নির্বাচনী গণতন্ত্রের অরিয়েন্টালিস্ট ইউটোপিয়া

বখতিয়ার আহমেদ
গত ৩০ ডিসেম্বর শুধু বাংলাদেশে না, উপনিবেশিক আফ্রিকার ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’, কঙ্গো’তেও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের ‘ফলাফল’ প্রায় ‘রাতারাতি’ জানা গেলেও, সেখানে ফলাফল ঘোষণা হয়েছে গতকাল ৯ জানুয়ারি। নির্বাচন কমিশন প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলার বিরোধী নেতা ফেলিক্স চিশেকেদি’কে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। সংবিধান অনুযায়ী দ্বিতীয় মেয়াদও শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারা প্রেসিডেন্ট কাবিলা ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন যার ফলে দেশটিতে তার দেড় যুগ শাসনের অবসানসহ ১৯৬০ সালের পরে প্রথমবারের মতন রক্তপাতহীন সরকার বদলের সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।
জোসেফ কাবিলা ক্ষমতায় আসেন ২০০১ সালে এক ব্যর্থ অভ্যূত্থানে বাবা লরেন্ট কাবিলা নিহত হওয়ার পরে। লরেন্ট ক্ষমতায় এসেছিলেন ১৯৯৭ সালে এক সফল অভ্যূত্থানে কঙ্গোর ৩১ বছরের স্বৈরশাসক মবুতু সেসে সেকো’কে ক্ষমতাচ্যূত করে। ছেলে জোসেফ ‘যদি’ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, আজকের ‘ডেমক্রেটিক রিপাব্লিক অফ কঙ্গো’ স্বাধীনতার ছয় দশকের মধ্যে পঞ্চম রাষ্ট্র প্রধান পাবে। যদিও এর মধ্যে নির্বাচন হয়েছে ১১টি, ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার বছরের প্রথম নির্বাচনে জয়ী প্যাট্রিক লুমুম্বার বছর চারেকের সরকার ছাড়া কঙ্গোতে আসলে আর কখনো কোন নির্বাচিত সরকার আসেনি। ১৯৬১ সালে মবুতু সরকার লুমুম্বাকে গাছে বেঁধে গুলি করবার পর থেকে কঙ্গোতে কেউ আর নির্বাচনের সাথে গণতন্ত্রের কোন সম্পর্ক আছে বলে ভাবেনা।
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছিল, গণমাধ্যমগুলোকে কড়া নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। বাংলাদেশ নয়, কঙ্গোর কথা বলছি। ২০ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে জোসেফ কাবিলার মেয়াদ শেষ হলেও নানা অজুহাতে পেছাতে পেছাতে, নানা আন্তর্জাতিক চাপে সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছিল। কিন্তু ২০ ডিসেম্বর রাতে নির্বাচন কমিশনের গুদামে এক রহস্যময় আগুনে ৮০০০ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন পুড়ে গেলে আরো এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়া হয় নির্বাচন। নির্বাচনের পরে ৬ জানুয়ারি প্রাথমিক আর ১৫ জানুয়ারি চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করে ১৮ জানুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন ঠিক হয়। কিন্তু ৫ জানুয়ারি আবার ঘোষণা আসে যে অর্ধেকেরও কম ভোট পড়ায় ফলাফল ঘোষণা আরো দেরি হবে।
এর মধ্যেই ৭ জানুয়ারি প্রতিবেশি তেল-সমৃদ্ধ দেশ গ্যাবনে প্রেসিডেন্ট আলী বঙ্গ’র বিরুদ্ধে এক ব্যর্থ অভ্যূত্থান ঘটায় সে দেশের সেনাবাহিনীর একাংশ, বঙ্গ পরিবারের পঞ্চাশ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পূণঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে। যদিও ১৯৬১ সাল থেকে নির্বাচনী ব্যবস্থার শুরু হয়ে, ১৯৬৭ সাল থেকে বাবার ৪১ বছর আর ছেলের ৯ বছর শাসনের এই দেশটিতেও প্রায় নিয়মিতই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলী বঙ্গ’ও ২০০৯ ও ২০১৬ সালে দুই দফা নির্বাচন করেছেন এবং তার দলের নাম ‘গ্যাবনিজ ডেমক্রেটিক পার্টি’, যা মাঝখানে ২২ বছর গ্যাবনের একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল ছিল এবং সেসময়েও নির্বাচন হয়েছে।
যা হোক, গ্যাবনের অভ্যূত্থান কঙ্গোর নির্বাচনের হিসেবও সম্ভবত পাল্টে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গ্যাবনে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি, কঙ্গোতে অবস্থানরত মার্কিনীদের দেশত্যাগের পরামর্শও দেয়া হয় দূতাবাসের বরাতে। এর মধ্যে প্রধান নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ‘ক্যাথলিক চার্চ’ পশ্চিমা কূটনীতিক মহলে জানায় যে তাদের হিসেবে বিজয়ী হয়েছে মার্টিন ফায়ুলু। কিন্তু ৮ জানুয়ারিতে জোসেফ কাবিলার সাথে মিটিং শেষে তারা সেটা অস্বীকার করে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রেসিডেন্টের সদিচ্ছার উপর আস্থা প্রকাশ করে। একই দিনে কাবিলা সরকার আর ফেলিক্স চিশেকেদি’র মধ্যে গোপন আলোচনার কথা অস্বীকার করেন কাবিলার একজন উপদেষ্টা। পরের দিন নির্বাচন কমিশন চিশেকেদিকে বিজয়ী ঘোষণা করে, জুনের এক প্রাক-নির্বাচন জরিপে যার বিরোধী ভোট পাওয়ার সম্ভবনা ছিল ৫%। একই জরিপে ৫৪% ভোট পাওয়ার সম্ভবনা থাকা মইসে কাটুম্বিকে আগেই নির্বাচন কমিশন অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।
‘অন্ধকার মহাদেশ’ আফ্রিকার দেশগুলোর নির্বাচনী গণতন্ত্রের সাথে বাংলাদেশ কিম্বা অপরাপর ‘উন্নয়নকামী’ অপাশ্চাত্য দেশগুলোর মিল বা অমিল খোঁজা যেতে পারে, কিম্বা অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে খারিজও করা যেতে পারে। কিন্তু তারপরেও উত্তর-উপনিবেশিক বিশ্ব-ব্যবস্থার একাডেমিক বিশ্লেষণে ‘কঙ্গো’ দেশটির একটা প্রতীকি তাৎপর্য আছে। ইংরেজী সাহিত্যের পোলিশ লেখক জোসেফ কনরাড ১৮৯৯ সালের উপন্যাসিকা ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’-এ রহস্যময় কঙ্গো নদীর উজান বেয়ে এক রহস্যময় চরিত্র ‘কুর্জ’ এর মধ্য দিয়ে উপনিবেশিক শাসনের যে রক্তাক্ত ইতিহাস লিখেছিলেন, সেটা বোধহয় এখনো অপ্রাসঙ্গিক না। কনরাডের ‘কুর্জ’, খুব অল্প কথায় বললে, উপনিবেশিক কঙ্গোতে হাতির দাঁত হাতানো এক বেলজিয়ান কোম্পানীর দারুণ চৌকষ ও সফল কর্মকর্তা, যে পাশাপাশি কালো মানুষদের সভ্য করতে গিয়ে তাদের অবতারসম এক মানুষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ‘অবতার’ তারপরেও কালাদের প্রতি ভীতি, বিদ্বেষ আর বিবমিষা নিয়েই শেষমেশ মরে যান উপন্যাসের কথক চরিত্র মার্লো তাকে উদ্ধার করে আনবার পথে।
বোদ্ধাদের মতে, কনরাড আফ্রিকা নিয়ে সে সময়ের ইউরোপীয়ানদের মনভঙ্গীকেই আঁকতে চেয়েছেন এই চরিত্রটিতে। পশ্চিমা চোখ দিয়ে প্রাচ্য সমাজ বিচারের মনোভঙ্গী, যাকে পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যপ্রাচ্য নীতির সবচে কঠোর সমালোচক নাম দিয়েছিলেন ‘অরিয়েন্টালিজম’, সেই এডোয়ার্ড সাইদেরও গোড়ার কাজ ছিল জোসেফ কনরাডের সাহিত্য নিয়ে যা তাঁর চিন্তার গড়নকেও গড়ে দিয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস। ‘গড ফাদার’ খ্যাত পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলাও ভিয়েতনাম যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার প্রতিকৃতি আঁকতে গিয়ে তার ‘এপোকাইলিপ্স নাউ’ চলচ্চিত্রের আদল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কনরাডের এই উপন্যাসটি, কর্নেল ‘কুর্জ’ চরিত্রটিসহ।
সাইদের মতন উত্তর-উপনিবেশিক ইতিহাসবোধের জায়গা থেকে তাকালে, ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’কে আজকের কর্পোরেট শাসিত সমরতান্ত্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থায় মক্কেল রাষ্ট্রগুলোতে মহাজন রাষ্ট্রগুলোর পৌরহিত্যে অনুষ্ঠিত স্রেফ একটা রাজনৈতিক ‘আচার-অনুষ্ঠান’ মনে হয় যেখানে জনগণ আদতে পশ্চিমা পৌরধর্মে ধর্মান্তরিত পুজারি মাত্র। রাজনীতিকদের মন্ডপে প্রসাদ আর পূণ্য লাভের আশায় যারা মাঝে মাঝে এসে লাইনে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যদিয়ে ইউরোপ-কেন্দ্রিক সনাতন উপনিবেশিক বিশ্ব-ব্যবস্থা ভেঙ্গে উদয় হওয়া নতুন জাতিরাষ্ট্রগুলোর সামনে দুই পরাশক্তির কোন একটির বলয়ে যাওয়ার চাপ ছিল। কম্যুনিস্ট বলয়ের একদলীয়-একনায়কী শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে পুঁজিবাদী ইউরো-মার্কিন আদলের দ্বিদলীয় নির্বাচনী গণতন্ত্রকে মহিমান্বিত করবার শুরু সেসময় থেকেই। ষাট-সত্তুরের দশকে আফ্রিকা-এশিয়া-দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দেশগুলোর সমাজতন্ত্রঘেঁষা জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামগুলোর নিজস্ব গণতান্ত্রিক সম্ভবনা একে একে মারা পড়তে থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মার্কিন মদদপুষ্ট সামরিক অভ্যুত্থানের হাতে। আশির দশক থেকে এই সামরিক একনায়কেরাই মূলত দেশগুলোতে পরের দ্বি-দলীয় গণতন্ত্র দাঁড় করানোর কারিগর, সেটা স্বেচ্ছায় হোক কিম্বা আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকদের চাপেই হোক।
নব্বই দশকের সোভিয়েত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে নিরঙ্কূশ হওয়া এককেন্দ্রিক কর্পোরেট বিশ্ব-ব্যবস্থায় এই দ্বিদলীয় নির্বাচনী ব্যবস্থাই গণতন্ত্রের একমাত্র সূচক বা শর্ত হিসেবে উদযাপিত হতে থাকে। কর্পোরেট মিডিয়া আর জাতিবাদী ভাবাদর্শের উচ্চকিত বোলচালে চাপা পড়ে এই সত্য যে এই ‘নির্বাচনী গণতন্ত্রে’র সাথে প্রকৃত গণতন্ত্র তথা জনগণের ক্ষমতায়নের তেমন কোন সম্পর্ক নেই। নির্বাচন আসলে এই ইউরো-আটলান্টিক বেনিয়া ক্ষমতাতন্ত্রের বিশ্ব-ইতিহাস থেকে ভেসে এসে আমাদের মনে গেড়ে বসা একটা ইউটোপিয়া যা তাদের মক্কেল ক্ষমতাতন্ত্রকে যেমন একদিকে টিকিয়ে রাখে, অন্যদিকে এর দখল নিয়ে বিবাদমান পক্ষগুলোর সংঘাতকে সহনীয় মাত্রায় রাখবার উপায় হিসেবে কাজ করে, যাকে আমরা সাধারণত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ধরনের কথাবার্তা হিসেবে শুনতে পাই। এই ইউটোপিয়ার স্বরূপ চিনতে হলে এইসব বোলচালের বিভ্রম সরিয়ে আমাদের কয়েকটা জিনিস স্পষ্টতই খেয়াল করতে পারতে হবে।
প্রথম; নির্বাচন মানে গণতন্ত্র না, গণতন্ত্রের কোন মৌলিক উপাদান না। কোন কোন ক্ষেত্রে এইটা গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতির সাময়িক প্রতিকার মাত্র। চিকিৎসা মানে যেমন স্বাস্থ্য না, স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের প্রতিকার মাত্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইটা গণতন্ত্র বিনাশী একটা প্রক্রিয়া যা প্রকৃত গণতন্ত্রকে শুকিয়ে মারার কাজে লাগে। কারণ সবচেয়ে আদর্শ কল্পনাতেও নির্বাচন মূলত সংখ্যাগুরুর শাসক পছন্দ করবার উপায়মাত্র। কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র মানে সংখ্যাগুরুর শাসন না, তাদের পছন্দের সংসদ, সরকার কিম্বা সংবিধান না। প্রকৃত গণতন্ত্র মানে সর্বজন-বিরচিত, সর্বজন-বিদিত, সাধারণ্যের সর্বসম্মত সোশাল কন্ট্রাক্ট। সমাজে সেইটা ক্রিয়াশীল থাকলে সাংসদ কিম্বা সরকারের আর দরকারই পড়ে না মানুষের।
দ্বিতীয়ত; নির্বাচন গণতন্ত্রকে ‘প্রতিনিধিত্বে’র নামে প্রতি পাঁচ-বছরের জন্য ফাঁস পড়িয়ে রাখে। নির্বাচনী ব্যবস্থায় পাঁচ বছরে একবার ভোট দেয়া ছাড়া নাগরিক বা সমাজের সরকার বা রাষ্ট্রের উপরে আর কোন নিয়ন্ত্রনই থাকেনা। এই পাঁচ বছর নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্র মানে স্রেফ আমলাতন্ত্র আর তার অলি-গলি-সন্ধির গোলক ধাঁধাঁয় ঘুরপাক খাওয়া।
তৃতীয়ত; সংখ্যাগুরুত্বের দোহাই দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও নির্বাচন আসলে তিনশ থেকে পাঁচশ লোকের খুব ছোট একটা দলকে কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার নিয়ন্তা বানিয়ে রাখে। সেজন্যই উনারা সন্ত্রাস আর সংখ্যাগুরুত্বের দোহাই দিয়ে নির্বাচন নামের একটা ফানুশ বানিয়ে রাখেন, সমাজকে বিভক্ত করে রাখবার নানা কায়দা-কানুন তৈরী করতে থাকেন। প্রায়শই আবার সেইটা ঝুলিয়ে রেখে তামাশা দেখেন।রাজনীতির নামে সোশাল কন্ট্রাক্টের বদলে সহিংসতার শাসন জারি রাখেন।
চতুর্থ; রাষ্ট্রীয় শাসন প্রণালী যেহেতু বল-প্রয়োগ নির্ভর, সংখ্যাগুরুত্বের গণতন্ত্র আদতে সামরিক শাসনেরই নামান্তর। এইটা ভোট দিয়ে দুই ভোটের মাঝের বছরগুলোতে কারা আপনাকে বৈধ এবং অবৈধভাবে ঠ্যাঙাবে সেইটা চুজ করবার ব্যাপার। সে বিচারে নির্বাচন আসলে সাংসদ নামের নির্বাচিত স্বেচ্ছাচারীদের শাসন কায়েম করে- যারা আইন বলতে শাসন বোঝেন, শাসন বলতে সন্ত্রাস বোঝেন, সরকার বলতে দল বোঝেন, দল বলতে দলনেতা বোঝেন। যারা উন্নয়ন বলতে প্রকল্প বোঝেন, প্রকল্প বলতে টেন্ডার বোঝেন, টেন্ডার বলতে টাকা বোঝেন; নাগরিক বলতে ভোটার বোঝেন, আর ভোটার বলতে ভোদাই বোঝেন।
পঞ্চমত; আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পৃষ্ঠপোষক না থাকলে, তাদের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতায় না থাকলে, কর্পোরেট বিশ্ব-ব্যবস্থার অনুকুলে জনবিরোধী অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি না দিলে, বল্গাহীন বাজার ব্যবস্থায় উম্মত্ত মুনাফার ম্যানেজারি না করতে পারলে, এসবের ফলে বাড়তে থাকা আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে মাথা ঘামালে; এবং এগুলো টিকিয়ে রাখা গণবিরোধী শাসন-প্রণালী কায়েম করতে না জানলে কোন দলই এই নির্বাচনী বৈতরনী পেরুতে পারে না।
ষষ্ঠত; ফলে একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় যে এই দ্বিদলীয় নির্বাচনী দোসরদের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক বা প্রশাসনিক নীতির মধ্যে তেমন কোন পার্থ্যক্য থাকেনা। জাতিবাদ, ইতিহাস, ধর্ম, কিম্বা অন্য ভাবাদর্শ নিয়ে মারামারি যদিও চলতে থাকে।
সপ্তমত; এইরকম পরিস্থিতিতে নির্বাচনে নাগরিকদের হাতে ‘মন্দের ভাল’ ছাড়া বেছে নেয়ার মতন আর কিছু থাকেনা।এইটা খানিকটা আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থায় পশ্চিম থেকেই আসা ‘এমসিকিউ’ পদ্ধতির প্রশ্নের মতন, শুধু প্রদত্ত উত্তর চারটার বদলে দুইটা থাকে। গোল্লা পূরণের বদলে, ভাগ্য ভাল হলে, সীল মেরে আসতে হয়।
অষ্টমত; কর্পোরেট মিডিয়ার প্রবল আবির্ভাব ‘জনমত’কেও নানা ভাবাদর্শিক বোলচালে বিপনন-কৌশলের আওতায় এনে কোন একটি পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করবার মতন ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছে। ফলে প্রচারণার জোরে, নানা জিগির তুলে, এই জনমতকে যে কোন দিকে খেদিয়ে নেয়া যায়।
২০০১ সালের পরে, ‘ওয়ার অন টেররে’র বিশ্ব-রাজনীতি কায়েম হওয়ার পরে নির্বাচনী রাজনীতিতে দূর্বোধ্য সব সূচক আর বিরাট বিরাট নির্মাণ যজ্ঞে মাপা ‘উন্নয়ন’, আর ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’র প্রশ্নটি আর সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ফলে এই কমপক্ষে দ্বিদলীয় কোন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বৈধতা অর্জন করাটা আর কূট-কৌশলী কোন সরকারের জন্য খুব জরুরী কিছু থাকছে না। তারচেয়ে বৈশ্বিক ও স্থানীয় কর্পোরেট মহাজনদের দক্ষ ম্যানেজারি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মোড়লদের বিশ্বস্ত মক্কেলি, আর বিরোধী দল কিম্বা বিক্ষুব্ধ পাবলিক দাবড়ানোর কলা-কৌশল জানা থাকলে এখন জনমত কিম্বা ভোটের তোয়াক্কা না করলেও চলে। সেই দাবড়ানি দেখে সবচেয়ে সরল মনের প্রাচ্যবাদী দেশি কিম্বা বিদেশী ইংরেজটিও হয়তো শেষমেষ এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবেন — নাহ এরা এখনো গণতন্ত্রের যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি।
কঙ্গোর ঘটনা বুঝতে গিয়ে মনে হল এই নির্বাচনী গণতন্ত্রের ইউটোপিয়া যারা আমাদের গিলিয়েছিলেন, তারাই তো এটাকে স্রেফ একটা পাঁচশালা পরব বানিয়ে ফেলেছেন, এমনকি নিজেদের দেশেও। আর আমার ‘নব্বইয়ের মহান গণ-অভ্যূত্থানে’র ইল্যূশন কাটাতেই বয়সের প্রায় অর্ধেক কেটে গেল, সমস্যাকেই সমাধান ভেবে ভেবে কেটে গেল এতগুলান বছর, এই ইউটোপিয়া চিনতে আজকে কঙ্গো-বঙ্গ ঘুরে আসতে হল!
আফসোস !

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *