বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনগণের ভোটাধিকার

মাসকাওয়াথ আহসান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) এবং পশ্চিমের দেশগুলোতে বস্ত্র রপ্তানী করে পাওয়া অর্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে মানুষের ন্যুনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের স্বাধীনতা না থাকলে; স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণাটি হারিয়ে যায়। এটি একটি উপনিবেশের চেহারা নেয়। দেশের ভেতরের একদল মানুষ তাদের উপনিবেশ গড়ে তুলেছে; এরকম একটি অনুভব তীব্র হয়ে ওঠে।

ফলে প্রবাসী বাংলাদেশের নাগরিকেরা দেশে অর্থ প্রেরণ, সঞ্চয় ও বিনোয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ মনে করবে। ব্যাংক সেক্টরে যে ভীতিপ্রদ লুন্ঠন পাশাপাশি বিদেশে বিপুল টাকা পাচারের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে; তাতে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে।

এটা স্বাভাবিক ব্যাপার; যে মানুষটি রক্ত পানি করা পরিশ্রমে অর্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছে; সেই অর্থের ও সম্পদের নিরাপত্তা বোধ হারিয়ে গেলে; যে, যে দেশে কাজ করছে; সেখানেই সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করবে। কারণ অর্থ ও সম্পদের নিরাপত্তা রয়েছে সেখানে।

বস্ত্রখাতে রপ্তানী থেকে আসা উপার্জন বাংলাদেশ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই পোষাক রপ্তানীর ক্ষেত্রে ইউরোপ ও উত্তর এমেরিকার বাজারে কোটা সুবিধা উপভোগ করে বাংলাদেশের বস্ত্র ব্যবসায়ীরা। তাদেরকে ঐসব দেশে পণ্য প্রবেশে শুল্ক কম দিতে হয়; এতে মুনাফা বেশি হয়। এতে রপ্তানী আয় বেশী হয়।

রানা প্লাজার এগারোশো বস্ত্রশ্রমিকের লাশের ট্র্যাজেডি আর শ্রমশোষণের নির্মম বাস্তবতা আড়াল করে হলেও; বাংলাদেশের বস্ত্র শ্রমিকদের কাজের শৈলী ও উপায়হীনতার মাঝে বেঁচে থাকার অদম্য আকাংক্ষার কাঁধে পা দিয়ে বস্ত্র ব্যবসায়ীরা প্রতিদিনই ধনী থেকে ধনীতর হচ্ছে। বস্ত্র খাতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গ্রাফটি সেলাই শ্রমিকের রক্তের আখরে লেখা সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

এমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রে যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করছে; সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ কেমন তা যাচাই করে। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনটির দিকে স্বাভাবিক নিয়মেই তীক্ষণ চোখ রেখেছে পোষাক আমদানীকারক দেশগুলো।

ইতিমধ্যে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ভিন্নমত দমনে নাগরিকদের কারাগারে নিক্ষেপের ঘটনাগুলোর খবর বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের নানা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। ফলে পুলিশি শক্তি, দলীয় পেশীশক্তি, আদালতের আনুগত্য ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রার্থীকে সরিয়ে দিয়ে বিনাভোটে বেশ কিছু আসনে ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ বানিয়ে নিয়ে আসা সহ একপেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে নৈরাজ্যকর অর্কেস্ট্রা দৃশ্যমান; এসবের দিকে নজর রেখেছে পোষাক আমদানি কারক রাষ্ট্রগুলো। উল্লেখ্য যে বস্ত্র খাতের রপ্তানী বানিজ্যে ভারত বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভারতের সাম্প্রতিক বিধান সভা নির্বাচন ছিলো সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ,শান্তিপূর্ণ ও গণতন্ত্রের মানদণ্ডে প্রশংসনীয়।

তাই একদলীয় শাসন কায়েমের যে কোন অপরিণামদর্শী ক্রিয়াকলাপ বাংলাদেশের বস্ত্র রপ্তানীর জানালাগুলো বন্ধ করে দিতে পারে; এ আশংকা তীব্র।

বাংলাদেশের উপার্জনের আরেকটি ক্ষেত্র জাতিসংঘ শান্তিমিশনে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মী প্রেরণ, অস্ত্র ও যানবাহন ভাড়া দেয়া। সৎ পুলিশ ও সেনাকর্মীদের জন্যও জাতিসংঘ শান্তিমিশনে কাজ করার সুযোগ সম্মানজনক; বড় একটি উপার্জনের একমাত্র ক্ষেত্র। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তারা আইন-শৃংখলা রক্ষায় ব্যর্থ হলে তা বড় প্রশ্ন জন্ম দেবে; যে আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী নিজ দেশেই একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারেনা; সে বাহিনী জাতিসংঘ শান্তি মিশনে শান্তি ও সমঝোতা স্থাপনে সক্ষম হবে কীভাবে!

আমরা যাকে ভূ-রাজনীতি বলি তা আসলে অর্থনীতি ও বানিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বের রাষ্ট্র সমূহের পারস্পরিক আদান প্রদান নির্ভর। কাজেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুরন্ত সহিসটিকে বাধাবন্ধহীন রাখাই হওয়া উচিত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মূল লক্ষ্য। নইলে আজ যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আমরা গর্ব করছি; তা হারিয়ে যেতে পারে গণতন্ত্রের প্রস্তুতিহীন স্বৈর আচরণে।

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *