Blog

হুমকির মুখে জাতীয় বিদ্যুৎ নিরাপত্তাঃ কৌশলগত “বিদ্যুৎ” অবকাঠামো রাষ্ট্রীয় খাতে থাকা বাধ্যতামূলক!

ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

কুইক রেন্টাল ও আইপিপি মডেলে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাত্রা শুরুর পর থেকে অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যে এই বিদ্যুৎ ক্রয়, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ওভার হোলিং চার্জ দিতে বাধ্যবাধক থাকায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিডীবি বিগত ২০০৯ থেকে দেনা ও লোকসানের ভারে নূয্য। ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত পাঁচ বছরে পিডিবিকে বেসরকারি খাতে পরিশোধ করতে হয় ৭৪ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা যার মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২৬ হাজার ৭৬১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এই পাঁচ অর্থবছরে পিডিবি লোকসান গুনেছে ৩১ হাজার ৭১১ কোটি চার লাখ টাকা। উল্লেখ্য যে, দেশে মোট উৎপাদন সক্ষম ক্যাপাসিটি হচ্ছে আনুমানিক ১১.৬ গিগা ওয়াট, বিপিডীবি’র নিজিস্ব উৎপাদন ৪.৮ গিগা ওয়াট। পিডিবির নিয়ন্ত্রিত বা অন্যান্য স্বাসত্বশাসিত বিদ্যুৎ কোম্পানীর আছে ৫.৭ গিগা বাকি মাত্র আইপিপি’র ১.৫৪ গিগা বেসরকারি। এই বেসরকারি ১৫৪০ মেগা ওয়াট প্রকৃত উৎপাদনের বিপরীতে এর দ্বিগুণের বেশি ইন্সটল্ড ক্যাপাসিটি দেখানো হচ্ছে। অবাক করা বিষয়ে যে, আই পি পি’র এই ১০ শতাংশ বেসরকারি বিদ্যুৎই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বেপারোয়া লোকসানের (লুটের) খনি হয়ে দাঁড়িয়েছে। read more

Please follow and like us:
Read More

এই সংবিধানের আওতায় কি নাগরিকের ভোটাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব?

রাখাল রাহা

বর্তমানে যে সংবিধানের অধীনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে তা মূলত বাহাত্তরেরই সংবিধান। এই সংবিধানের আওতায় মানুষের ভোটাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব কিনা, বা সম্ভব হলে তা কিভাবে — এই লেখায় তা আমরা দেখার-বোঝার চেষ্টা করবো। এই বোঝা কোনো আইনজীবী বা সংবিধান-বিশেষজ্ঞের বোঝা নয়, এটা একজন সাধারণ নাগরিকের বোঝা। আমরা মনে করি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইনী ডক্যুমেণ্ট হিসাবে প্রত্যেক নাগরিকের তার সংবিধান বুঝে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। read more

Please follow and like us:
Read More

পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ না হওয়াই সঙ্গত

আলতাফ পারভেজ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টে ‘বাংলা’ রাখার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে দুদিন হলো। নয়াদিল্লীর এই সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হয়েছে। এটা আবেগ-গন্ধমাখা কোন বিষয় ছিল না। ফলে এতে বাংলাদেশকে ফেইভার করারও কোন অবকাশ ছিল না– যেমনটি প্রচার করা হচ্ছে গত ৪৮ ঘন্টা ধরে। মূল বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ– কেউ কি এককভাবে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের দাবিদার হতে পারে? সোজাসাপ্টা উত্তর হলো, না পারে না। পশ্চিমবঙ্গ ভারতভুক্ত বাংলাভাষীদের একটা রাজ্য। আর বাংলাদেশ বাঙ্গালি-চাকমা-মারমা-সাঁওতালসহ আরও অনেক মানুষদের একটা স্বাধীন দেশ। যদিও পশ্চিমবঙ্গের মতোই বাংলাদেশেও বাঙ্গালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু দুই সীমান্তের কেউই এককভাবে ‘বাংলা’ নামটি দাবি করতে পারে না। আপাতত বাঙ্গালিরা প্রধানত দুটি দেশের সীমান্তে আবদ্ধ– তারা সাংস্কৃতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত এক জাতি, এটাই বাস্তবতা। উপরন্তু ত্রিপুরা, আসাম, করাচিতেও বিপুল বাঙ্গালি আছে। সুতরাং এককভাবে কোন ভূ-খন্ডের জাতিগত অভিভাবক সাজার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে অনেকেই তারস্বরে এদেশকে ‘বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ’-এর বিজয়ী ভূমি বললেও এই দাবিতেও সারবস্তু আছে সামান্যই। কারণ বাংলাদেশ– বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিজয়ী ভূমি হলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালিদের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে খারিজ করা হয়। একই সঙ্গে খারিজ করা হয় এখানকার অন্যান্য জাতিসত্তার পরিচয়কে। সামগ্রিক রাজনৈতিক বিবেচনায় ‘বাংলা’ হয়তো বাংলাদেশের সঙ্গেই মানায়– কিন্তু উপনিবেশমুক্তির সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ জাতিবাদী সংকীর্ণতার সেই পরিসর অতিক্রম করে গেছে। তার মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সৌন্দর্য ছিল সেটাই। জাতি ও দেশ যে পুরোদস্তুর দুটি ভিন্ন বিষয় এই প্রাথমিক জ্ঞানটুকু অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। মমতা ব্যানার্জি সরকার যে পুনঃপুন তিনবার তাঁদের রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ করার উদ্যোগ নিয়েছেন সেটা পুরোদস্তুর একটা রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল। এই প্রকল্পের সাংস্কৃতিক দাবি যে ত্রুটিপূর্ণ ছিল সেটা পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা জোরের সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলেননি। এটা দুঃখজনক।

পশ্চিমবঙ্গে নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিক রাজনীতি
কলকাতায় তৃণমূলের নাম বদলের এই রাজনীতিকে মূলধারার অন্যান্য দলও সমর্থন দিয়েছিল– সেটাও বাংলাদেশ থেকে গভীর বেদনার সঙ্গে আমরা দেখেছি। এটা করে তাঁরা বাংলাদেশের প্রতি অবিচার করেছিলেন। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বন্ধনের রাজনৈতিক সম্ভাবনার ভবিষ্যত গুরুত্বও তারা বোঝেননি বলেই মনে হয়েছে। এমনকি ‘বাংলা’ ভাষার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির অধিকতর মাখামাখি দার্জিলিং ও কালিমপংয়ে গুর্খা ও নেপালিদের তরফ থেকে গত বছর কীরূপ প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল সেটাও বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগের সঙ্গেই নজর রেখেছিল। সর্বশেষ দেখছি, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নেতৃবৃন্দ নয়াদিল্লীর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি হলো বিজেপি যখন ভারতজুড়ে নাম পরিবর্তনের হিড়িক ফেলেছে তখন পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনে বাধা দেয়া ঠিক হয়নি। খুবই দুর্বল ও শিশুসুলভ একটি যুক্তি এটা। বিজেপি ভারতজুড়ে মূলত বেছে বেছে মুসলমান ঐতিহ্যমন্ডিত শহর ও স্থানগুলোর নাম পাল্টাচ্ছে। এটা তাদের ফ্যাসিবাদী সাম্প্রদায়িক মনোভাবের অন্যতম দিক। তার বিরুদ্ধে ভারতজুড়েই ন্যায়সঙ্গতভাবে অনেক প্রতিবাদ হচ্ছে। তৃণমূলও সেই প্রতিবাদে শামিল। সেই প্রতিবাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের ইস্যুকে যুক্ত করা হাস্যকর। উপরন্তু, বিজেপি যেভাবে নাম পাল্টাচ্ছে সেটা যেমন জবরদস্তিমূলক– একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করার প্র্রস্তাবটিও কম জবরদস্তিমূলক নয়। একটা যদি হয় সাম্প্রদায়িক ঘৃণাজাত– আরেকটি তবে সাংস্কৃতিক উন্নাসিকতা জাত। জবরদস্তির মনোভাব দক্ষিণ এশিয়াকে অনেক ভুগিয়েছে– আসুন একে প্রত্যাখ্যান করি।

Facebook Comments
Please follow and like us:
Read More

সৌন্দর্য উৎপাদন

সুসান রাঙ্কল

সৌন্দর্য উৎপাদন

অনুবাদক : সেলিম রেজা নিউটন

[মানুষী পত্রিকার প্রারম্ভিক নোট: উদারিকরণ-পরবর্তী ভারতে নতুন ধরনের নারী সৃষ্টির একটা জায়গা হিসাবে গড়ে উঠেছে মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনী। ভারতীয় ফ্যাশন, সিনেমা আর সৌন্দর্য-ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দের তত্ত্বাবধানে মিস-ইন্ডিয়া-প্রতিযোগিনীরা শেখেন কেমন করে লিঙ্গায়িত পরিচয় নির্মাণ করতে হয়। দুনিয়াজোড়া সৌন্দর্য-ইন্ডাস্ট্রিতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি এখানে টুকে রাখছেন সুসান রাঙ্কল।] read more

Please follow and like us:
Read More

মুক্ত মানুষ, সুন্দরবন ও গণতন্ত্রের জন্য প্রতিবাদ যাত্রা

আগামী ১০ নভেম্বর, শহীদ নূর হোসেন দিবসে তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি আহুত সুন্দরবনের জন্য বৈশ্বিক সংহতি দিবসের ডাকে সাড়া দিয়ে ‘মুক্ত মানুষ, সুন্দরবন ও গণতন্ত্রের জন্যে শিরোনামে একটি অভিনব প্রতিবাদ যাত্রা আয়োজিত হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা ‘আমরা জনগণ’ নামক ব্যানারে এই আয়োজনটির উদ্যোগ নিয়েছে । read more

Please follow and like us:
Read More

ডিজিটাল আইন : নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা ও সর্বাত্মক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রণালী

সারোয়ার তুষার  

জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে ওশেনিয়া রাষ্ট্রের অধিবাসীদের টেলিস্ক্রিনে বারবার মনে করিয়ে দেয়া হয় “Big brother is watching you”. ওশেনিয়া একটি কাল্পনিক সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র ; যার অধিবাসীদের প্রত্যেকটি কাজ, চিন্তা রাষ্ট্র কর্তৃক নজরদারি করা হয়, নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এমনই মাত্রা সেই নজরদারির যে রাষ্ট্রের না-পছন্দ এমন কোন চিন্তা প্রকাশ করা তো দূরে থাক, এমন চিন্তা করাও অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। বিগ ব্রাদার তথা রাষ্ট্র সম্পর্কে ‘নেতিবাচক’, ভিন্নমত পোষণকারী চিন্তা মস্তিষ্কে হতে থাকলেই, চিন্তাপুলিশ আপনার দরজায় কড়া নাড়বে এবং আপনাকে আটক ও শাস্তি পেতে হবে। read more

Please follow and like us:
Read More

শ্রমিকের শাস্তি বাড়িয়ে সড়কে সমাধান আসবে না

বখতিয়ার আহমেদ [ এই আর্টিকেলটি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরুর প্রেক্ষিতে লিখিত হয়েছিল, ২ আগস্ট, ২০১৮। ] প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহণ আইন যেটুকু দেখলাম তাতে মনে হচ্ছে না সমস্যার কোন সমাধান হবে। কারণ যতদূর মনে হল, এই আইনে সমাধান খোঁজা হয়েছে মূলত পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ফাঁসিসহ বড় বড় শাস্তির মধ্যে। এই আইন হয়তো পপুলার হইতে পারে, কিন্তু এদিয়ে সড়কে কোন বাড়তি নিরাপত্তা আসবে বলে মনে হয় না। না, আই অ্যাম নট কনভিন্সড অ্যাট অল। পরিবহন খাত শ্রমিকের জন্য গার্মেন্টসের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত। মহাসড়কের ঝুঁকি আপনার আমার মতন মাঝে মাঝে ট্রাভেল করাদের জন্য যত, একই রুটে দিনে তিন ট্রিপ মারাদের জন্য প্রতিদিন তার তিনগুণ। উল্টা দিক থেকে ধেয়ে আসা সম্ভাব্য মৃত্যুকে যারা প্রতি ট্রিপে শতবার গা ঘেঁষে পাশ কাটায়, তাদের আপনি ফাঁসির ভয় দেখায় লাইনে আনতে পারবেন? মনে হয়না। মরার ভয় থাকলে বাংলাদেশের পরিবহন খাতে কেউ করে-কর্মে খেতে পারেনা। ডাউট থাকলে যে কোন ড্রাইভার-হেল্পারকে জিজ্ঞেস করে দেখেন। প্রস্তাবিত আইনে যাত্রী আর যাত্রীসেবা নিয়ে কঠোর সব বিধান থাকলেও পরিবহণ শ্রমিকদের জন্য দেখলাম আছে শুধু শতাধিক শর্ত আর শাস্তি। কোন অধিকার, মজুরি আর মজুরির ধরণ, মালিকের সাথে চুক্তির ধরণ ও শর্ত, এসব নিয়ে কিছুই নেই। একটা চুক্তিপত্র করবার কথা বলা হলেও তার শর্ত নিয়ে কোন নির্দেশনা নেই। নিয়োগের আগে লাইসেন্স দেখা ছাড়া মালিকের আর কোন দায়ও দেখলাম না। শ্রমিকের শ্রম-ঘন্টা শ্রম-আইনের উপর ছেড়ে দেয়া হলেও চালকের শ্রমঘন্টা শ্রম আইনের বাইরে রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে এ ব্যাপারে সরকারের গেজেট হবে। নিজেকে শ্রমিকের জায়গায় বসায় ভেবে দেখলাম এই আইন আমি হলেও মানতে চাইতাম না। মানতে বাধ্য হলে এর জন্য পাব্লিককে দায়ী করতাম, এই আন্দোলনকে দায়ী করতাম। যাত্রীদের প্রতি শত্রুতাবোধ করতাম। বাংলাদেশের শ্রমজীবিদের জন্য পরিবহন খাত সবচে ইজি এক্সেসের জীবিকা। শিক্ষাগত যোগ্যতার তেমন দরকার নাই, হেল্পার হিসেবে ঢুকে পরে ওস্তাদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে শিখতে থাকা, একদিন ড্রাইভার হয়ার স্বপ্ন দেখা, আর ড্রাইভার হলে একদিন একটা গাড়ি নামানোর স্বপ্ন দেখা, এই হচ্ছে এখানে জীবিকার জার্নি। তুলনামূলকভাবে ভাল আয়ের খাত হইলেও, এই খাতের প্রধাণ বৈশিষ্ট হচ্ছে অনিশ্চয়তা। মালিকের কাছে দিনে কন্ট্রাক্ট নিছেন পাচ হাজার টাকায়, ঢাকার ভেতরে ঠিক মতন সিরিয়াল পাইলে হেল্পার ড্রাইভারের ২ হাজার থাকতে পারে, আর ঠিক মত সিরিয়াল না পাইলে, জামে টাইম খাইলে তিনশ টাকাও না জুটতে পারে। মালিকের মুনাফা কিন্তু আগেই গ্যারান্টিড। আবার সিরিয়ালের পাড়াপাড়ি করতে গিয়ে একটা কেস খাইলে কিন্তু তিনদিনের গড় ইনকাম নাই হয়ে যেতে পারে। ঢাকা-রাজশাহী টানা তিন ট্রিপ মারতে পারলে ড্রাইভার, ধরেন দিয়ার বাবা, চার হাজার টাকা নিয়েও ফিরতে পারেন, আবার চন্দ্রায় জ্যাম খাইলে দেড়দিন স্টিয়ারিং ধরে দেড় হাজারের বেশি নাও জুটতে পারে। জীবনের ঝূঁকি আর অমানবিক পরিশ্রম থাকলেও, একদিকে মালিকের মুনাফার আগাম নিশ্চয়তা আর অন্যদিকে রাস্তার জ্যাম মিলিয়ে দেশের পরিবহন খাতের শ্রমিকের জীবিকাকে প্রায় জুয়ার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। স্টিয়ারিং হাতে মানুষটার জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকলে পেছনের আরাম কেদারায় বসা কিম্বা রাস্তায় ইভনিং ওয়াকে নামা আপনার আমার জীবনের নিরাপত্তাও যে থাকবে না, এইটা বোঝার জন্য আপনার মার্ক্সবাদ বোঝা লাগেনা কিম্বা শ্রমিক-শ্রেণীর উপর বামপন্থাপ্রসূত মায়া-মমতাও লাগে না। যেটা লাগে সেইটা হইল কমনসেন্স। আর মিডিয়া মোতাবেক পরিবহন শ্রমিকরে দানব ভাবতে থাকলে সেই কমনসেন্স আর আপনার জন্য কমন থাকবে না। রেয়ার হয়ে যাবে। হাইপোথেটিক্যালি হইলেও ভাবেন এয়ারপোর্ট রোডে সেদিন মরে যাওয়া একতা পরিবহনের ড্রাইভারের মেয়ে দিয়ার কথা। ভাবেন এসএসসি’তে ভাল রেজাল্ট করা দিয়ার বড় সাধ রমিজুদ্দিন কলেজে পড়বে। কালকেই ভর্তি হতে লাগবে পাঁচ হাজার টাকা। দিয়ার বাবা স্টিয়ারিং হাতে চার ঘন্টা ধরে বসে আছেন চন্দ্রার জ্যামে। আর বারো ঘন্টার মধ্যে আরো দুই ট্রিপ না মারলে হবে না চার হাজার। জ্যাম ছোটার পর উনি কি করবেন? অ্যাক্সিলেটরে সুশীল চাপ দিবেন? নাকি জোরেই দিবেন চাপটা। ঝুঁকি শুধু উনি কি আপনার জীবনের উপরে নিলেন তখন, নাকি বাসের সবচে সামনে বসে নিজের জীবনের উপরেও নিলেন? আপনি-আমি নিইনা সন্তানের জন্য জীবনের ঝুঁকি? অনিশ্চিত জীবিকার বাইরে আছে আরো বড় অনিশ্চয়তা – অ্যাক্সিডেন্ট। অ্যাক্সিডেন্ট মানে শুধু ইনজুরি না, সাথে মামলাও। পরিবহনের মতন অনিশ্চিত খাতে শ্রমিকের সঞ্চয় বলে তেমন কিছু থাকেনা। আর অ্যাক্সিডেন্ট-মামলা খাইলে নেমে যেতে পারে কয়েক বছরের সঞ্চয় কিম্বা স্বপ্ন, সাথে ইনকামও। তখন না আছে মালিক, না আছে সরকার, না আছি আপনি-আমি। অ্যাক্সিডেন্ট-মামলা ছাড়াও অন্য অসুখ-বিশুখে পড়লেও তাই। কেউ নাই তখন এই শ্রমিকদের, নাই কোন জীবন-বীমা, নাই কোন অ্যাক্সিডেন্ট বা হেলথ কাভারেজ, নাই কোন প্রভিডেন্ট ফান্ড, নাই কোন পেনশন-গ্রাচুইটি। পপুলার পারসেপশন মোতাবেক অশিক্ষিত হওয়ার কারণে উনারা শুধু অ্যাক্সিডেন্টই বেশি করেন না, এই ধরণের ব্যাপার-স্যাপার যে রুজি-রোজগারে থাকতে পারে, সেটাও ঠিকমত জানেন না। তাইলে কে আছে উনাদের? আছে একমাত্র শ্রমিক ফেডারেশন। অ্যাক্সিডেন্ট বলেন, মামলা বলেন, অসুখ বলেন, কি মালিকের সাথে মূলামূলি বলেন, ফেডারেশন ছাড়া আর কোন গতি নাই। একারণেই উনারা ফেডারেশনের চাঁদা বিনা-বাক্য ব্যয়ে দিয়ে দেন। একারণেই ফেডারেশন নেতারাই উনাদের ত্রাণকর্তা। উনাদের নেতার যে হাসি আপনার-আমার বীভৎস লাগে, সেই হাসিই কোর্ট-কাচারি থেকে শুরু করে জেল-জরিমানা ভয় থেকে উনাদের আস্বস্ত করে। দেশের সবচে ঝুঁকিপূর্ণ পেশার তাবৎ অনিশ্চয়তার মাঝে এই নেতারাই উনাদের একমাত্র নিশ্চয়তা। আপনারা শ্রমিকদের যত বেশি শাস্তির ভয় দেখাবেন, তারা উনাকে তত বেশি আঁকড়ে ধরবেন, সেই হাসি-সমেত উনাকে আরো ক্ষমতাবান করে তুলবেন। শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মাঝে রেখে সড়কে আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা আসবার কোন সুযোগ নাই। আমরা যতই শাস্তির দাবিতে তড়পাই, স্টিয়ারিং কিন্তু উনাদের হাতে। উনাদের প্রতি মায়া-মমতা না লাগতে পারে, আমার নিজেরও যে খুব লাগে তা না, কিন্তু আমার বাচ্চার নিরাপত্তা যে উনাদের স্টিয়ারিং ধরা হাতের জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া আসবে না, এইটা আমি কমনসেন্স দিয়া বুঝতে পারছি। ফলে আমি আমার বাচ্চার কাছে উনাদের অযথাই দানব বানাইতে রাজী না। একারনেই বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ সড়ক যে চালক-শ্রমিকের যথার্থ শ্রমঘন্টা, ট্রিপ-সিস্টেমের বদলে মাসিক মজুরি আর ঝুঁকি ভাতা না দেয়া হলে, চালক-শ্রমিককে চুক্তি-ভিত্তিক গাড়ি বর্গা দেয়া বন্ধ না করা হলে নিশ্চিত করা সম্ভব না – সেইটা আমি গত কয়দিন ধরেই বলার চেষ্টা করেতেছি। এসব ছাড়া শ্রমিকদের ফেডারেশন নেতাদের বলয় থেকে বের করে আনা সম্ভব না, মালিকের মুনাফা-তাড়িত মার্ডারাস ড্রাইভিং থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব না। সাবধানে গাড়ি চালিয়ে যদি সংসার চলে, কে যাবে বেপরোয়া চালাতে? বেপরোয়া চালিয়ে যদি বাড়তি আয় না হয় তবে কে যাবে বেপরোয়া চালাতে? কিন্তু ট্রিপ-বর্গা ব্যবস্থায় রেখে যতই আপনেরা শাস্তির ভয় দেখান, জীবিকার দায়ই উনাদের গাড়িগুলান উম্মত্ত দাবড়ে নিয়ে বেড়াবে। এই সমস্ত কারণেই আমি আমি স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের শ্রমিকদের মুখোমুখি দাঁড় করাইতে রাজী না। বরং বাচ্চাদের সাথে উনাদের নিশ্চিত জীবিকার দাবিতে দাঁড়ানোর পক্ষপাতি। আর সেইটা মোটেও এই শ্রমিক-শ্রেণীর স্বার্থে না, একদম আমার নিজের ব্যক্তিগত আর পারিবারিক স্বার্থে। নিরাপদ সড়ক আমারো দরকার, সন্তান আমারো আছে।

Facebook Comments
Please follow and like us:
Read More

ক্ষমতার দ্বিচারিতা ও ভিন্নমত দমন

মাসকাওয়াথ আহসান

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী তার গত প্রায় দশটি বছরের শাসনামলে ক্ষমতা নিরংকুশ করতে এক এক করে সমস্ত ভিন্নমতকে দমন নিপীড়নের যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন; তাকে একটি প্রতিশোধের মহাকাব্য বলা যায়। read more

Please follow and like us:
Read More

Bangladesh’s Right to Vote in Despair

Maskwaith Ahsan

Bangladesh is awaiting general elections with an uncertain freedom to vote as the main concern. The party in power Bangladesh Awami League (BAL) is serving its second term after 2014 elections which largely lacked credibility as over half the members of the parliament got elected uncontested. An election under the rule of the party in power cannot be credible; that’s well proven in Bangladesh where the general elections of 1991, 1996, 2001 and 2008 were the only four held under caretaker governments. All others were held under the control of the ruling party and could not be impartial, just and credible. read more

Please follow and like us:
Read More