একরাম হত্যাকান্ড নিয়ে কিছু হারিয়ে যাওয়া প্রশ্ন

একতরফা গুলি! ধর ধর– খোসাগুলা দে রিলোড… গুলি (একই বন্দুক) হইসে আর লাগবে না খোসাগুলা দে। কয় রাউন্ড? দশ রাউন্ড। বাইকে আরেকটু দিতে হবে। বাইকে আরেকটু মারতে হবে। এতো দূরে না। আশেপাশে তিনটা ফালায় রাখ! হাতে তো পিস্তল… পকেটে দিয়া দে… ওইপাশে দুইটা দে… কোন সিনেমার চিত্রনাট্য নয়, বরং বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকান্ডের পর তার পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া অডিও ক্লিপ থেকে শোনা কিছু কথা। প্রথম গুলিগুলো চলার পরবর্তী সময়ে এই অংশটি অধিকাংশ মানুষই মনোযোগ দিয়ে শোনেননি অথবা মনের ভারে শুনতে পারেননি। তবে একটু কষ্ট উপেক্ষা করে এই অংশটুকু শুনলেই বুঝতে পারা যাবে ঠিক নাটকের সেট ডিজাইনের মতন করে একরামুল হককে হত্যার পরে সেই ক্রাইম সিনটিকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে দেখানোর জন্যে একের পর এক উপকরণ দিয়ে সাজানো হয়েছিলো। র‍্যাবের ভাষ্যমতে তারা ঘটনাস্থল থেকে পরবর্তীতে দশ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, একটি পিস্তল, একটি শটগান, কিছু খরচ হওয়া গুলি ও খোসা উদ্ধার করেছেন। কে জানে এই গুলিগুলোর মোট সংখ্যা দশ রাউন্ড কিনা? কে জানে ওই দশ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেটের মধ্যে কতোগুলো একরাম সাহেবের পকেটে পাওয়া গিয়েছিলো আর কতোগুলো পাওয়া গিয়েছিলো তার আশেপাশে ছড়ানো? আমরা জানিনা, কারণ আমরা ভিন্ন একটি বিষয়ে বিতর্কে মত্ত আছি। আমাদের বিতর্কের বিষয় হলো একরামুল হকের নির্দোষিতা বা দোষিতা। এ সপ্তাহেও কক্সবাজার যুবলীগের দুইজন নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সাথে দেখা করেছেন এবং বলেছেন যে একরাম সাহেবকে তাদের কোনদিন মাদক সেবায় জড়িত মনে হয়নি। মাননীয় মন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং তারপর বলেছেন যে আকরাম নির্দোষ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যুবলীগের নেতারাও চেয়ে এসেছেন আকরামের নামে কুৎসা রটানো লোকেদের জন্যে শাস্তি। কিন্তু কেউ কি দেখছেনা যে অডিও রেকর্ডিংটিতে সবচেয়ে তীব্র যে প্রমাণটি রয়েছে সেটি হলো পুলিশ আর র‍্যাবের শঠতার? তাতে কি বোঝা যায়না যে “বন্দুকযুদ্ধ” বিষয়টি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং একপেশে গুলি করে মাদক ছড়িয়ে রেখে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে? কেউ দোষী বা নির্দোষ হোক না কেন, তাকে মধ্যরাতে তার পরিবারের কাছে থেকে আলাদা করে এভাবে গুলি করে ফেলে দেয়ার অধিকার কি বাংলাদেশের সংবিধান তার আইন প্রণয়নকারী সংস্থাকে দেয়? এই রাষ্ট্রে কি তবে হত্যা শেষ হবার পরে মৃত ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত হলে তার হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেবার নতুন বিধান জারি হয়েছে? নাটক সাজানোর জন্যে কি র‍্যাবের কারো বিচার হবে? সেই মেজরের কি বিচার হবে, একরামুলকে তার ভাষ্যমতে যিনি ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন? সেই মেজর কি প্রমাণ দিতে পারবেন যে তার সাথে দেখা করতে আসার সময় একরাম একহাতে শটগান, আরেকহাতে পিস্তল আর পকেটভর্তি ইয়াবা নিয়ে হেঁটে এসেছিলেন? আর যদি একরাম মেজরের কথা, বা টিএনও অফিসের কথা বা লীলায় জরুরি কাজে যাবার কথা সবই বানিয়ে বলে থাকেন-তাহলে র‍্যাব কি প্রমাণ দিতে পারবে যে পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ ছাপিয়ে যারা অস্ত্র আর ইয়াবা ছড়ানোর সম্ভাব্য নির্দেশ দিচ্ছেন তারা তাদের কোন লোক নয়? আর যদি না পারেন, তাহলে কেন এই হত্যাকান্ডে জড়িত র‍্যাবের সদস্যদের ফৌজদারী আইনে বিচার হবেনা? যদি ঘটনাস্থল সাজানোর নির্দেশ কোন উপর মহল থেকে এসে থাকে তাহলে তাদেরও বা কেন বিচার হবেনা? যদি এই হত্যাটি সাজানো হত্যা হয়ে থাকে, তাহলে আর কোন কোন হত্যা সাজানো হত্যা হতে পারে সেটা নিয়ে কেনো কোন স্বাধীন তদন্ত হবেনা? এতোদিন সকলের ধারণা ছিলো যে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোতে যুদ্ধ কিছুই হয়না বরং কেবল একপেশে গুলি করে তার দায় এড়ানোর জন্যে নাটক সাজানো হয়। এখন যখন তার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে-তখন আমরা এই মিথ্যাচার এবং সম্ভাব্য ফৌজদারী অপরাধের জন্যে আমাদের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে জবাবদিহীতার সম্মুখীন করছি না? নাকি আমরা জাতি হিসেবে মেনেই নিয়েছি যে আমাদের বাহিনীগুলো একেকটা কিলিং স্কোয়াড হয়ে উঠেছে? যদি একটা টিভি রিপোর্ট আর দুইটা উড়োকথায় কাউন্সিলর একরামকে অপরাধী মনে করে কারো কারো রাগ দূঃখ উবে যায়, তাহলে ওই কুখ্যাত রেকর্ডিং শুনে তারা ভুল কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ক্ষুব্ধ হবার কারণ কেবলমাত্র এটা নয় যে র‍্যাব একজন নিরপরাধ মানুষকে ক্রসফায়ারে দিলো (কেননা আইনত প্রমাণের আগ পর্যন্ত যে কোন ব্যক্তি নির্দোষ)। ক্ষুব্ধ হবার আরো একটা বড়ো কারণ হলো বাংলাদেশের আইনশৃংখলা বাহিনী স্পষ্টতই একজন মানুষকে হত্যা করলো। নিজেদের জীবন বাচাতে তারা গুলি ছুঁড়েছে বা অভিযুক্তের সাথে বন্দুকযুদ্ধে সে পারা পড়েছে এমন কিছু নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় একই বন্দুক দিয়ে বারবার গুলি ছোঁড়া হয়েছে কোন পালটা গুলি ছাড়াই। রেকর্ডিং-এর শেষে যেমন করে একতরফা গুলি এবং খোসা ছড়ানোর কথা শোনা যায়, তাতেই পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায় যে বন্দুকযুদ্ধের নাম দিয়ে র‍্যাব-পুলিশ আসলে মানুষ হত্যা করে বেড়াচ্ছে। তার মানে প্রমাণসহ র‍্যাব পুলিশ মিছে কথা বলছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, যে পুলিশের দিকে গুলি ছোড়েনি তাকে গুলি ছোড়ার অপবাদ দিচ্ছে। সরকার বারবার বলছেন যে একরাম যদি নিরপরাধী হয় তবে সংশ্লিষ্ট লোকেদের বিচার হবে। আমার প্রশ্ন হলো, একরাম যদি অপরাধীও হয়-তাহলেও তাকে আরো মিথ্যে অপরাধে জড়ানোর সুস্পষ্ট আইন লংঘন আর সহজ হত্যার দায়ে গুলি ছোঁড়া মানুষগুলোর বিচার হবে কিনা? নাকি বাংলাদেশের আইনে এখন একতরফাভাবে গুলি ছুঁড়ে খোসা ছড়িয়ে রাখতে বলাও জায়েজ হয়ে গেছে?

অনুপম দেবাশীষ রায়: যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতির ছাত্র। read more

Read More

একরামুল হক হত্যাকাণ্ডঃ নেপথ্যে কিছু কথা

কয়েক দফা গুলির শব্দ শুনে যখন স্বামীর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত তখনও মেয়েদের শেষ আশাটুকু বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন মা। অডিওর শেষদিকে শোনা যায় তিনি শান্ত হয়ে বুঝাচ্ছিলেন “তোমার আব্বুর কিছুই হয়নি”। read more

Read More