পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ না হওয়াই সঙ্গত

আলতাফ পারভেজ
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টে ‘বাংলা’ রাখার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে দুদিন হলো। নয়াদিল্লীর এই সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হয়েছে।
এটা আবেগ-গন্ধমাখা কোন বিষয় ছিল না। ফলে এতে বাংলাদেশকে ফেইভার করারও কোন অবকাশ ছিল না– যেমনটি প্রচার করা হচ্ছে গত ৪৮ ঘন্টা ধরে।
মূল বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ– কেউ কি এককভাবে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের দাবিদার হতে পারে? সোজাসাপ্টা উত্তর হলো, না পারে না।
পশ্চিমবঙ্গ ভারতভুক্ত বাংলাভাষীদের একটা রাজ্য। আর বাংলাদেশ বাঙ্গালি-চাকমা-মারমা-সাঁওতালসহ আরও অনেক মানুষদের একটা স্বাধীন দেশ। যদিও পশ্চিমবঙ্গের মতোই বাংলাদেশেও বাঙ্গালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু দুই সীমান্তের কেউই এককভাবে ‘বাংলা’ নামটি দাবি করতে পারে না। আপাতত বাঙ্গালিরা প্রধানত দুটি দেশের সীমান্তে আবদ্ধ– তারা সাংস্কৃতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত এক জাতি, এটাই বাস্তবতা। উপরন্তু ত্রিপুরা, আসাম, করাচিতেও বিপুল বাঙ্গালি আছে। সুতরাং এককভাবে কোন ভূ-খন্ডের জাতিগত অভিভাবক সাজার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে অনেকেই তারস্বরে এদেশকে ‘বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ’-এর বিজয়ী ভূমি বললেও এই দাবিতেও সারবস্তু আছে সামান্যই। কারণ বাংলাদেশ– বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিজয়ী ভূমি হলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালিদের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে খারিজ করা হয়। একই সঙ্গে খারিজ করা হয় এখানকার অন্যান্য জাতিসত্তার পরিচয়কে। সামগ্রিক রাজনৈতিক বিবেচনায় ‘বাংলা’ হয়তো বাংলাদেশের সঙ্গেই মানায়– কিন্তু উপনিবেশমুক্তির সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ জাতিবাদী সংকীর্ণতার সেই পরিসর অতিক্রম করে গেছে। তার মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সৌন্দর্য ছিল সেটাই।
জাতি ও দেশ যে পুরোদস্তুর দুটি ভিন্ন বিষয় এই প্রাথমিক জ্ঞানটুকু অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। মমতা ব্যানার্জি সরকার যে পুনঃপুন তিনবার তাঁদের রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ করার উদ্যোগ নিয়েছেন সেটা পুরোদস্তুর একটা রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল। এই প্রকল্পের সাংস্কৃতিক দাবি যে ত্রুটিপূর্ণ ছিল সেটা পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা জোরের সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলেননি। এটা দুঃখজনক।

পশ্চিমবঙ্গে নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিক রাজনীতি
কলকাতায় তৃণমূলের নাম বদলের এই রাজনীতিকে মূলধারার অন্যান্য দলও সমর্থন দিয়েছিল– সেটাও বাংলাদেশ থেকে গভীর বেদনার সঙ্গে আমরা দেখেছি। এটা করে তাঁরা বাংলাদেশের প্রতি অবিচার করেছিলেন। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বন্ধনের রাজনৈতিক সম্ভাবনার ভবিষ্যত গুরুত্বও তারা বোঝেননি বলেই মনে হয়েছে। এমনকি ‘বাংলা’ ভাষার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির অধিকতর মাখামাখি দার্জিলিং ও কালিমপংয়ে গুর্খা ও নেপালিদের তরফ থেকে গত বছর কীরূপ প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল সেটাও বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগের সঙ্গেই নজর রেখেছিল।
সর্বশেষ দেখছি, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নেতৃবৃন্দ নয়াদিল্লীর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি হলো বিজেপি যখন ভারতজুড়ে নাম পরিবর্তনের হিড়িক ফেলেছে তখন পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনে বাধা দেয়া ঠিক হয়নি। খুবই দুর্বল ও শিশুসুলভ একটি যুক্তি এটা। বিজেপি ভারতজুড়ে মূলত বেছে বেছে মুসলমান ঐতিহ্যমন্ডিত শহর ও স্থানগুলোর নাম পাল্টাচ্ছে। এটা তাদের ফ্যাসিবাদী সাম্প্রদায়িক মনোভাবের অন্যতম দিক। তার বিরুদ্ধে ভারতজুড়েই ন্যায়সঙ্গতভাবে অনেক প্রতিবাদ হচ্ছে। তৃণমূলও সেই প্রতিবাদে শামিল। সেই প্রতিবাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের ইস্যুকে যুক্ত করা হাস্যকর।
উপরন্তু, বিজেপি যেভাবে নাম পাল্টাচ্ছে সেটা যেমন জবরদস্তিমূলক– একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করার প্র্রস্তাবটিও কম জবরদস্তিমূলক নয়। একটা যদি হয় সাম্প্রদায়িক ঘৃণাজাত– আরেকটি তবে সাংস্কৃতিক উন্নাসিকতা জাত।
জবরদস্তির মনোভাব দক্ষিণ এশিয়াকে অনেক ভুগিয়েছে– আসুন একে প্রত্যাখ্যান করি।

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *