণের (সিমিলার) সামাজিক উৎপাদন বলে অভিহিত করেছেন। মজদুর, শ্রমিক, প্রলেতারিয়েত ইত্যাদিকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। যদিও একজন ব্যক্তি একিসাথে তিনটাই হইতে পারে, কিন্তু মার্ক্সের লেখায় এই তিনটা আলাদা ক্যাটাগোরি। কারখানার শ্রমিক ও কৃষকের সাথে মজদুর এবং প্রলেতারিয়েতকে পুরোপুরি গুলিয়ে ফেলাটা মার্ক্সের সরল পাঠ বলে মনে করি। read more

Read More

চিন্তাপরাধ, মগজে কারফিউ, কিম্বা মাস্টারের রিমান্ড

বখতিয়ার আহমেদ ১৯২৮ সালে, মুসোলিনির মালিকানাধীন ইটালিতে, আন্তনিও গ্রামসিকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর যুক্তি দিতে গিয়া পাব্লিক প্রসিকিউটর, মানে সরকারী উকিল, বলছিলেন ‘উনার মগজটার কাজ-কারবার বিশ বছরের জন্য থামায় রাখা দরকার’। ১৯২৬ এ অ্যারেস্ট হওয়া এই কুঁজো কম্যুনিস্টকে মুসোলিনির আদালত ১৯২৮ সালে ঠিক বিশ বছরের সাজাই দিছিলেন, প্রচলিত আইন-কানুনকে প্রায় কাঁচকলা দেখিয়ে। বিশ বছর তিনি বাঁচেন নাই। পরের ১১টা বছর এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে, জটিল সব অসুস্থতার চিকিৎসা না পেয়ে, ১৯৩৭ সালে, ৪৬ বছর বয়সেই মরে গেছিলেন গ্রামসি। মরার আগে তার এই ‘অপরাধী মগজ’ তিরিশটা খাতা আর হাজার তিনেক পৃষ্টার খোলা কাগজে নিজের চিন্তাগুলান ইতঃস্তত লিখে রাখছিলেন। সেই খাতা আর পাতাগুলান গোপনে কারাগার থেকে বাইরে চলে আসে গ্রামসির বোনের উদ্যোগে। ১৯৫০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কারাগার ডাইরিগুলান’। ১৯৭০ সালে প্রথম ইংরেজি অনুবাদ। আর তিনি হয়ে উঠেন গত শতকের সবচে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তুকদের একজন। কারাগার কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করবার জন্য গ্রামসি প্রচলিত মার্ক্সীয় পরিভাষাগুলান এড়ায় যাইতেন। সেই করতে গিয়ে দেখা গেল তিনি মার্ক্সীয় চিন্তার কিছু গোড়ার গলদেই হাত দিয়ে ফেলেছেন। মানুষকে অর্থনৈতিক জীব ধরে নিয়ে চিন্তা করা থেকে বেরিয়ে তার চৈতন্যগত স্বত্ত্বা নিয়ে ভাবার ক্ষেত্র তৈরী করে ফেলেছেন। মুসোলিনির স্বৈর-সন্ত্রাসের নির্মম ক্ষত শরীরে নিয়েও স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে তিনি নিপীড়নকে না, চিহ্নিত করলেন স্বৈরশাসনকে স্বাভাবিক আর অনিবার্য ভাবার পাব্লিক কমনসেন্সকে। গ্রামসিরও চারশ বছর আগে ফরাসি চিন্তুক আতিয়েনে দে লা বোয়েতিও একই মীমাংসায় আসছিলেন যে পাব্লিকের আনুগত্যপ্রবণ ননসেন্স কমনসেন্স শুধু স্বৈরতন্ত্রের উর্বর জমিই না, সাথে সার-পানি-কীটনাশক হিসেবে, কিম্বা স্বৈরাচার বিরোধী আগাছা দমনের কাজেও লাগে। আম-জনতার আনুগত্য কিম্বা নিরাসক্তি স্বৈরশাসনাকূল পরিস্থিতি তৈরী করে যেকোন শাসনকেই স্বৈরতন্ত্র করে তুলতে পারে। ১৯৪৯ সালে লেখা ‘কমুনিজম বিরোধী’ লেখক জর্জ ওরয়েলের উপন্যাস ‘১৯৮৪’তে স্বৈরাচারসেবী পাব্লিকের গণগান্ডুগিরির একটা গা শিউরানো গল্প আছে। বিগব্রাদারের শ্বাসরোধ করা শাসনে অরয়েল কল্পিত রাষ্ট্র ইউরেশিয়ার এক সরকার দলীয় কর্মী ঘুমের ঘোরে গালি দিয়েছিলেন বিগব্রাদারকে। তার আদরের মেয়ে, সরকারের কিশোর ব্রিগেডের নিবেদিত কর্মী, সেটা শুনতে পেয়ে ‘চিন্তা পুলিশে’র হাতে ধরিয়ে দেয় বাবাকে। চিন্তা পুলিশ তাকে ধরে চিরতরে গুম করে দেয়ার জন্য নিয়ে যাওয়ার পথে দেখা হয়ে যাওয়া প্রতিবেশীর কাছে বিগব্রাদারের প্রতি নিজের মেয়ের আনুগত্য, যেটা নিজের বাপকেও ছাড় দেয় না, সে নিয়ে ব্যাপক গর্ব করে মরার জন্য রওনা দেন এই লোক। এতো কিছু মাথায় আসতেছে আজকে শুধু ফেসবুক স্ট্যাটাসে সরকার সমালোচনার দায়ে গ্রেফতার হওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুলকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়ার খবর শুনে। কিছুতেই এসব ক্রাইম থিংকিং ঠেকায় রাখতে পারছি না। কিন্তু পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ততোধিক পাব্লিক শিক্ষক হিসেবে আমি আজকে ক্লাস নিচ্ছি, নির্বিকারভাবে কাজ করছি, যেন সবকিছু স্বাভাবিক আছে। কয়েক ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক ডজন শিক্ষক সমিতি করা কয়েক হাজার শিক্ষক মাইদুলকে নিয়ে নীরব। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া। বাকী সবাই আছেন স্বাভাবিক কর্মতন্দ্রায়। স্বায়ত্ব-শাসনের সুরক্ষায় চিন্তার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা পাওয়া শিক্ষকেরা যখন স্বেচ্ছায় সরকারী সার্বজনীন কমনসেন্স হিসেবে সুযোগ-সুবিধার আরাম কিম্বা আরাম হারাম হওয়ার আশংকাকে আত্মস্থ করেন, তখন সমস্যার শেকড় শুধু সরকার কিম্বা শাসন-প্রণালীতে না, স্বৈরতন্ত্রে স্বীয়স্বার্থ-নিহিত থাকা এই সব স্বেচ্ছাসেবীদের কান্ডজ্ঞানের নীচেও ঢুকে আছে। উই ব্লাডি ডিজার্ভ ডেসপটস। উই ডিজার্ভ টু লিভ অ্যান্ড ডাই ইন দিস ডিপ শিট। ফেসবুকে স্ট্যাটাসে প্রকাশিত চিন্তাই যদি গ্রেফতার করবার মতন যথেষ্ট বড় অপরাধ হয়, তাহলে রিমান্ডে নিয়ে কি করা হবে? মাইদুলের মগজের ফরেনসিক টেস্ট হবে? তার মাথায় আর কি কি চিন্তাপরাধ আছে সেটা কোন ‘যন্তর-মন্তর’ ঘরে নিয়ে পরীক্ষা করা হবে? শেষমেষ কি কোন মস্তিষ্ক প্রক্ষালন যন্ত্রে মগজ ধোলাই হবে? মাইদুলের মগজের বিরুদ্ধেও কী রায় হবে? রায় দিয়ে কি চিন্তা থামানো যাবে? চিন্তার ফৌজদারি করে কারো মর্যাদা রক্ষা করা যাবে? শাসন কিম্বা শাসানি দিয়ে কোথাও কখনো কারো সম্মান কী রক্ষা করা গেছে? আইন কিম্বা শাস্তি দিয়ে কারো মর্যাদা রক্ষার দরকার যখন পড়ে তখন আসলে তাঁর মর্যাদার কতটুকুই বা অবশিষ্ট থাকে? মাইদুল সমাজতত্ত্বের শিক্ষক। নিজে সমাজবিদ্যার ছাত্র বলেই জানি মাইদুলের মাথায় সমাজ-সরকার-রাষ্ট্র-রাজনীতি নিয়ে শত-সহস্র সংশয়ী চিন্তা থাকতে পারে। দলীয় মতাদর্শ কিম্বা তৎপ্রসূত মাখনের স্টেকে আগ্রহ না থাকলে যে কোন সিন্সিয়ার সোশাল সাইন্টিস্টের মাথাতেই হাজারো মতামত থাকতে পারে যেগুলান সরকার কিম্বা রাষ্ট্র বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ম্যাক্স বেবার, যাকে ছাড়া দুনিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই আধুনিক সমাজবিদ্যা পড়ানো হয় না, তিনি মনে করতেন রাষ্ট্র মূলত একটা সন্ত্রাসী সংস্থা যার বৈধ সন্ত্রাসের একচেটিয়া কারবার আছে। সরকারের নজরদারি, খবরদারি, দখলদারি নিয়ে গবেষণা দুনিয়ার সব দেশেই চর্চিত সমাজবিদ্যা কিম্বা মানববিদ্যা চর্চার অংশ। কোন আইডিয়া, অপিনিয়ন কিম্বা অ্যানালাইসিস কোন সরকারের বিরুদ্ধে গেলেই যদি অপরাধ হয়ে যায়, তাহলে তো সমাজবিদ্যা কিম্বা মানববিদ্যা মাত্রই অপরাধী বিজ্ঞান। সরকারের সমালোচনা অপরাধ হলে তো সমাজবিদ্যার বইপত্র মাত্রই ক্রাইম থিঙ্ক, ক্লাস নেয়া মাত্রই থট ক্রাইম। ভিন্নমত অপরাধ হলে তো সমাজবিদ্যার সিন্সিয়ার মাস্টার মানেই চিন্তাপরাধের মাস্টার মাইন্ড! নাকি মাস্টারিটা নামমাত্র করে, মাস্টারের মর্যাদাবোধকে মুক্তচিন্তার কাজে না লাগিয়ে মোসাহেবির কস্টিউম না বানালে যে কেউ এখন যে কোন সময় জেলে যেতে পারেন? মাস্টারদের মগজে যেভাবে কারফিউ জারি করা হচ্ছে, মাস্টারেরা যেভাবে সেটা হামাগুড়ি দিয়ে মেনে চলছেন, ম্যাক্সিমাম সতর্কতায় মেইন্টেন করছেন, কিম্বা আরো একধাপ এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত দমানোর পেয়াদা বনে যাচ্ছেন তাতে মাইদুলের মতন হাতেগোনা কয়েকজন মাস্টারকে আর জেলে নিয়ে কাজ কি? বিশ্ববিদ্যালয়কে তো সরকারসেবী সংখ্যাগুরু শিক্ষকেরা চিন্তার কারাগার বানিয়েই ফেলেছেন। কিছু আন্তর্জাতিক বদনাম ছাড়া তো এসবে আমি সরকারের আর কোন লাভ দেখিনা। আর যদি এইটা মাইদুলের মতন কামাই কিম্বা কামিয়াবির কমনসেন্সের বাইরে থাকাদের ভয় দেখানোর জন্য হয়, তাহলেও বেশি বাড়াবাড়িই হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা করবার ক্ষমতা, কিম্বা সাধারণকে সরকারবিরোধী শিক্ষা দেয়ার ক্ষমতা এই গুটিকয়েক মাস্টারের নাই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে পাব্লিকের কোন মাথাব্যাথা না থাকলে এই মাস্টারদেরও বড় কোন জানবাজির দায় নাই। বড়জোর উনারা পাবলিকের দেয়া বেতনের দায় মেটাতে মাস্টারিটা সিন্সিয়ারলি করার চেষ্টা করতে পারেন। কপালের ফেরে বিজনেস কিম্বা ন্যাচারাল সাইন্সের মাস্টার না হয়ে আর্টস কিম্বা সোশাল সাইন্সের মাস্টার হলে স্রেফ সিন্সিয়ার মাস্টারির দায়েই মাঝে-মধ্যে মামলা-মোকাদ্দমা, জেল কিম্বা ফৌজদারি মারধরের শিকার হইতে পারেন। কি আর করা! মাস্টারি, মগজ, আর মতামত আলাদা আলাদা পাত্রে রেখে, চিন্তা-ভাবনা সন্তর্পনে ঢেকে-ঢুকে চলতে না পারলে ঝামেলা কিছু তো পোহাতেই হবে এই স্বৈরশাসনাকূল সোশাল ওয়েদারে।

Read More

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক– ন্যায়বিচারকে ঘরে নিয়ে আসুন, শহীদুল আলমকে মুক্ত করুন

শহীদুল আলমের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে তা লজ্জাজনক। আমরা ওঁর মুক্তি দাবি করছি। সেই সঙ্গে যে কথাটার উপর আমি জোর দিতে চাইতা হল, ওঁর মত একজন মানুষের কণ্ঠ রোধ করলে রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করা হয়। শহীদুল আলমের মত শিল্পী বা বুদ্ধিজীবীর বাক-স্বাধীনতা হরণ করলে রাষ্ট্রীয় বিবেকের মৃত্যু ঘটে। সৃজনশীল শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব গঠনমূলক সমালোচনা করা যাতে রাষ্ট্র খাঁটি গণতন্ত্র হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্র যখন এমন আইন বানায় যে নিজের দায়িত্ব পালন করলেশাস্তি পেতে হয়, তখন সেই কাজটা করা অসম্ভব হয়ে যায়। read more

Read More

সুন্দরী প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি

ফাহমিদুল হক ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যায়, টিভি চ্যানেলগুলো ব্রাউজ করতে করতে, চ্যানেল আইতে একটা লাইভ প্রোগ্রামে নজর দিতেই দেখলাম, এক সুন্দরী প্রতিযোগিতা সেটা। একজন নারী-এ্যাঙ্কর দর্শকদেরও রায় নিচ্ছেন, কে হবেন সেরা সুন্দরী। বিরাট দর্শকসমাগম, দর্শকদের খানিক মতামত নিয়ে অবশেষে একজনকে সেরা সুন্দরী ঘোষণা করা হলো, বিজয়-মুকুট পরিয়ে দেয়া হলো। এখন তো ট্যালেন্ট হান্ট আর বিউটি কনটেস্টের ছড়াছড়ি — সুপারস্টার, ফটোজেনিক — এরকম নানা নামে বিউটি কনটেস্ট চলছে। এসব আয়োজনে থাকে কোনো একটা মিডিয়া হাউস, সঙ্গে থাকে একটা কর্পোরেট ব্র্যান্ড, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে থাকে একটা মার্কেটিং কোম্পানি। যেমন সবচেয়ে আলোচিত ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায় যুক্ত থাকে ইউনিলিভার, চ্যানেল আই ও এশিয়াটিক মার্কেটিং লি.। ইহা কোন প্রতিযোগিতা, এরকম আগ্রহ থেকে একটু মনোনিবেশ করলাম। নির্বাচিত সেই সুন্দরী হলেন সেরা ‘আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী’। সুন্দরীর টাইটেল বেশ কৌতূহলোদ্দীপক, তিনি প্রিয়দর্শিনী কিন্তু আদিবাসী! যাহোক এসব প্রতিযোগিতায় যেহেতু আগ্রহ ও আকর্ষণ কম থাকে আমার, তাই অন্য কোনো চ্যানেলে লাফ দিলাম। লাফিয়ে লাফিয়ে ক্লান্ত হয়ে, অবসাদগ্রস্ত হয়ে টেলিভিশন বন্ধও করলাম। তবে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় আমার আগ্রহ কম থাকলেও, এর পেছনের রাজনীতিকে বুঝতে অনাগ্রহ নেই আমার। তাই টেলিভিশন বন্ধ করার পরও সেদিন রাতে ঘুমাবার এবং পরদিন মাঝে মাঝেই মনে এই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল যে, আদিবাসীদের মধ্য থেকেও সেরা সুন্দরী নির্বাচনের প্রয়োজন কেন পড়ে? পরদিন সকালে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের শিরোনাম দেখলাম: ‘আদিবাসী তরুণ-তরুণীদের নাচে-গানে মুখরিত সৈকত’। সেই প্রতিবেদনে অবশ্য ‘আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী’ সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাওয়া গেলনা। জানা গেল, সেটা ছিল মূলত আদিবাসী মেলা। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ও চ্যানেল আইয়ের যৌথ উদ্যোগে এই আয়োজন ছিল দ্বিতীবারের মতো। ২০০৯ সালে প্রথম আদিবাসী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতিনিধিরা ঐ মেলায় অংশ নেয় এবং ‘নাচে-গানে সৈকত মুখরিত’ হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেছিলেন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, চ্যানেল আইয়ের শীর্ষ দুই কর্তা ব্যক্তি, স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে ‘এক্সোটিক ডেস্টিনেশন’ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আদিবাসীদের এই সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশকে সাদা চোখে সদর্থক দৃষ্টিতে দেখার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দু’টি বিষয় আমাকে আরও ভাবিয়ে তোলে, ইস্যুর গভীরে নামতে উস্কে দেয় — প্রথমত, ঐ প্রশ্নটি মনে ঘুরপাক খায় যে কেন আদিবাসীদের মধ্য থেকেও সুন্দরী বাছতে হয় এবং দ্বিতীয়ত, দুই কলামের আদিবাসী মেলার সংবাদের পাশেই প্রথম আলোতে প্রকাশিত আরেকটি এক-কলাম সংবাদ: ‘মন্ত্রণালয়ের গোপন চিঠি: উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করার অপতৎপরতা চলছে’। কী আছে ঐ এক-কলামের সংবাদে? সেখানে বলা হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্রসচিব ও তিন পার্বত্য জেলা প্রশাসককে দেওয়া গোপন চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘উপজাতীয় কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ এমনকি সাংবাদিকেরাও ইদানীং উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে উপজাতি না বলে আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করছেন। বিভিন্ন এনজিও, বিদেশি সংবাদমাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ ঐ ব্যক্তিবর্গের সহাযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে’ (প্রথম আলো, ১৩ ফেব্র“য়ারি, ২০১০, পৃ ২১)। আদিবাসী মেলার সংবাদের একেবারে পাশ ঘেঁষে প্রকাশিত এই সংবাদ দগদগে বৈপরীত্য নিয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়। এই ‘গোপন সংবাদ’ আমাদের অবহিত করছে সরকার ও আমলাতন্ত্র আদিবাসীদের কী দৃষ্টিতে দেখে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ও তার আমলাতন্ত্র সংখ্যালঘুদের সাধারণ নাগরিকের স্বীকৃতি দিতে কীরকম সংরক্ষণবাদী তা স্পষ্ট হয় এই সংবাদে। ১৯৯৭ সালের চুক্তির ন্যূনতম বাস্তবায়ন এত বছরেও কেন হচ্ছে না, তারও একটা ব্যাখ্যা এই মানসিকতার প্রকাশের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সংখ্যালঘুদের অধিকারের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকারের অবস্থান তেমন হেরফের হয়না। কিন্তু সেই সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান পর্যটন করপোরেশন যখন আদিবাসী মেলায় যুক্ত হয়, তখন এটাও স্পষ্ট হয় যে এটা কোনো আদিবাসী-দরদী অনুষ্ঠান নয়, বরং আদিবাসীদের জাতিবৈচিত্র্য, তাদের নৃত্য-গীত, তাদের জীবন-যাপন-সংস্কৃতি এখানে ‘এক্সোটিক কমোডিটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশি-বিদেশি সম্ভাব্য-পর্যটকদের কাছে। চ্যানেল আইয়ের পৌরহিত্যে ‘আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী’ বাছাবাছিও, সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে প্রাথমিক যে অভিযোগ — নারীকে পণ্যকরণ — তার সঙ্গে বাড়তি মাত্রায় হাজির হচ্ছে। একে বলা যায় আদিবাসী নারীর পণ্যকরণ হিসেবে। দ্বিস্তরের এই পণ্যকরণ প্রক্রিয়ায় চ্যানেল আই ও পর্যটন কর্পোরেশন উভয়কেই দায়ী করতে হয়। তবে প্রথম স্তরের পণ্যকরণ প্রক্রিয়া, সুন্দরী-প্রতিযোগিতা নিয়ে আরেকটু বিশদ বাগ্বিস্তার ঘটাতে চাই। ১৯২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক সিটির হোটেলসমূহের কর্তৃপক্ষরা হোটেলগুলোতে ভ্রমণকারীদের আরও অধিক সময় আটকে রাখার মার্কেটিং উপায় হিসেবে মেয়েদের সুইমস্যুটনির্ভর একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এটাই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আদি নিদর্শন। এরপরে নারীর সৌন্দর্য ও শরীরনির্ভর প্রতিযোগিতার বুম হয়। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা হতে থাকে। এরপর একে একে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রথম সুন্দরী প্রতিযোগিতা শুরু হয় মিস ওয়ার্ল্ড (১৯৫১ সালে), মিস ইউনিভার্স (১৯৫২ সালে), মিস ইন্টারন্যাশনাল (১৯৬০ সালে) নামে। এইসব বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য জাতীয় প্রতিযোগী নির্বাচনের জন্য আবার জাতীয় পর্যায়ে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা হয়, ভারতে যেমন আছে ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’। তবে মিস ওয়ার্ল্ড বা মিস ইউনিভার্সের জাতীয় প্রতিনিধি নির্বাচনই তো মূল কথা নয়, পণ্যের প্রসার-প্রচারের জন্য কর্পোরেশনগুলোর প্রতিনিয়ত দরকার হয় সুন্দর দেহের নতুন নতুন নারীমুখ, এজন্য নিয়মিতভাবে এইসব প্রতিযোগিতার আয়োজন চলে। একই নারী(দেহ) র‌্যাম্প, সিনেমা, সিরিয়ালে যুক্ত হয়ে তারকা-ইমেজ বলবৎ রাখে এবং পণ্যের মডেলিং-এ নারীর বিক্রিমূল্য অটুট রাখে। তাই ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’ ছাড়াও আমরা দেখি ‘সানন্দা তিলোত্তমা’ প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশে যেমন রয়েছে ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতা। আগেই বলেছি যে এইসব প্রতিযোগিতায় প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকে একটি মিডিয়া হাউস। ফেমিনা হলো ভারতের অন্যতম বৃহৎ টাইমস অব ইন্ডিয়ার অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান। এইসব সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজকরা ‘নারীকে বস্তুকরণ’-এর অভিযোগ এড়াতে অন্তঃত দু’টি বিষয় সামনে এনে অভিযোগের ঘায়ে মলম দিতে চায় — প্রথমত, এটি নারীর ক্ষমতায়ন ঘটায়; দ্বিতীয়ত, এখানে দৈহিক সৌন্দর্যই মূলকথা নয়, তার বুদ্ধিমত্তা বা ট্যালেন্টই তাকে জিতিয়ে দেয়। এই আলোচনায় ফিরে আসা যাবে, তার আগে আমি সুন্দরী প্রতিযোগিতার পেছনের যে রাজনৈতিক-অর্থনীতি, সেদিকে আলোকপাত করতে চাই। ভারতীয় নারীরা একসময় বিশ্বসুন্দরীর খেতাব পাওয়া শুরু করেন এবং পেতেই থাকেন। এযেন সুন্দরী হবার জোয়ার, ভারতীয় নারীরা হঠাৎ করে যেন সুন্দরী হয়ে গেছেন। ১৯৯৪ সালে সুস্মিতা সেন মিস ইউনিভার্স হন এবং ঐশ্বরিয়া রাই মিস ওয়ার্ল্ড হন। এরপর ডায়ানা হেইডেন মিস ওয়ার্ল্ড হন ১৯৯৭ সালে। যুক্তা মুখী মিস ওয়ার্ল্ড হন ১৯৯৯ সালে। ২০০০ সালে মিস ইউনিভার্স হন লারা দত্ত এবং মিস ওয়ার্ল্ড হন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। ১৯৯৪ সালের আগে একমাত্র ভারতীয় বিশ্বসুন্দরীকে (রিটা ফারিয়া) দেখা যায় বহু পূর্বে ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৬-১৯৯৪ সময়কালে, ২৮ বছরে কোনো ভারতীয় বিশ্বসুন্দরী পয়দা হননি, কিন্তু ১৯৯৪-২০০০ সময়কালে, ৬ বছরে আমরা পাচ্ছি ৬ জন বিশ্বসুন্দরীকে। আবার ২০০০ সালের পর থেকে ৯ বছরে আর একজনও বিশ্বসুন্দরীর খেতাব পেলনা ভারত থেকে। নব্বই দশকে ভারতে বিশ্বসুন্দরীদের এই সমাগমের পেছনের রাজনৈতিক-অর্থনীতি হলো, নরসীমা রাওয়ের সরকার থেকেই একসময়ের-সোভিয়েত-ঘেঁষা ভারত অর্থনৈতিক উদারীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে যে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া তাতে বহু-ভোক্তার দেশ ভারত একটা বিরাট বাজার হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই বাজারে মাল বেচতে প্রয়োজন একগুচ্ছ সুন্দরী, যারা পণ্যের বহিরঙ্গের পণ্য হিসেবে বিকোবেন। সেই সুন্দরীকে হতে হবে অবশ্যই স্থানীয় — থিঙ্ক গ্লোবালি, এ্যাক্ট লোকালি — এই সমীকরণে। আর এক ভারতীয় বিশ্বসুন্দরী দিয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল বাজারে প্রবেশ সম্ভব। সুস্মিতা-ঐশ্বরিয়া-প্রিয়াঙ্কা তো কেবল ভারতীয় আইকন নন, তারা দক্ষিণ এশীয় আইকন হয়ে ওঠেন বিশ্বসুন্দরী খেতাব পাবার সঙ্গে সঙ্গে। আরেকটি মজার রাজনীতি হয়েছে মুসলিম দুনিয়া নিয়ে। অপেক্ষাকৃত সংরক্ষণবাদী হিসেবে পরিচিত মুসলিম দেশগুলো থেকে বিশ্বসুন্দরী দেখা যায়না। তবে ২০০১ সালে টুইন-টাওয়ারে হামলার পরে যখন পশ্চিমা বিশ্বের কাছে মুসলিম-আইডেন্টি একটা রেসিস্ট্যান্স বা বিরোধী-পক্ষ হিসেবে হাজির হয়, তার ঠিক পরের বছরেই আমরা দেখতে পাচ্ছি মুসলিম দেশগুলো থেকে বিশ্বসুন্দরী খেতাব দেয়া হয়েছে। ২০০২ সালে মিস ওয়ার্ল্ড হন তুরস্ক থেকে এবং মিস ইন্টান্যাশনাল হন লেবানন থেকে। ব্যাপারটা কাকতালীয় ভাবলে ভুল হবে। বরং শত্র“পক্ষীয় কনজারভেটিভ মুসলিম দেশগুলোর সংস্কারে আঘাত হানার জন্য যথেষ্ট খোলাপোশাকের একজন স্বদেশী বিশ্বসুন্দরী। আবার সেই সুন্দরীর মাধ্যমেই পণ্য ও ভোক্তাসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ নিরবে মুসলমানদের সংরক্ষণবাদকে নষ্ট করবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচক, লাতিন আমেরিকার নেতা, সমাজতন্ত্রী হুগো শভেজের দেশ ভেনেজুয়েলা থেকে বেশ কিছু বিশ্বসুন্দরী নির্বাচনের পেছনেও রয়েছে প্রায় একই রকম রাজনীতি। ২০০৮ ও ২০০৯ সালের মিস ইউনিভার্স, ২০০৩ ও ২০০৬-এর মিস ইন্টারন্যাশনাল নির্বাচিত হয়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধি। ২০০৩ সালে চীন থেকে মিস ওয়ার্ল্ড একই রাজনীতির আওতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাই বলা যায় ‘সৌন্দর্য ও ট্যালেণ্টের সমন্বয়’-এর আপ্তবাক্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যকর নয়। বরং বিশ্বায়নকালে মুক্তবাজার অর্থনীতির দূত হিসেবে এইসব সুন্দরীদের নির্বাচন করা হয়, এবং মোটামুটি হিসেব কষে সুন্দরীদের মুকুট ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়। এমনকি বর্ণবাদী এই প্রতিযোগিতা শ্বেতাঙ্গ বা বাদামি-ফর্সা সুন্দরীদের অবশ্যম্ভাবী বর্ণ হিসেবে একটা মানদণ্ড ঠিক করে দেবার পরও মাঝে মাঝে এর ব্যতিক্রম ঘটানো হয়, ‘কালোদের-জন্য-একজন-এ্যাম্বাসেডর’ খোঁজার স্বার্থে। এই বিবেচনাতেই ২০০১ সালে নাইজেরিয়া থেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে দেয়া হয় মিস ওয়ার্ল্ড-এর খেতাব। একই বিবেচনায় আমাদের দেশে আয়োজন করা হয়েছে ‘আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী’ প্রতিযোগিতা, যে-প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কথা আমি এই রচনার শুরুতেই বলেছি। অর্থাৎ আদিবাসীদের মধ্য থেকেও একজন সুন্দরী বেছে নেয়া, যাকে দিয়ে পণ্যের প্রমোশন করা যাবে এবং আদিবাসীদের কাছে পণ্যের বার্তা নিয়ে সহজে পৌঁছা যাবে। কেবল বর্ণ নয়, সব বয়সের প্রতিনিধিও খোঁজার দৃষ্টান্ত রয়েছে। একবার আমাদের দেশেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল চল্লিশোর্ধ নারীদের প্রতিযোগিতা। স্মৃতি প্রতারক না হলে, সেই প্রতিযোগিতার নাম ছিল ‘প্যান্টিন ইউ গট দ্যা লুক’। এই হলো ভোক্তা-সংস্কৃতির নমুনা। তুমি মুসলিম হলেও মডেলিং করো, না হয় পোশাকটা একটু লম্বাই রাখো। তুমি একটু বয়েসী হলেও সেজেগুজে প্রতিযোগিতায় নামো। তুমি আদিবাসী হলেও র‌্যাম্পে আসো। এবার আসা যাক নারীর ক্ষমতায়ন ও সুন্দরী একইসঙ্গে ট্যালেন্টও — এই ধারণার আলোচনায়। নৃবিজ্ঞানী সুসান রাঙ্কল (রাঙ্কল, ২০০৪) গবেষণা করেছেন মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতার পূর্বে নির্বাচিত ২৬ জন প্রতিযোগীর জন্য আয়োজিত প্রশিক্ষণ-প্রক্রিয়া নিয়ে। তিনি লক্ষ করেছেন নির্বাচিত ২৬ জনকে যেভাবে ঘষেমেজে সম্ভাব্য মিস ইন্ডিয়া বা মিস ওয়ার্ল্ড-ইউনিভার্স হিসেবে তৈরি করা হয়, তাতে প্রতিযোগীর অবদান সামান্যই। তার ভাষায়, ‘‘মিস ওয়ার্ল্ড হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়াটাতে তিনি নিজে অবদান রাখেন সামান্যই। বরং, ‘এক্সপার্ট’রাই হচ্ছেন আসল লোক যারা মোট কাজের বেশিরভাগটা সম্পাদন করেন। খোদাই করে করে তারা তাকে একজন মিস ওয়ার্ল্ড যেমন হওয়া উচিত সেরকম আদর্শ-বস্তুতে রূপান্তর করে ফেলেন’’ (রাঙ্কল, ২০০৪: ১৪২)। এই পুরো ‘গ্র“মিং’-প্রক্রিয়া দেখে সুসান রাঙ্কলের ধারণা হয়েছে, ‘শরীর এমন একটা যন্ত্র যার বিভিন্ন পার্টস মেরামত করা যায়’ (রাঙ্কল, ২০০৪: ১৩৯)। এই মেরামতিতে ডায়েট, ভাষাভঙ্গী, ত্বক, ফ্যাশন ইত্যাদি নানা বিষয়ের এক্সপার্ট যুক্ত হন। দেখা যাচ্ছে প্রতিযোগীর সৌন্দর্য ও ট্যালেন্ট উভয়ই নির্মিত হচ্ছে অন্যের দ্বারা। আর তার ট্যালেন্টের বহর উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন রাঙ্কল। একজন প্রতিযোগী সবচেয়ে পছন্দের নারী হিসেবে হিলারি ক্লিনটনের নাম বলেছিলেন — ‘কারণ তিনি হচ্ছেন প্রেম, ক্ষমতা আর দৃঢ়তার আদর্শ, যদিও তাঁর ছিল একটা দুর্যোগপূর্ণ ব্যক্তিগত জীবন’ (দেখুন রাঙ্কল, ২০০৪: ১৫০)। স্বামীর প্রকাশিত অনৈতিক সম্পর্কের পরও যিনি তার প্রেম ও দৃঢ়তা দিয়ে বিয়ে-রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখেন তিনিই সুন্দরীর আদর্শ হবেন, এতে অবশ্য আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তথ্যসূত্র : http://en.wikipedia.org/wiki/Beauty_contest সুসান রাঙ্কল (২০০৪), ‘সৌন্দর্য উৎপাদন’, সেলিম রেজা নিউটন অনূদিত, চন্দ্রাবতী, সুস্মিতা চক্রবর্তী সম্পা., রাজশাহী, ২০০৬। ২০১০ সালে লিখিত (লেখকের ‘অসম্মতি উৎপাদন’ [২০১১] গ্রন্থে প্রকাশিত)

Read More

কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে নাগরিক ও রাজনীতির মাঝে সূচীত হোক একটি নতুন “স্যোশাল কন্ট্রাক্ট” (প্রথম পর্ব)

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

চরম কতৃত্ববাদী, জেল-জুলুম গুম-খুন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত প্রবলভাবে একদলীয় ও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি ঐক্য প্রচেষ্টা এই সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে। উদার ডান ও প্রগতিশীল বাম ভাবধারার রাজনৈতিক শক্তি বলয় সমূহের ঐক্য প্রক্রিয়া গুলোর দেনদরবারের কৌশলগত ভিত্তি সমূহ ঠিক কতটা আন্তর্জাতিক নাগরিক অধিকার সনদ গুলোর আলোকে, কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের তরে কতটা নিবেদিত এবং চূড়ান্ত ভাবে কি পরিমাণে নাগরিক স্বার্থকেন্দ্রিক তা নিয়ে ভাবার বিস্তর অবকাশ রয়েছে। রাষ্ট্রকে চরম কতৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের খোলস থেকে বের করে নাগরিক বান্ধব করে তুলতে একটি বিস্তৃত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরির একটি দৃশ্যমান চেষ্টা ও নাগরিক চাপও সমাজে তৈরি থাকা দরকার। কিসের ঐক্য চাই, কি নিয়ে ঐক্য চাই, এই বুঝাপড়া গুলো চূড়ান্ত না হলে, বার বার রাজনৈতিক ঐক্য প্রক্রিয়া গুলো শুধু মাত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কূটচাল হিসেবেই থেকে যাবে! বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ইতিহাস ঠিক যেন নাগরিক স্বার্থের সাথে নিয়ত করে চালানো চরম প্রতারণারই প্রতিচ্ছবি। read more

Read More

আগামী কয়েক মাসে যা ঘটতে পারে

জিয়া হাসান

কিছু ধারনা শেয়ার করি, আগামী কয়েক মাসে মিলবে কিনা দেখেন। আমার কাছে কোন সিক্রেট ইনফরমেশান নাই, পাবলিকলি যেই সব তথ্য এভেলেবল, সেইটার ভিত্তিতে এই হাইপোথেসিস। read more

Read More

প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদীয় নির্বাচন

ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ  

শুধু ১টি মাত্র আসন ভিত্তিক সংসদ নির্বাচনের বদলে একটি পুরো জেলায় একদল প্রার্থীর তালিকা কেন্দ্রিক ভোট হবে। অর্থাৎ বর্তমানের সংসদীয় আসন এর সীমা উঠে যাবে, বিপরীতে পুরো জেলা একটি নির্বাচনী ইউনিট হবে এবং সেখানে সাধারণ প্রার্থী তালিকায় ভোট হবে ।(এতে করে চাইলে জেলা সরকার গঠন করা যাবে, প্রতিটি জেলায় উৎপাদন বন্টন ও কর্মসংস্থানের আলাদা আলাদা টার্গেট ভিত্তিক রাজনৈতিক বা নির্বাহী প্রশাসন সাজানো যাবে। পশ্চাৎ পদ জেলার লোকেরা আঞ্চলিক দল তৈরির সুযোগ পাবে এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক করতে ভূমিকা রাখবে)। read more

Read More

বাকস্বাধীনতা রাজনৈতিক শর্তের অধীন নয়, মানবীয়তার অংশ

সারোয়ার তুষার বাকস্বাধীনতা কিম্বা স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার স্রেফ রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এর চেয়ে বেশি কিছু। বাকস্বাধীনতা মানুষের মানবীয়তার সাথে সম্পর্কিত একটি ব্যাপার । মানবীয়তা হলো মানুষের সেই সত্তা যা প্রকৃতিতে মানুষের অস্তিত্বকে সাংস্কৃতিক করেছে। মানুষকে একমাত্র কর্তাসত্তা সম্পন্ন জীবে পরিণত করেছে। মানবীয়তার কারণেই মানুষ তার ইচ্ছানুসারে প্রকৃতির রুপান্তর ঘটাতে পারে নিজের কল্পনাপ্রতিভা, সৃজনশীলতা ও শ্রমের মাধ্যমে । খেয়াল করলে বোঝা যাবে প্রকৃতিতে মানুষ ব্যতিত অন্যকোন প্রাণীরই প্রকৃতির রুপান্তর ঘটানোর সামর্থ্য নেই, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাংস্কৃতিক জীবনযাপন করার সামর্থ্য নেই, চিন্তা ও কল্পনা করার সামর্থ্য নেই। সুতরাং একমাত্র মানুষই চিন্তাসম্পন্ন প্রাণী, একমাত্র মানুষেরই চিন্তা আছে। আর এই চিন্তা হয়েই ওঠে আসলে মানুষের ভাষার মাধ্যমে। ভাষাই চিন্তার আধার । মানুষের প্রাকৃতিক দশা থেকে সাংস্কৃতিক দশায় উত্তরণ প্রথমত ও প্রধানত সম্ভব হয়েছে ভাষার মাধ্যমে। ভাষা নেই মানে কিন্তু মানুষের মানবীয়তাও নেই। প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর সাথে তাহলে মানুষের আর পার্থক্য থাকেনা। সুতরাং বাকস্বাধীনতা তথা ভাষার স্বাধীনতা ওতোপ্রোতভাবে মানুষের মানবীয়তা তথা প্রকৃতিতে একমাত্র চিন্তাশীল প্রাণী হিশেবে টিকে থাকার শর্ত। মানুষের সমস্ত সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার মূল সূত্র নিহিত ভাষা ও কল্পনাপ্রতিভার মধ্যে। মানুষ যেহেতু ভাষার মধ্যেই চিন্তা করে, ভাষা ছাড়া যেহেতু চিন্তা একেবারেই অসম্ভব ; তাই কল্পনাপ্রতিভার আদিভিত্তিও এই চিন্তা তথা ভাষা। প্রকৃতির যেকোন উপাদানকে মানুষ নিজের ইচ্ছায় রুপান্তর ঘটাতে পারে এবং রুপান্তর ঘটাতে হলে সবার আগে মানুষকে প্রকৃতির উপাদানের মধ্যে নিজের ইচ্ছাকে কল্পনা করে নিতে হয়। তারপর সেই কল্পনার সাথে শ্রম যুক্ত হয়ে প্রকৃতির উপাদানের মানবসৃষ্ট রুপান্তর ঘটে। চিন্তা ও শ্রমের মাধ্যমে প্রকৃতির এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রুপান্তরই মানুষের সংস্কৃতি । মানুষের সংস্কৃতি প্রকৃতিতে মানুষের অস্তিত্বকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত করেছে। অন্যান্য প্রাণী, যাদের প্রকৃতিসত্তা থেকে উত্তরণ ঘটেনি, ঘটার সম্ভাবনাও নেই ; তাদের সাথে মানুষের এই পার্থক্যকেই আমরা মানুষের মানবীয়তা বলছি । তার মানে চিন্তা ও শ্রম ছাড়া যেহেতু প্রকৃতি রুপান্তর ঘটানো সম্ভব না, সেহেতু চিন্তা ও শ্রম মানবীয়তার অংশ। উপরে আমরা দেখেছি ভাষা ছাড়া চিন্তা আদৌ সম্ভবপর হয়না । অর্থাৎ ভাষা মানবীয়তার আদি ও অবিচ্ছেদ্য উপাদান। ভাষা নিজেই মানবীয়তা। ফলে বাকস্বাধীনতাকে স্রেফ রাজনৈতিক ইস্যু হিশেবে বোঝার মুশকিল হলো, যা (ভাষা) মানুষের মানবীয়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা অন্যের, কোন ‘বৈধ’ কর্তৃপক্ষের বদান্যতা, উদারতার বিষয়ে পরিণত হয়। কোন ‘বৈধ’ অথরিটি যদি যথেষ্ট উদার হয়, তাহলে আমাদের কথা বলার অধিকার থাকবে, আর যদি অথরিটি কর্তৃত্বপরায়ন হয় তাহলে আমাদের বাকস্বাধীনতা সে ‘হরণ’ করবে। গভীর ভাবে ভাবলে এটা স্পষ্ট হয়, এই ধরনের যুক্তিতর্কের মধ্যেই মানুষের সহজাত বাকস্বাধীনতা হরণের বীজ নিহিত থাকে। এক্ষেত্রে হরণকৃত বাকস্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার আকুতি, দেনদরবার জানাতে হয়। যা আমার মানবীয় সত্তার নিঃশর্ত উপাদান, তাকে প্রথমত রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার বিষয়ে পরিণত করে, সেই জিনিস খোয়ানোর পরে ফিরে পাওয়ার আবেদন জানাতে হয়। কোন সন্দেহ নেই এতে করে মানুষের কর্তাসত্তাও রাজনৈতিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন হয়ে পড়ে।

এই কারণেই বাকস্বাধীনতা এবং মোটের উপর মানুষের মানবীয় সত্তা সম্পর্কিত কমনসেন্স বদলানো অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি আজকে থেকে বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, যা কিছু মানুষের মানবীয়তার অংশ, তা কোন পরিস্থিতিতেই এমনকি কোন ‘বৈধ’ কর্তৃপক্ষও হরণ কর‍তে পারেনা, তাহলে কিন্তু মানুষ হিশেবে আমাদের মৌলিক অধিকারসমূহও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকেনা । read more

Read More