সৌন্দর্য উৎপাদন

সুসান রাঙ্কল

সৌন্দর্য উৎপাদন

অনুবাদক : সেলিম রেজা নিউটন

[মানুষী পত্রিকার প্রারম্ভিক নোট: উদারিকরণ-পরবর্তী ভারতে নতুন ধরনের নারী সৃষ্টির একটা জায়গা হিসাবে গড়ে উঠেছে মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনী। ভারতীয় ফ্যাশন, সিনেমা আর সৌন্দর্য-ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দের তত্ত্বাবধানে মিস-ইন্ডিয়া-প্রতিযোগিনীরা শেখেন কেমন করে লিঙ্গায়িত পরিচয় নির্মাণ করতে হয়। দুনিয়াজোড়া সৌন্দর্য-ইন্ডাস্ট্রিতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি এখানে টুকে রাখছেন সুসান রাঙ্কল।]

মিস-ইন্ডিয়া ২০০৩-এর প্রশিক্ষণে  আমি একজন নৃবিজ্ঞানী হিসাবে উপস্থিত ছিলাম। গবেষণা করা আর প্রতিযোগিনীদের জন্যে প্রশ্ন লেখার মতো সাধারণ সব কর্মকান্ডে সহায়তা দেওয়া ছিল আমার কাজ। গোটা এই সময় জুড়ে বারবার আমি আশ্চর্য হয়েছি সৌন্দর্য-রাণীর সৃষ্টি আর শিল্পবিল্পব থেকে উৎপত্তি-লাভ-করা শরীর সংক্রান্ত তত্ত্ব এই দুইয়ের মধ্যে মিল দেখে। শরীর এমন একটা যন্ত্র যার বিভিন্ন পার্টস মেরামত করা যায় এবং বদলানো যায়। শরীরকে এরকম একটা যন্ত্র হিসাবে বিবেচনা করার এতটা যুৎসই দৃষ্টান্ত সম্ভবত আর-কখনও ছিল না। তুলনা-মূলকভাবে সাধারণ এক দল তরুন নারীর মধ্য থেকে ২৬ জনকে সম্ভাব্য মিস-ইন্ডিয়া বানানোটা দেখিয়ে দেয় কোন অর্থে ডেভিসের মতো পন্ডিতেরা শরীরকে “সাংস্কৃতিক প্লাস্টিক” নামে ডাকেন। উপস্থাপনটাই এখানে জেন্ডারের প্রতীক (Kathy Davis, 1995)।সৌন্দর্য-প্রদর্শনী সংক্রান্ত লেখালেখি মনোনিবেশ করে মূলত প্রদর্শনীটার উপর। এসব লেখালেখি মোতাবেক, প্রদর্শনীটা হচ্ছে একটা স্পেস বা জায়গা; এই স্পেসটুকুর অভ্যন্তরে হয় পপুলার কালচারের (যেমন Sarah Banet-Weiser 1999; AR Riverol 1992; Lovegrove 2002), না-হয় তো গোলকায়নের (Colleen Cohen at al 1995) পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে। আমার বলার কথা হল: বেশিরভাগ নারীকেই তাদের যাপিত অভিজ্ঞতার পথে সৌন্দর্যের এসব মানদন্ডের সাথে অবশ্য-অবশ্যই বোঝাপড়া করতে হয়- এটুকু বুঝলে সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ হিসাবে এসব প্রদর্শনীর অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখা যেত। শুধু তা-ই না, নারীর অভিজ্ঞতার সমগ্র পরিধির মধ্যে লিঙ্গায়িত অভিজ্ঞতা বলতে আসলে কী বোঝায় তার আরও বেশি পরিষ্কার একটা ছবি পাওয়ার উপায় হিসাবেও এই বুঝটুকু মূল্যবান অবদান রাখত।

তরুণ নারীরা মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনীতে ঢোকে তাদের শরীরকে পুরাপুরি বদলে ফেলার আশাতেই শুধু নয়, কয়েক মাস পর মৌলিকভাবে বদলে-যাওয়া মানুষ হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার জন্যেও বটে। প্রশিক্ষণ-কর্মসূচিতে প্রথমে বিশেষজ্ঞদের, আর তার পর বিচারকদের, একভাবে-তাকিয়ে-থাকা দৃষ্টির অধীনে একেকজন নারী নির্দিষ্ট কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য সবচে বেশি করে তুলে ধরতে চেষ্টা করে। সংক্ষেপে  বলতে গেলে, এগুলা হচ্ছে এমনসব গুণ, যা খোদ মিস-ইন্ডিয়া নামক ধারণাটার সাথে জড়িত। এগুলা হচ্ছে সেইসব গুণ, যা মিস ইউনিভার্স বা মিস ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীগুলাতে ভারতীয় নারীত্বের চূড়ান্ত চেহারাটাকে আদর্শভাবে তুলে ধরতে পারে- মিস-ইন্ডিয়ার নিজ ভাষ্য অনুসারে।

১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারিকরণের পরে, বিশেষ একটা আয়োজনের সূত্র ধরে মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনী গড়ে উঠেছিল। সেই আয়োজনটাতে ভারতীয় টেক্সটাইলকে পূর্ণাঙ্গ একটা মিডিয়া-অনুষ্ঠানের শোকেসের ভেতর পুরে হাজির করা হয়েছিল। উদারিকরণ-পরবর্তীকালে ফেমিনা-ম্যাগাজিন আর মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে সবচে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা হচ্ছে, জাতীয় পরিচয়ের উপর থেকে ফোকাসটা সরে গিয়ে ব্যক্তিগত পরিচয়ের উপর পড়া। বর্তমান ফেমিনা-সম্পাদক সত্য শরণের বর্ণনায় মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনী হচ্ছে, ম্যাগাজিনটাকে এগিয়ে নেওয়ার এবং “তরুণ নারীদেরকে জীবনের মধ্যে নিক্ষেপ করার”র একটা উপায়। এই বর্ণনা দেওয়ার সময় বেশ চটজলদিই ছিলেন তিনি। সত্যিই, মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনীতে প্রতি বছর তিন জন করে বিজয়িনীকে বাছাই করা (যাদের খেতাব মিস-ইন্ডিয়া- ওয়ার্ল্ড, মিস-ইন্ডিয়া- ইউনিভার্স আর মিস-ইন্ডিয়া- এশিয়া প্যাসিফিক), এবং সুনির্দিষ্টভাবে একেকটা প্রদর্শনীর জন্যে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া- এটা শুধু উদারিকরণের পরেই ঘটল। এরপর, প্রত্যেক খেতাব-বিজয়িনী যার যার মিস-ইন্ডিয়া খেতাব অনুসারে নির্দিষ্ট এককটা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে প্রতিযোগিতা করতে যায়। এগুলার মধ্যে সবচে সম্মানজনক প্রদর্শনীটা হচ্ছে মিস-ইউনিভার্স।

মিস-ইন্ডিয়া হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রতি বছর আগস্টে বা সেপ্টেম্বরে। তখন ফেমিনা ম্যাগাজিন তাদের নিজেদের পাতায় এবং, সেই সাথে, তাদের গ্রুপের সবচেয়ে গুরত্বত্বপূর্ণ পত্রিকা টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র পাতায় এণ্ট্রি ফর্ম ছাপে। দেশের সমস্ত জায়গা থেকে কয়েক হাজার তরুণ নারী ফর্ম জমা দেন। সাথে দেয় তাদের নিজেদের ফটো- একটা পুরা শরীরের, আরেকটা হচ্ছে মুখের একটা ক্লোজআপ। এসব ফটোর ভিত্তিতে আরও সীমিত সংখ্যক তরুণ নারীকে প্রদর্শনীটাতে অংশগ্রহণ করতে ডাকা হয়, যদি তাদের উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির বেশি আর বয়েস ২৫-এর নিচে হওয়ার মাপকাঠিতে পড়ে। ফেমিনার প্রকাশক এবং প্রদর্শনীটার ম্যানেজার প্রদীপ গুহ তখন ভারতের প্রধান প্রধান শহুরে এলাকায় একটা সফরে বের হন। এই সফরের সময় তিনি দেখা করেন প্রত্যেক আগ্রহী প্রতিযোগিনীর সাথে। উদ্দেশ্য হল, চূড়ান্ত সেই ২৬ জন তরুণ নারীকে বাছাই করা যারা মিস-ইন্ডিয়া মুকুটের জন্যে প্রতিযোগিতা করবেন। মজার ব্যাপার হল, তিনি ঠিক করেই নিয়েছিলেন যে, ফি-বছর ফেমিনা-র বাছাই-করা শহুরে কেন্দ্রগুলাতে তরুণ নারীদের সাথে দেখা করার সময় তিনি শুধুমাত্র মিস-ইন্ডিয়াই খুঁজবেন না, বরঞ্চ একজন মিস ইউনিভার্স বা একজন মিস ওয়ার্ল্ডও খুঁজবেন। আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার বার্ষিক সন্ধান-কর্ম বর্ণনা করার সময় একথা তিনি জানান।

তথাপি, মিস-ইন্ডিয়া ধারণাটা যে শুধুমাত্র শহুরে, সেটা কিন্তু নতুন কিছু না। শহুরে ভারত আর পল্লী ভারতের মধ্যে ব্যাপক সাংস্কৃতিক বিভক্তি বিরাজমান। এই কারণেই, যেসব তরুণ নারী বড় শহরে বাস করে না, লাইফস্টাইলের দিক থেকে ঐ ধরনের মিডিয়া-ইমেজ তাদের আয়ত্তের মধ্যে থাকে না, যেমনটা তাদের শহুরে প্রতিপক্ষদের আয়ত্তে থাকে। এর ফলে, প্রদীপ গুহর মতে, বিশ্ব-মঞ্চে সুন্দরী হিসাবে নিজেদেরকে হাজির করতে গেলে যেরকম জ্ঞান থাকা লাগে সেটা তাদের থাকে না।

বিপুল পরিমাণে স্বাধীনতা পাওয়া পটভূমি থেকে আসা তরুণ নারীদের মধ্যেই প্রতীকের পুঁজি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়। অনেকে আসেন সামরিক পরিবার থেকে, লাইফস্টাইলের দিককার সার্বক্ষণিক সচলতা যাদেরকে- প্রদীপ গুহর বর্ণনা মোতাবেক- “খুবই সেক্যুলার, খুবই বহুদৈশিক এবং খুবই আধুনিক আর মেলামেশার দিক দিয়ে সামাজিক” করে তোলে। এটাই হল সেই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যা আঞ্চলিক পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে নয়, বরঞ্চ নিজ সংক্রান্ত আরও বিকেন্দ্রায়িত ধারণার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে। আজকের মিস-ইন্ডিয়া যে-বস্তু, এটা তার প্রতীক স্বরূপ।

খোদ ইভেণ্টটার আগে আগে, মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনী একটা ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ সেমিনার আয়োজন করে। এই এক মাস সময়ের মধ্যে ২৬ জন প্রতিযোগিনীকে রাখা হয়, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং সুন্দরী বানানো হয় এমন একটা প্রতিষ্ঠানে, যেখানে লক্ষ্য একটাই: একজন মিস ওয়ার্ল্ড বা মিস ইউনিভার্স বানানো। প্রত্যেক সকালে, এই ৩০ দিন যাবত, মিস-ইন্ডিয়া প্রতিযোগিনীরা দিনে দুইবার করে ফিটনেস ক্লাসে হাজিরা দেন, আর সুপরিচিত ডায়েট-বিশারদ অঞ্জলি মুখার্জির সরবরাহ-করা সব খাবার খান। আসলে, এই প্রদর্শনীর প্রত্যেকটা দিকেই গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রির সবচাইতে মশহুর লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরা দরকার সব কাজকর্ম করেন এবং সেসব করার মাধ্যমে প্রদর্শনীটার এমন একটা ইমেজ বানিয়ে তুলতে সাহায্য করেন, যা জীবনের চেয়েও বড়।  যেসব ব্যক্তি তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেন, তাদের সবাই সমস্ত শহুরে ভারতে চরম সুপরিচিত। তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ প্রদর্শনীটাতে প্রতিযোগিতা-করা তরুণ নারীদেরকে একটা সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মওকা দেয়। আর, এই নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে তাদেরকে ভারতের গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার বানানোর অবকাশ দেয়।

ফিটনেস আর ডায়েটের কর্মসূচির বাইরে অবশ্য মডেলিং, ফ্যাশন আর সিনেমা-জগতের উপরেও মাসব্যাপী এই সেমিনার বিপুলভাবে মনোনিবেশ করে। প্রদর্শনীটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বেশিরভাগ মিস-ইন্ডিয়া প্রতিযোগিনী যেহেতু এইসব জায়গাতেই যেখানে যায়, সেহেতু এটা মানানসই বটে যে, এই দিকটাতেই সেমিনারটার ঝোঁক বেশি।

ঘটনা হল, প্রদর্শনীটাতে যদি শুধু অন্তর্ভুক্তও হতে পারা যায়, সেটাই অনেক তরুণ নারীর বেলায় জীবন-বদলানো অভিজ্ঞতা হিসাবে কাজ করতে পারে। ভারতীয় ফ্যাশন, সিনেমা এবং সৌন্দর্য-ইন্ডাস্ট্রির বিশেষজ্ঞদের অধীনে এরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে এমন একটা প্রক্রিয়ায়, প্রদীপ গুহ যাকে বলেন, “বাটালি দিয়ে খোদাই করার কাজ”।

মিসওয়ার্ল্ডের উপাদানসমূহ

√মুম্বাই-শহরতলির একজন-কেউ

√সীরায় ভিজিয়ে রাখার জন্যে ফেমিনা মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনী

√ডায়েটের সারাৎসার (অঞ্জলি মুখার্জিরটা যেমন)

√হেমন্ত ‘শীতল’ ত্রিবেদীর কাছ থেকে একটা পাউডার-নীল মিশ্রণ। মিকি মেহতার উদার

পরিবেশন, বা রামা ব্যান্স-এর কাছ থেকে ব্যায়ামের সেশন।

√ত্বক-বিশেষজ্ঞ যমুনা পাই-এর কাছ থেকে ত্বকের যত্ন (খোসা-ছাড়ানো খাঁটিত্ব)

কেতাদুরস্ত সদাচরণের যাজিকা সাবিরা মার্চেণ্টের মিহি-চিকন দানা-দানা কথা

√ যথাসময়ে বাজারজাতকরণের তাড়না

√ ছিটিয়ে দেওয়ার জন্যে সরোভ্স্কি [এক ধরনের কৃত্রিম রত্ন- হীরার মতো]

√ বিবিধ পরামর্শ (ঐচ্ছিক) (টাইমস অফ ইন্ডিয়া ২৭শে ডিসেম্বর ১৯৯৬)

ওপরের ‘রেসিপি’ [রন্ধন-বস্তুর তালিকা] পরিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রতিযোগিনী খোদ নিজে নির্মিত হন বচন-বাচন-বয়ান-ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে, অন্তর্লীনভাবে। মিস-ওয়ার্ল্ড হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়াটাতে তিনি নিজে অবদান রাখেন সামান্যই। বরং, ‘এক্সপার্টরাই’ হচ্ছেন আসল লোক যারা মোট কাজের বেশিরভাগটা সম্পাদন করেন। খোদাই করে করে তারা তাকে একজন মিস-ওয়ার্ল্ড-এর যেরকম হওয়া উচিত সেরকম আদর্শ-বস্তুতে রূপান্তরিত করে ফেলেন। শহরতলির তরুণ একজন নারী আর দক্ষিণ বোম্বেতে বসবাসকারী অভিজাত-এলিট এক্সপার্টদের মধ্যে বিপুল শ্রেণীবিভক্তি আছে। প্রথম উপাদানটা অর্থাৎ “মুম্বাই-শহরতলির একজন-কেউ” (ঠিক যেভাবে এক্সপার্টরা কথাটাকে বলে থাকেন) আসলে ঐ শ্রেণীবিভক্তিরই একটা ব্যাঙ্গাত্বক উল্লেখ মাত্র।

একেবারে ঠিকঠাকভাবে বলতে গেলে, এ-প্রদর্শনীর মিস-ইন্ডিয়া-প্রতিযোগিনীদের পক্ষে সামাজিক সচলতার সুযোগটা ঘটে কিন্তু এই শ্রেণী-পার্থক্যের জন্যেই। যেমন ২০০৩-এর এক প্রতিযোগিনী মরিষা বলেছিলেন,

তুমি যদি না-ও জেতো, তবু তুমি কিছু পাচ্ছ, সুতরাং এটা কোনো অকাজের জিনিস না। এত এত যোগাযোগ ঘটছে তোমার, এটা শেষ হতে হতে তোমার হাতে পনরটা আলাদা আলাদা বিকল্প থাকছে। সিরিয়াল, র‌্যাম্প, যেকোনো কিছু।

যে-কায়দায় প্রশিক্ষণ-কর্মসূচিগুলা সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ প্রতিযোগিনীদেরকে দেয়, মরিষার বক্তব্যে তারই ইশারা। মিডিয়ার অসংখ্য এলাকায় ঢোকার একটা বন্দোবস্ত করে দেয় এই নেটওয়ার্ক। সামাজিক দিক দিয়ে ভারত এতই অবিশ্বাস্যভাবে সু-বিন্যস্ত যে, তরুণ কোনো নারীর পক্ষে অন্য কোনোভাবে এরকম একটা নেটওয়ার্ক বানানো সাধারণত অসম্ভব, যদি তার এলিট ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকে। অবশ্য শুধু অনভিজাত পরিবার থেকেই নয়, উপর-শ্রেণীর পরিবারগুলা থেকেও প্রতিযোগিনীরা আসেন। প্রশিক্ষণ-কর্মসূচিতে স্রেফ অংশগ্রহণটুকুও তরুণ নারীদেরকে যেসব সুবিধা দেয় তা উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে মরিষা আসলে সামাজিক গতিশীলতার প্রবেশপথ হিসাবে মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনী যেভাবে কাজ করে তার দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।

খ্যাতিমত্তার সংস্কৃতি এ·পার্ট হিসাবে বিবেচিতদেরকে প্রত্যেকটা বিষয়ের ওস্তাদ হিসাবে আসীন করে। তাদের মূল কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে যা যা দিয়ে প্রতীকী পুঁজি গঠিত হয় –  তার সবগুলাতেই এই এ·পার্টদেরকে ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। খ্যাতিমত্তার সংস্কৃতি হচ্ছে প্রধানত অর্থনৈতিক উদারিকরণের ফলাফল। অর্থনৈতিক উদারিকরণ এমন একদল মানুষের উদ্ভবকে দরকারি করে তুলেছিল, যারা আন্তর্জাতিক প্রবণতা আর শহুরে ভারতীয় পটভূমির মধ্যে তর্জমার কাজ করতে পারতেন। সবচে উঁচু মাপের বহুদৈশিক-বহুজাতিক ব্যক্তিবর্গ হিসাবে আসীন এই এক্সপার্টরা বিশেষ মান-ইজ্জত পেয়ে থাকেন। সেটা এই প্রদর্শনীতেও বটে, আবার সামগ্রিকভাবে পপুলার কালচারেও বটে।

এক্সপার্ট: যারা পুনঃনির্মাণ করেন

এক্সপার্টদের যে-প্যানেল দিয়ে ২০০৩ সালের প্রশিক্ষণ-স্টাফ গঠিত হয়েছিল, আগের বছরগুলার চেয়ে তা খুব একটা আলাদা ছিল না। মনে মনে জনাব পারিজি যেরকম ছবি আঁকেন, সেই গুরুকূল-পদ্ধতির অংশ হিসাবে প্রতিযোগিনীদের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার জন্যে স্বনামধন্য লোকজন আর বোম্বের মিডিয়া-জগতের সুপরিচিত ব্যক্তিবর্গের একটা তালিকা-মোতাবেক এই এক্সপার্টদেরকে বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন একজন ফ্যাশন-ডিজাইনার, একজন ত্বক-বিশারদ, একজন ডায়েট-বিশারদ, দুইজন হেয়ার-স্টাইলিস্ট, একজন মেকআপ-শিল্পী, একজন স্বঘোষিত ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা’ এক্সপার্ট, একজন ব্যক্তিগত কোচ, একজন কসমেটিক ডেণ্টাল-সার্জন, একজন আধ্যাত্বিক গাইড, একজন বাকভঙ্গি কোচ, কোনো একটা আর্ট-ফাউন্ডেশনের প্রধান ব্যক্তি, এবং একজন আলোকচিত্রী।

এক্সপার্ট হওয়া মানে বিভিন্ন প্রকার সুবিধা আর দায়দায়িত্ব বহন করা। সুবিধাগুলার মধ্যে সবচে উল্লেখযোগ্যটা হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত রূঢ় হওয়ার অধিকার। প্রদর্শনীটাতে প্রতিযোগিনীদের পরা পোশাক-পরিচ্ছদের নকশাপ্রণেতা এক ফ্যাশন-ডিজাইনার এর একটা চমৎকার দৃষ্টান্ত। ঐ ফ্যাশন-ডিজাইনারের প্রতি প্রতিযোগিনীরা যেন অতিশয় বিনীত থাকেন তার জন্যে প্রতিযোগিনীদেরকে সাবধান করে দিতে গিয়ে একজন কোরিওগ্রাফার ও ডিজাইনারকে বলতে হয়েছিল:

হতে পারে তিনি এই দুনিয়ার সবচে দরদী ব্যক্তি না, কিন্তু তার মানে এই না যে, তুমি তাকে কোনো খারাপ অনুভূতি দেবে। বিনীত হও, কারণ তিনি আমাদের সবচাইতে সিনিয়র এবং মানী ডিজাইনার।

যেহেতু তিনি একজন এক্সপার্ট, তাই যারা এক্সপার্ট না তাদের সবার উচিত তাঁর মেজাজ-মর্জিকে সমীহ করা।

এমনকি অন্য এক্সপার্টরা নিজেরাও প্রতিযোগিনীদেরকে সারাক্ষণই মনে করিয়ে দেন- এক্সপার্টদের সাথে তাদের কেমন ব্যবহার করা উচিত। মেকআপ-আর্টিস্ট হিসাবে কোরি ওয়ালিয়া প্রতিযোগিনীদেরকে একটা সেশনে বুঝিয়ে বলেছিলেন, কক্ষনো এটা কারও ধরে নেওয়া ঠিক না যে, একজন এক্সপার্টের যে-জ্ঞান নাই সেটা তার আছে (এমনকি ব্যাপারটা যদি খোদ তার নিজের সাথে সম্পর্কিত কোনো ব্যাপার হয় তবু)। জোর দিয়ে বলেছিলেন তিনি:

কী তোমাকে মানায় সেটা মেকআপ আর্টিস্টকে বলতে যেও না। উনি একজন পেশাজীবী। কেঁদেকেটে একশেষ হতে হবে তোমাকে। আর তোমাকে এমনকি থাপ্পড়ও খেতে হতে পারে।

শহুরে ভারতে সেলেব্রিটি-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা কতটা পোক্ত হয়েছে, এ·পার্টদের জ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার জবাবে শারীরিক সহিংসতার এরকম হুমকি দেওয়ার মাধ্যমে কোরি স্রেফ তারই দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। নিজের কাজের জন্যে একবার যদি কেউ খানিকটা পরিমাণে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জন করেন তাহলে তারা তাদের খামখেয়াল-মতো ব্যবহার করার অধিকারী হয়ে পড়েন বলে মনে করা হয়। এক্সপার্টদের দিক থেকে একেবারে চরম অপমানজনক ব্যবহার সহ্য করার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিনীদের ক্ষমতা দেখে প্রায়ই আমি বিস্মিত হতাম। কোনো কোনো প্রতিযোগিনীর সাথে এক্সপার্টরা যেভাবে কথা বলেন, সেভাবে কেউ যদি আমার সাথে বলতেন, কান্নায় ভেঙে-পড়া ছাড়া আমার উপায় থাকত না।

একজন সংগঠককে আমি বারবার দেখেছি, প্রতিযোগিনীদেরকে তাদের আচার-ব্যবহারের জন্যে বকাঝকা করছেন। ফাইনাল প্রদর্শনীতে পরিবেশনের জন্যে ‘মিস ট্যালেণ্ট’ খেতাবের কণ্ঠস্বর পরীক্ষার মহড়ার সময় একজন প্রতিযোগিনীর উপর তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন, যে নাকি তাঁর মতে অতিরিক্ত ফিকফিক করে হাসছিল।

এখন তুমি একজন ফেমিনা মিস-ইন্ডিয়া-প্রতিযোগিনী, এবং তোমাকে সেরকম একজনের মতোই ব্যবহার করতে হবে! আরও বেশি নারীর মতো হও।

আগের সপ্তাহে ট্রেনিং চলা কালে বিপুল পরিমাণ স্নায়বিক চাপের মধ্যে থাকা ঐ প্রতিযোগিনীকে অর্চনার এই নিষ্ঠুর স্বর কাঁদিয়েই ফেলেছিল প্রায়।

এক মাস ধরে এক্সপার্টদের নিয়ন্ত্রণ আর হুকুমদারির মধ্যে থাকে প্রতিযোগিনীদের জীবন। ত্বকের যত্ন, বাকভঙ্গি, খাদ্য-পানীয় থেকে শুরু করে আধ্যাত্বিকতা পর্যন্ত এই ট্রেনিং এমনভাবে সাজানো, যা দিতে পারে “জীবনের একটা সর্বসামগ্রিক শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ কর্মসূচি”। এই কথাই নির্বিবাদে বলে থাকে ফেমিনা। যে-ধরনের জীবন এই ট্রেনিং-প্রোগ্রামে চর্চা করা হয়, তা ঘুরপাক খায় শারীরিক দেখনদারিকে কেন্দ্র করে। যদিও শরীর আর খাদ্য-পানীয় ছিল সার্বক্ষণিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু, তথাপি প্রোগ্রামটার সবচে তাকলাগানো ফোকাস ছিল ত্বকের রঙের উপর।

শুধু ফরসাই সুন্দর

প্রতিযোগিনীদের ত্বক পরীক্ষা করার জন্যে ত্বক-বিশারদ ড. যমুনা পাই তাদেরকে নিয়ে সাপ্তাহিক যে-একেকটা সেশন চালাতেন আমি সেগুলাতে বসতাম। ২০০৩ সালের ট্রেনিং-প্রোগ্রামে তরুণ নারীদের একেবারে প্রত্যেকেই তার ত্বক (বিশেষত ত্বকের রঙ) বদলানোর জন্যে কিছু-না-কিছু ওষুধপত্র নিতেন। ত্বকের খোসা-ছাড়ানো-ওষুধ রেটিন-এ আর গ্লাইকোলিক এসিড, এবং আলাদা ধরনের গভীর গাঢ় দাগের বেলায় লেজার-চিকিৎসা বাৎলানোর মাধ্যমে, ভীতিকর-রকম গা-ছাড়া ভঙ্গিতে, ড. পাই সকল প্রতিযোগিনীকে তাদের ত্বক ব্লিচ করার প্রয়োজনের উপর জোর দিতেন। প্লাস্টিক-সার্জন হিসাবে লন্ডনে ট্রেনিং-নেওয়া ড. পাই-কে যখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ফরসা ত্বক এ-প্রদর্শনীতে এত দুশ্চিন্তার বিষয় কেন, তিনি তখন এই ব্যাখ্যা দিলেন:

ফরসা ত্বক নিয়ে আসলেই আমাদের একটা মোহাচ্ছন্নতা আছে। এটা একটা বাতিক। যারা এমনকি ফরসাদের মধ্যেও সবচে ফরসা, তাদেরও মনে হয় যে, তারা আরও ফরসা হতে চায়। [তবে] এটা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ না, কারণ আন্তর্জাতিক বিজয়িনীরা শ্যামলা থেকে প্রায়-কালো হয়ে পড়ছে। আপনি আমাদের মোহাচ্ছন্নতা দেখতে পাবেন না, কারণ আপনার ত্বক এরকম সুন্দর শাদা। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের ভেতরে এটা দৃঢ়মূল হয়ে আছে। যখন কোনো ভারতীয় পুরুষ বউ খোঁজে, সে এমন একজনকে চায় যে লম্বা, ফরসা আর ছিপছিপে। আর, বেশি ফরসারা আগে চাকরি পায়। শ্যামলা-ত্বকের মডেলদের আন্তর্জাতিক সাফল্যের কারণে আজকাল এটা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে, কিন্তু তবু আমরা এখানে তাদের ত্বকের রঙ উজ্জ্বল বানিয়ে দেই, কারণ এটা এসব মেয়েকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগায়, যখন তারা বিদেশে যায়।

আত্মবিশ্বাসের নামে তারপর এই প্রতিযোগিনীরা রাসায়নিক খোসা-ছাড়ানো আর নিত্যদিনের ওষুধপত্রের মধ্যে দিয়ে যায়। এসব ওষুধের কোনো-কোনোটার আবার খারাপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। যেমন ধরেন, হার্শিমরাত প্রায়ই ডাক্তারের কাছে কমপ্লেইন করত যে, তার দক্ষিণ ভারতীয় ত্বকের রঙ উজ্জ্বল বানানোর জন্যে যেসব ওষুধপত্র দেওয়া হয়েছে তার ফলে তার পেটের অসুখ পেটের অসুখ ভাব, আর দুর্বল দুর্বল লাগছে।

ত্বক বেশি স্বাস্থ্যবান দেখানোর জন্যে প্রতিযোগিনীরা বাড়তি জিনিসপত্র পেতেন। এগুলা অবশ্য সময়-সময় কাজে আসত না। একজন প্রতিযোগিনীর বেলায় ড. পাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

আমি তোমাকে দশটা করে মাল্টিভিটামিন দিচ্ছি, কিন্তু এখনও তোমাকে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে না। আমার ভয় হচ্ছে, এর একমাত্র সমাধান আরও আরও খাওয়া।

কোনো একজন প্রতিযোগিনীকে বেশি খেতে বলার জন্যে “ভীত” হওয়ার এই আইডিয়া, আর ত্বককে আরও স্বাস্থ্যবান বানানোর জন্যে আরও বেশি খাওয়ার কথা ভেবে ঐ প্রতিযোগিনীকে সত্যিসত্যি চিন্তিত দেখানো– এই দুই জিনিস ইঙ্গিত করে গভীর ত্রুটিপূর্ণ একটা জেন্ডার-সিস্টেমের দিকে। এই সিস্টেম অনুযায়ী মনে করা হয় যে, নারীর শরীর কখনই যথেষ্ট সুন্দর নয়।

মানবমেশিন

মিস-ইন্ডিয়ার শরীর নির্মাণ করার প্রজেক্টের অংশ হিসাবে প্রতিযোগিনীদেরকে দেওয়া হত ডায়েট-বিশারদ ড. অঞ্জলি মুর্খাজির দেওয়া পরিমিত খাবার। ওজন কমানোর বিভিন্ন সেণ্টার আর হেলথ-ফুডের জন্যে অঞ্জলি হচ্ছেন বোম্বের সবচে সুপরিচিত ব্যক্তি। আয়ুর্বেদ আর অ্যালোপ্যাথির সমন্বয় ঘটিয়ে, অঞ্জলি প্রত্যেক তরুণ নারীকে পরামর্শ দিতেন কেমন করে নিজের গঠনের সাথে মানিয়ে খেতে হয়। ইণ্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিযোগিনীদের জন্যে তার ডায়েট-পরিকল্পনার বর্ণনা শরীরকে মেশিন হিসাবে বিবেচনা করার মতোই শোনায়:

আমরা যে-ডায়েট দেই শরীর তাতে আরও খাঁটি আর আরও পরিশুদ্ধ হয়। আর, এটা দিয়ে তোমার যন্ত্রপাতি আরও ভালো কাজ করে। শরীর হল একটা গাড়ির মতো যার সার্ভিসিং দরকার পড়ে। এটা এরকমই সহজসরল ব্যাপার।

শরীরকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে অঞ্জলির গাড়ি সংক্রান্ত রূপকের ব্যবহার ট্রেনিং-প্রোগামটার বেলায়ই বরং বিশেষভাবে মানানসই। ডায়েট সম্পর্কে তার ধারণা মোতাবেক প্রত্যেক তরুণ নারীর উচিত তার শরীরের “যন্ত্রপাতি”র উন্নয়ন ঘটানো। গাড়ি সম্পর্কে অঞ্জলির ধারণার মতোই, প্রত্যেক প্রতিযোগিনীর শরীরকে একটা মেশিন হিসাবে ভাবা হয়, এক্সপার্টদের তত্ত্বাবধানে যার কর্মকুশলতার উন্নয়ন ঘটানো যায়।

কতখানি পাতলা হলে সেটা যথেষ্ট পাতলা হবে এই প্রশ্নটা গোটা প্রদর্শনী জুড়ে আমার মনের মধ্যে থেকেই গিয়েছিল। প্রদর্শনীটার জন্যে চেষ্টা চালানোর সময় বেশিরভাগ তরুণ নারী আমার বিচারে যখন অলরেডি নিম্ন-ওজনের হয়ে গিয়েছে, সেই অবস্থায় তাদের মধ্যকার শুধুমাত্র দুইজনকে (যারা মারাত্বকভাবে পুষ্টিহীন ছিল) এমন ডায়েট দেওয়া হল, যা ট্রেনিংকালে তাদের ওজনকে বাড়তে দেবে। ট্রেনিঙের পুরা সময়টা ধরে দুই জন তরুণ নারীকে আমি সত্যিসত্যি খাদ্য-বিশৃঙ্খলা [খাদ্যগ্রহণজনিত এক ধরনের অসুস্থতা] সাথে পরিষ্কারভাবে লড়াই-সংগ্রাম করতে দেখেছি। তাদেরকে দেখার কেউ ছিল না। অথচ অন্য প্রতিযোগিনীরা ঠিকই তাদের খাওয়ার প্যাটার্ণকে ঝামেলাপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

প্রতিযোগিনীরা কী খাচ্ছেন না-খাচ্ছেন সে-সম্পর্কে আমার লাগাতার আগ্রহ টের পেয়ে যাওয়ার কারণেই সম্ভবত, আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম শরীরের আদর্শ ওজনকে তিনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন, অঞ্জলি মুখার্জি তখন তাড়াহুড়া করে উল্লেখ করলেন যে, প্রতিযোগিনীদেরকে সুপুষ্টি দেওয়া হচ্ছে। যদিও তিনি বললেন, “শরীরের আদর্শ ওজনের একটা রেঞ্জ আছে”, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই রেঞ্জকে তিনি সংজ্ঞায়িত করলেন একজন তরুণ নারীর ওজন কতটা কমানো দরকার সেই বিচারে। রেঞ্জটা ছিল ৪ থেকে ১২ পাউন্ডের মধ্যে। এটা খেয়াল করাটাও অবশ্য গুরত্বপূর্ণ যে, এদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিনীও ছিলেন যাকে ওজন-বাড়ানোর ডায়েট দেওয়া হয়েছিল, অথচ তিনি যখন প্রদর্শনীতে ঢুকলেন, অঞ্জলির মনে হল, তখনও তিনি ১৪ পাউন্ড নিম্ন-ওজনের।

মিস-ইন্ডিয়ার শরীর তৈরি করার প্রজেক্টে অঞ্জলির ডায়েট যখন সাহায্য করছে, এদিকে তখন ফিটনেস-এক্সপার্ট মিকি মেহ্তা মনোযোগ দিয়েছেন শরীরকে উপলব্ধি করার দিকে। অন্য যেকোনো এক্সপার্টের তুলনায়, এই প্রদর্শনীটার সাথে সবচে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল মিকির। ২১ বছর যাবত তিনি একজন ফিটনেস-প্রশিক্ষক। প্রতিযোগিনীদেরকে তিনি প্রত্যেক দিন ব্যায়ামের রুটিন মোতাবেক পরিচালনা করতেন। এটা আরম্ভ হত প্রত্যেক দিন সকাল ৭টায়। এর মধ্যে বেশিরভাগই থাকত শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম। এসব ব্যায়াম শরীরের নমনীয় গঠন ধরে রাখে– পেশী বানায় না। পেশী মিস-ইন্ডিয়ার শরীরের অংশ না।

একটু আধ্যাত্বিকতার ছোঁয়া

ফিটনেসের ব্যাপারে মিকি একটা আধ্যাত্মিক মনোভঙ্গি অনুসারে চলেন। আর, অস্বাভাবিকভাবে তার ফোকাস থাকে সত্তার সামগ্রিকতার উপর। বিভিন্ন বিশ্বাসের জগাখিচুড়ি এবং সমন্বয়বাদী একটা ককটেল ব্যবহার করে প্রতিযোগিনীদেরকে তিনি গাইড করেন। গাইড করেন শুধুমাত্র শরীর হিসাবে নয়, সমগ্র ব্যক্তি হিসাবে।

দাও, তাও, জেন, যোগ– বিভিন্ন ধর্ম থেকে যা যা আমি পছন্দ করি সেগুলা নেই। ফোকাসটা থাকে সামগ্রিকতার ওপরে। ব্র্যান্ড-মার্কা আধ্যাত্মিকতায় আমি বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি একত্বে। সবকিছুই আসলে এক। যখন কেউ আয়নার দিকে তাকায়, এবং কোনো বিভ্রম নয়, খোদ নিজেকেই দেখে, তখন তারা প্রতারিত হয়। পদ্মফুল বিভ্রম– কাদা হচ্ছে বাস্তব। এর সাথে ওজন কমানোর কোনো সম্পর্কই নাই। সুন্দর শরীর হচ্ছে সেই শরীর, যা উপযুক্ত অনুপাত-সম্পন্ন– স্রেফ পাতলা শরীর নয়।

আধ্যাত্বিক বিশ্বাসসমূহ নিয়ে তাঁর চুম্বকের মতো আকর্ষক অদ্ভুতুড়ে সংমিশ্রণটা যদিও মনোমুগ্ধকর– এবং যদিও এক সময় আমি দেখলাম আমি দুই ঘণ্টা ধরে তাঁর কথা শুনছি, আর কতখানি সময় পার হয়ে গেছে সেটা খেয়ালও করিনি– তারপরও, ঘটনা হল এই যে, মিকির কাজ হচ্ছে এমন একটা শরীর গড়ে তোলা, যেটা আধ্যাত্বিকভাবে বিশুদ্ধ হওয়ার চেয়ে বরং পাতলা-ই।

ওজন কমানোর অগ্নিপরীক্ষা

যখন তাকে আমি আরও জিজ্ঞাসা করলাম, প্রতিযোগিনীদের জন্যে কী ধরনের শরীর তাকে বানাতে বলা হয়েছে, তিনি স্বীকার করলেন যে, মিডিয়া-জগতে শরীর জিনিসটা একটা পূর্বশর্ত। পাতলা হওয়াটাকে মিকি বিবেচনা করেন প্রয়োজনীয় পাপ হিসাবে। এই অনুচ্ছেদটা থেকেই তা বোঝা যায়:

আমার মনে হয় ওদের কেউ কেউ অতিরিক্ত পাতলা। কিন্তু সেটা আমার কারণে না। কাজের ধারাটাই এটা ডিম্যান্ড করে যে, ওরা এসবের মধ্যে…। নিতম্বের আশপাশ দিয়ে কিছু মেয়ে এত বিশাল ছিল যে তাদের ওজন কমানোর দরকার পড়েছে। এটা না করলে তাদেরকে দেখতে অনুপযুক্ত লাগত, আর বাকি মেয়েদের জন্যে শো’টাই সম্ভবত মাটি হয়ে যেত।

প্রদর্শনীটার একেবারে গোড়া থেকে সক্রিয়ভাবে জড়িত একজন অংশগ্রহণকারী হিসাবে একটা ব্যাপারে আমি খুবই সচেতন ছিলাম। সেটা হল: মিকি যাকে বলছেন “নিতম্বের আশপাশ দিয়ে বিশাল”, এমন কোনো তরুণ নারী কখনও ছিলেনই না। যেসব তরুণ নারী মিস-ইন্ডিয়ার জন্যে চেষ্টা করছিলেন, তাদের সকলেই ছিলেন সাধারণ ওজনের। আর, এই ট্রেনিং-প্রোগ্রামে আসার আগেই, তাদের অনেকে ছিলেন এমনকি নিম্ন-ওজনের।

প্রতিযোগিনীরা তাদের সকালের রুটিনমাফিক ব্যায়াম আরম্ভ করার জন্যে যেখানে রেডি হচ্ছিলেন, সেই হোটেল-প্রাঙ্গনে আমরা হাঁটছিলাম। খুবই পরিশ্রম করেছেন এমন কারো উদাহরণ হিসাবে মেহ্তা তখন শ্বেতাকে দেখান, যিনি পরে মিস-ইন্ডিয়া– ইউনিভার্স খেতাব জিতেছিলেন। একটা পিলারে ঠেস দিয়ে তিনি ঢুলছিলেন। আর তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ পরিশ্রান্ত। দুই সপ্তাহে ৮ পাউন্ড ওজন কমানোর জন্যে মেহ্তা তাকে অভিনন্দন জানালেন। তার সকালের দৌড় শুরু হওয়ার পূর্বে আরেকটু ঘুম সংগ্রহ করার চেষ্টায় আবার ঢুলে পড়ার আগে তিনি হাসলেন, আর মেহ্তাকে ধন্যবাদ জানালেন।

গোটা ট্রেনিং-কালে তরুণ নারীদের কাউকে কাউকে সত্যিসত্যি পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছিল টানা অনেকদিন ধরে। জেতার সুযোগ বাড়ানোর জন্যে তাদের বেশিরভাগই চেষ্টা করছিলেন ওজন কমাতে। ফলে, অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়েছিল। সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের দেহ শারীরিকভাবে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ত। এর কারণ ছিল, অপর্যাপ্ত ডায়েট আর এমন একটা সময়সূচি, যার জন্যে দৈনিক ১৫ ঘণ্টার সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার। আর, তরুণ নারীদেরকে চেয়ারে গা-এলিয়ে দিয়ে বসতে দেখাটা তো কখনই তেমন কোনো চমকের ব্যাপার ছিল না। সমস্ত প্রচেষ্টাটা তবু তাদের কাছে খুবই তৃপ্তিদায়ক লাগত। কেননা ট্রেনিঙে এসব প্রচেষ্টার পেছনের প্রেক্ষাপট হিসাবে থাকত অর্জনের কথামালা। মিকি মেহ্তা গর্বের সাথে উল্লেখ করেছিলেন যে, এর আগে প্রায়শই সেইসব তরুণ নারীই জিতেছেন, যারা ওজন কমানোর জন্যে সবচাইতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন:

সবকিছু সত্ত্বেও যারা কঠোর পরিশ্রম করে যেতে থাকে তারাই জেতে। আমি এরকম অনেক মেয়েকে দেখেছি। ডায়ানা হেইডেনের সাথে আমি সবচে কঠিন পরিশ্রম করেছি। সে প্রায় ১৫ কিলো ওজন কমিয়েছিল। আর, তারপরে ছিল যুক্তা মুখী। সে এত মোটা ছিল যে, লোকজন তাকে পুরাপুরি বাতিল করে দিয়েছিল। কিন্তু ট্রেনিংয়ের সময় সে এত কঠোর পরিশ্রম করল যে, ১২ কিলো কমিয়ে ফেলল। আর তারপর মিস ওয়ার্ল্ডের দিকে যাওয়ার পথে সে আরও কমায়।

কঠোর পরিশ্রম করিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে চরম অস্বাভাবিক পরিমাণ ওজন কমানোর দিকে মিকির যে ঝোঁক, সেটা সৌন্দর্য-প্রদর্শনীর ইণ্টারেস্টিং ভাষারই অংশ। নিম্ন-ওজনসম্পন্ন হওয়ার জন্যে ‘কঠোর পরিশ্রম’ করতে করতে, আর মূলত ফাঁপা সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে তাদের ‘আত্মবিশ্বাস’ ব্যবহার করতে করতে তরুণ নারীরা মেয়েলিত্বের এমন একটা ভাবধারার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন, সামগ্রিকভাবে নারীত্বকেই যা অবমূল্যায়ন করে।

ওজন হারানোর অনিবার্য আবশ্যকীয়তাকে মিকি অবশ্য তার আধ্যাত্মিকতা দিয়ে নরম করে তোলেন। তিনি একেবারে দৃঢ়মত ছিলেন যে,

আমরা এখানে এফটিভি [ফ্যাশন টিভি] দেখছি না, আমরা সেই নারীদেরকে দেখছি যারা পরিবর্তন ঘটাবে, আর ইতিবাচক হয়ে উঠবে।

ফ্যাশন টিভি সারা দুনিয়ার ফ্যাশন-শো’র দৃশ্যমালা ২৪ ঘণ্টা ধরে সম্প্রচারকারী চ্যানেল। এহেন ফ্যাশন টিভির সূত্র ধরে ট্রেনিং-প্রোগ্রামটাকে মিকি এমনভাবে নির্মাণ করেন যেন সেটা মডেলিঙের পুরাদস্তুর ওপরভাসা-জগতের বাইরে অবস্থিত। প্রদর্শনীটাতে ভালো করার জন্যে আধ্যাত্মিকতার চর্চা করাটা গুরত্বপূর্ণ কেন সেই বিবরণ পরের এই অনুচ্ছেদটাতে তিনি দিচ্ছেন:

মুকুট জেতা নিয়ে লোকজন প্যারানয়া’র [এক ধরনের মনোবৈকল্য] রোগী হয়ে পড়তে পারে। তাদের দিক থেকে প্রাথমিক তাড়না হচ্ছে এটাকে বড় করে তোলা। কিন্তু আমার সাথে দেখা হওয়ার পরে তারা এটাও ভাবতে পারে যে, তাদের হওয়া উচিত আসলে নান [খ্রিস্টান ধর্মযাজিকা]। তাদের কেউ কেউ ধ্যান পছন্দ করে না। আর, তারা স্রেফ মুকুট জেতা নিয়েই ধ্যান করে। কিন্তু আমি তাদেরকে বলি, কিছু পাওয়ার লক্ষ্যে যে-আধ্যাত্মিকতা, সেটা আধ্যাত্মিকতাই না।

প্রতিযোগিনীদেরকে সাহায্য করার জন্যে কী ভূমিকা পালন করতে হবে সে-ব্যাপারে মিকির মতো প্রত্যেক এক্সপার্টই পরিষ্কার ছিলেন। হেয়ার-স্টাইলিস্ট জাভেদ হাবিব আর সামান্থা কোছার বলেছিলেন,

আমাদের ভূমিকা হল প্রতিযোগিনীদেরকে ভবিষ্যতের জন্যে তৈরি করা। কারণ তাদের বেশিরভাগই গ্ল্যামার লাইনে যাচ্ছে, আর, এটা তাদের জন্যে অত্যাবশ্যিক। কারণ তাদেরকে কখনো কখনো নিজেকেই নিজের চুল আর মেকআপের কাজ করতে হবে।

বয়োঃসন্ধির বছরগুলার শুরুতেই শিকাগোর একটা সৌন্দর্য-স্কুল থেকে ফেরার পরে সামান্থা কোছার কাজ শুরু করেছিলেন দিল্লীতে, তার মাদার ব্লজম-এর অভিজাত ফ্যাশন-প্রতিষ্ঠানে। ইন্দোমার্কিন সিনেমা মনসুন ওয়েডিং-এর তিনি ছিলেন ক্রিয়েটিভ ডাইরেক্টর। আর হাবিব তো ভারতের সবচে সুপরিচিত হেয়ার স্টাইলিস্ট।

আত্মরতির চর্চা

সামান্থা কোছার আর হাবিব দুজনেই এ-ব্যাপারে পরিষ্কার ছিলেন যে, সৌন্দর্য হচ্ছে সিরিয়াস কর্মকান্ড। হাবিব বলেছিলেন,

সকালে উঠে কেউ নামাজ পড়ে না বা পূজা করে না। প্রথমে আপনি আয়নার দিকে তাকান আর খোদ নিজেরই উপাসনা করার চেষ্টা করেন।

সৌন্দর্য চর্চার সাথে ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে সমান করে দেখাটা হাবিবের পক্ষে অত্যন্ত মানানসই– বিশেষত এই ক্ষেত্রে। প্রদর্শনীটার সাথে এ-বছরই প্রথম বারের মতো যুক্ত হয়েছেন সামান্থা কোছার। সানসিল্ক শ্যাম্পুর মুখপাত্র তিনি। আর জাভেদ অনুমোদন করেন লো’রিল-এর হেয়ার-কালারকে।

বেশিরভাগ ট্রেনিং-সেশনে হাজির থাকাটা আমি নিশ্চিত করেছিলাম। তার মধ্যে প্রাক্তন ফ্লাইট-অ্যাটেনড্যাণ্ট এবং ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা-এক্সপার্ট’ রুকশানা এইসা’র পরিচালিত ট্রেনিং-সেশনগুলা ছিল অনেক অনেক বেশি ইণ্টারেস্টিং। সেই সাথে সেগুলা বিনোদনমূলকও ছিল এই দিক দিয়ে যে, সেগুলা বিদেশ সম্পর্কিত দক্ষিণ এশীয় স্তুতিকে বলতে গেলে ব্যঙ্গ করত। ভারতে ফ্লাইট-অ্যাটেনড্যাণ্ট হওয়াটা এখনও যে প্রতীকী পুঁজির ক্ষমতা-খবরদারি ধারণ করে, সেটা তিনি এইসব সেশনে ব্যবহার করতেন প্রতিযোগিনীদেরকে আদব-কায়দা শেখানোর একটা উপায় হিসাবে। ডেল্টা এয়ারলাইন্স-এর একজন প্রশিক্ষক হিসাবে সপ্তাহে তিনবার রুকশানা প্যারিসে উড়ে যান, আর তার নিজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা-স্কুল চালান, যার নাম ইমেজ ইনকর্পোরেটেড।

যতসব নাকরণীয়

নিজেদের আচরণ কীভাবে ঠিক করতে হয় সে-ব্যাপারে প্রতিযোগিনীদেরকে তিনি পরামর্শ দিতেন বিশেষ একটা স্টাইলে। এই স্টাইলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নানান বাগধারার একটা সিরিজ। সিরিজটা আরম্ভই হয় ‘এটা তোমার করা উচিত’ আর ‘এটা তুমি কখনো করবে না’ দিয়ে। রুকশানা নিজে অবশ্য পরিষ্কার ছিলেন যে, প্রতিযোগিনীদের জন্যে তার ট্রেনিঙটা ছিল চরম গুরুত্বপূর্ণ:

এই মেয়েদের জন্যে এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি এসব জিনিস শেখায় না। ওরা এটা নিতেও পারে, ফেলেও দিতে পারে। কিন্তু এর পরে ওরা ক‚টনীতিক আর রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে বসতে পারবে, আর জানবে কী করতে হয়। সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

বেশিরভাগ শহুরে ভারতীয়র কাছেই যা বিদেশী, প্রতিযোগিনীদেরকে সেসব আদবকায়দা শেখানোর ওপর রুকশানার জোর দেওয়াটা প্রথমে যদিও হাস্যকর মনে হচ্ছিল, কিন্তু এটা একটা সিরিয়াস সুর নিতে শুরু করে, আর আমি দেখতে থাকি, প্রতিযোগিনীরা, ধরা যাক, ছুরি-চামচ-কাটলারি সংক্রান্ত জটিলতাগুলা স্মরণ করার জন্যে সংগ্রাম করছে।

মিস-ইন্ডিয়া আর অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে যেসব প্রশ্ন করা হতে পারে সেসবের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাও প্রতিযোগিনীদের জন্যে একই রকম জরুরি। তরুণ নারীরা প্রতিদিন প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে র্যাম্পের  চারপাশ ঘিরে চেয়ারে বসতেন, আর কোরিওগ্রাফার হেমন্ত ত্রিবেদী একটা মাইক্রোফোন নিয়ে র‌্যাম্পের ঠিক সামনে একটা টেবিলে বসতেন। তারা যখন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্র্যাকটিস করতেন (প্রদর্শনীটার একজন কনসালট্যাণ্ট হিসাবে এসব প্রশ্ন আমি তাদের জন্যে লিখেছিলাম), তখন তাদের জবাব কীভাবে আরও ভালোভাবে দেওয়া যায় সে-ব্যাপারে ত্রিবেদী তাদেরকে পরামর্শ দিতেন। প্রতিযোগিনীরা যখন যথেষ্ট চটজলদি জবাব দিতে পারতেন না, তিনি বলতেন,

যখন তুমি দ্বিধা করলে, তুমি দেখিয়ে দিলে যে তুমি নিশ্চিত না। এটা আমাকেও তোমার নিষ্ঠা সম্পর্কে অনিশ্চিত করে ফেলল।

ভুয়া বুদ্ধিমত্তা

কাকে তারা সবচে পছন্দ করে, এবং গর্ভপাত আর অবতারের মতো বিচিত্র বিষয় সম্পর্কে তাদের মতামত কী, প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর প্রতিযোগিনীরা অরাজনৈতিক ও দর্শক-মজানো কায়দায় দেওয়ার চেষ্টা করছিল। আর আমি তখন দেখছিলাম, এমনসব মতামত হাজির করা কত কঠিন যেগুলাকে শুনতে মনে হয় স্বাধীন চিন্তাশীল নারীর কথা, কিন্তু আসলে যা বহুব্যবহারে জীর্ণ বুলি মাত্র। প্রায়শই অতিশয় ভালোভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতেন এমন প্রতিযোগিনীর উদাহরণ হিসাবে কাবেরীর নাম বলা যায়। সবচে পছন্দের নারী হিসাবে হিলারী ক্লিণ্টনের নাম বলেছিলেন কাবেরী: “কারণ তিনি হচ্ছেন প্রেম, ক্ষমতা আর দৃঢ়তার আদর্শ, যদিও তাঁর ছিল একটা দুর্যোগপূর্ণ ব্যক্তিগত জীবন”।

পরকীয়ায় আসক্ত স্বামীর সাথে বিবাহিত থাকার মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরাবর্তন ঘটান যিনি, একজন রোলমডেল হিসাবে সেই হিলারী ক্লিণ্টনের নাম বলার মাধ্যমে প্রশ্নটার একেবারে সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন কাবেরী (এই প্রদর্শনীটার পটভূমিতে)। তিনি নাম বলেছিলেন এমন একজন নারীর, যিনি বিয়ের কারণে ক্ষমতার এমন একটা অবস্থানে আছেন যা সত্যিসত্যি হুমকিমূলক নয়। তিনি নাম বলেছিলেন এমন একজন নারীর, যিনি তাঁর বিয়েকে টিকিয়ে রাখার জন্যে আত্মত্যাগ করেছেন। কাবেরীর এই উত্তরে চরম সুখী হয়ে ত্রিবেদী বলছিলেন, “হিলারীর সমস্যাগুলা সম্পর্কে স্পেসিফিক না-হওয়াটাই তাঁর পক্ষে সঠিক ছিল।”

হিলারী ক্লিণ্টনের সমস্যা সম্পর্কে স্পেসিফিক হওয়াটা মঞ্চে নেতিবাচকতার একটা উপাদান নিয়ে আসত। দর্শকের জন্যে তা আনন্দদায়ক হত না। প্রতিযোগিনীদেরকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছিল, তাদেরকে জিজ্ঞেস-করা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় তারা যেন তাদের সত্তার প্রত্যেকটা অংশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন– তাদের কথা থেকে শুরু করে তাদের ভঙ্গি, কোথায় তারা তাদের হাত রেখেছেন ইত্যাদি সব। শরীরের সামনে হাত না-রাখার জন্যে ত্রিবেদী প্রতিযোগিনীদেরকে এই বলে সতর্ক করছিলেন যে, “শেষে কিন্তু দেখতে মনে হবে তুমি তোমার উরুসন্ধি ধরে রেখেছ”। আর, এ-কথা ভেবে আমি আশ্চর্য হচ্ছিলাম যে, প্রত্যেকটা কাজকর্মকে ঘিরে সম্পূর্ণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এতসব চিন্তা করা এইসব তরুণ নারীরা আদৌ সামলাবেন কেমন করে।

তাদের খোদ বাক্যসমূহের গঠন, সেই সাথে তাদের স্বরের প্রকৃতিও, প্রতিযোগিনীদের দৈনিক সেশনের বিষয় হিসাবে থাকত। সাবিরা মার্চেণ্ট একজন বাকভঙ্গি-কোচ। এমন একটা উচ্চারণ-ভঙ্গিতে তিনি কথা বলেন, যা বৃটিশ ছাপ আর মার্কিন অভ্যাসের একটা সংমিশ্রণ। শহুরে ভারতে সাধারণত এই জিনিসটা অভিজাত হিসাবে চিহ্নিত। অন্যান্য জায়গার মতো ভারতেও উচ্চারণ-ভঙ্গি হচ্ছে শ্রেণীর একটা প্রধান চিহ্ন। আর শ্রেণীর চিহ্ন হিসাবে কোনো একটা উচ্চারণ-ভঙ্গি গড়ে-ওঠাটা মিস ওয়ার্ল্ডের মতো সৌন্দর্য-প্রদর্শনীতে সাফল্যের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যিক হিসাবে নির্মিত হয় বচন-বাচন-বয়ান-ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে, অন্তর্লীনভাবে।

অন্যসব এক্সপার্টের পাশাপাশি, বেশ ক-জন প্রাক্তন মিস-ইন্ডিয়া-বিজয়িনীকে ডাকা হয়েছিল কীভাবে জিততে হয় সে-বিষয়ে প্রতিযোগিনীদেরকে বলার জন্যে। এসব তরুণ নারীর দিকে প্রতিযোগিনীরা সবচে ব্যাপক পরিমাণে মনোযোগ দিতেন, আর বক্তৃতা হয়ে যাওয়ার পর প্রায়ই তারা অনুরোধ করতেন প্রাক্তন বিজয়িনীদের সাথে ফটো তোলার জন্যে। কেমন করে জিততে হয় সে-ব্যাপারে একদম চূড়ান্ত বিশেষজ্ঞ হিসাবে বিবেচিত এই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী-বিজয়িনীদের উপদেশে প্রতিযোগিনীরা একেবারে গলে যেতেন।

১৯৯৬ সালের মিস-ওয়ার্ল্ড যুক্তা মুখী পুরা এই প্রদর্শনীটাতে কনসালট্যাণ্ট হিসাবে কাজ করেছিলেন। আর, প্রতিযোগিনীদের নিজেদের জন্যে — এবং প্রদর্শনীটার জন্যে — কতটা পরিমাণে কাজ তাদের করা উচিত সে-ব্যাপারে তাদেরকে উপদেশ দেওয়ার জন্যে তিনি দুই ঘণ্টা খরচ করেছিলেন:

কখনোই এটা যথেষ্ট নয়। তোমার নিজের সাথে নিজের তুলনা কর, আর ভাবো: ‘আমি এর চেয়েও ভালো করতে পারি’। এখানে তোমরা আছ মাত্র ২৬ জন। আর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে থাকে ৯৪ জন। বিশ্বাস করতে থাক যে, সর্বশ্রেষ্ঠর চেয়েও তুমি শ্রেয়তর।

প্রতিযোগিনীদের কাছে একেবারে চূড়ান্ত রোল মডেল হিসাবে বিবেচিত যুক্তা এ-ব্যাপারে পরিষ্কার ছিলেন যে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতাটা আরও কঠিন হবে। সারা প্রদর্শনীটা জুড়ে চলল কাজ আর অর্জনের এই কথামালা, যুক্তার মাধ্যমে যার সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির। ত্বক ফরসা করার জন্যে ওষুধপত্রের আকারেই হোক, আর ব্যায়ামের মাধ্যমে তাদেরকে আরও পাতলা করার আকারেই হোক, অথবা তাদের ভারতীয় উচ্চারণ-ভঙ্গির কথাবার্তা কমানোর ক্লাস আকারেই হোক — তরুণ নারীদেরকে সার্বক্ষণিকভাবে আর প্রচ্ছন্নভাবে জানিয়ে দেওয়া হত যে, তারা স্রেফ যথেষ্ট ভালো নন।

নারীকে বস্তু বানিয়ে তোলা

আমি বলতে চাই, এই প্রদর্শনী কর্তৃক নারীকে চূড়ান্তভাবে বস্তু বানিয়ে তোলাটাকে আড়াল করার সুযোগ করে দেয় এই ধরনের কথামালা। সবচে বড় কথা হল, যদি প্রত্যেকে সারাক্ষণ যুক্তি দেখাতে থাকেন যে, নারীর ক্ষমতায়নই হচ্ছে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য, কথাটা তখন সত্য হিসাবে গৃহীত হয়ে যায়। উদারিকরণ-পরবর্তী ভারতের উপ-ঈশ্বর হিসাবে শহুরে পপুলার কালচারে অধিষ্ঠিত এক্সপার্টদের অংশগ্রহণ প্রজেক্টটাকে আরেকটু বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করে মাত্র।

জেতার চান্স বাড়ানোর জন্যে কীভাবে তাদের নিজেদের আরও উন্নয়ন ঘটানো যায় সেই উপদেশ তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কখনোই যথেষ্ট ভালো না-হওয়ার কথামালাই আরও খানিকটা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এই স্ব-স্পষ্ট বাস্তব ঘটনায় যে, ফাইনাল প্রদর্শনীতে মাত্র ৩ জন প্রতিযোগিনীই জিতবেন। এক্সপার্টদের প্রধান ফোকাস ছিল, স্পষ্টতই, একটা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কীভাবে জিততে হয় সে-ব্যাপারে প্রতিযোগিনীদেরকে তৈরি করা আর পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু তার পাশাপাশি ক্যারিয়ার-সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়েও বেশ কয়েকটা সেশন নেওয়া হয়ে-ছিল। এভাবে, এমনকি যে-তরুণ নারীটি জেতে নি তাকেও এমন একটা সামাজিক নেট-ওয়ার্ক সরবরাহ করা হয়, যা তাদেরকে মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রগুলাতে ঢুকতে সাহায্য করবে।

সাধারণত হিন্দি সিনেমাই মিস-ইন্ডিয়া প্রতিযোগিনীদের পরবর্তী ধাপ। তবু, পরিচালক করণ জোহর (মাত্র ২৬ বছর বয়েসেই যিনি ব্যাপক সফল সিনেমা কাভি খুশি কাভি গম বানিয়েছিলেন) প্রতিযোগিনীদেরকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন যে, সিনেমাই তাদের একমাত্র বিকল্প না:

আমি জানি না তোমাদের মধ্যে কতজন অভিনেত্রী হতে চাও। কিন্তু যদি তোমরা অভিনয় করতে চাও, প্লিজ অভিনয় কর! এখানে এখন অন্যান্য আরও ৩০০ প্ল্যাটফর্ম আছে। আমার দুঃখ লাগে যখন দেখি এত এত সুন্দর মুখ, আর তারা সবাই অভিনেত্রী হতে চায়। এটা আমাকে ব্যথা দেয়, কারণ এটা তারা চায় শুধু টাকাপয়সা আর স্বীকৃতির জন্যে। আসলে এটা তোমার চাওয়া উচিত শিল্পের জন্যে। আমি জানি, আমাদের বেশিরভাগ অভিনেত্রী মডেল হতে পারবে না, কিন্তু মডেলরাও অভিনেত্রী হতে পারে না।

ক্যারিয়ারের বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে ফারাক-রেখা দাঁড় করাতে যেয়ে একটা গ্ল্যামারাস ফিগার হওয়া আর একজন অভিনেত্রী হওয়ার মধ্যকার পরিষ্কার পার্থক্য প্রকাশ করলেন জোহর। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে নারীরা প্রায়শই যেখানে অলঙ্কারের জিনিস, সেখানে প্রতিযোগিনীদের প্রতি জোহরের বলা ‘প্লিজ অভিনয় কর’ বুলিটা ইণ্টারেস্টিং। কেননা উদারিকরণের সময় থেকে মিডিয়াতে বিকল্প সুযোগ যেভাবে বেড়েছে, এটা সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।

মিস-ইন্ডিয়া-ট্রেনিং এমন একটা জায়গা হিসাবে কাজ করে, প্রতিযোগিনীরা যেখানে তাদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করতে পারে, অথবা মিডিয়া-সংশ্লিষ্ট ক্যারিয়ারসমূহের বিচারে তাদের বিকল্পগুলা অন্তত আরও বিস্তৃত করতে পারে। আবেগের দিক দিয়ে এই ট্রেনিংটা অবশ্য কঠিন, কেননা এর মধ্যে থাকে প্রত্যেক দিন ১৫ ঘণ্টার কঠিন শিডিউল, আর তার পাশাপাশি প্রত্যেক তরুণ নারীর আচার-আচরণের সার্বক্ষণিক, কঠোর নজরদারি।

মিসইন্ডিয়া ট্রেনিঙের রাজনীতি

মনে রেখ, যে-মুহূর্ত থেকে তুমি এই হোটেলের বাইরে, সেই মুহূর্ত থেকে ২৪ ঘণ্টাই তুমি মঞ্চের উপরে থাকবে। (প্রতিযোগিনীদের প্রতি হেমন্ত ত্রিবেদী)

ত্রিবেদীর এই মন্তব্য প্রতিযোগিনীদেরকে তাগাদা দেয় যেন তারা নিজেরাই নিজেদেরকে সবসময় চোখে চোখে রাখে (এমনকি এ·পার্টরা নিজেরা যখন তা করতে পারেন না তখনও)। এ-মন্তব্য ত্রিবেদী করেন স্নায়ু-বিলোপী কায়দায়, ফুকোর প্যানপটিকনের [সর্বাঙ্গীন জরিপ] ধারণা অনুসরণ করার মাধ্যমে। প্যানপটিকন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া, যার দ্বারা লোকজনকে এত ঘনিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় যে, তারা নিজেরাই নিজেদের আচার-আচরণ-ব্যবহার পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করে (বৃহত্তর সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলা যেভাবে করে, অনেকটা সেভাবে)। ফুকো-ফুকো ধরনের সর্ব-সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতীকের মতো, মিস-ইন্ডিয়ার ট্রেনিং-প্রোগ্রাম এক মাসের জন্যে প্রতিযোগিনীদের জীবন দখল করে নিয়ে তাদেরকে এ·পার্টদের নজরের অধীনস্ত করে। নানান কথাবার্তার বলা-কওয়ার মাধ্যমে এ·পার্টদের সম্বন্ধে এমন ধারণা নির্মিত হয় যে, তাঁরা তরুণ নারীদেরকে সদা-উচ্চ ‘আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড’-এর উপযুক্ত গ্ল্যামারাস প্রতিমায় পরিণত করতে পারেন।

মিস-ইন্ডিয়া নামক ধারণাটা এমন ধরনের লিঙ্গ-অসমতা, যার প্রকাশ ঘটে নির্লজ্জ রকম বৃহৎভাবে। প্রতিযোগিনীদের প্রতিটা মিনিট নজরদারি-পর্যবেক্ষণ করানো হয় হেফাজতকারিণী-দেরকে দিয়ে। [‘হেফাজতকারিনী’ সম্পর্কে এই লেখার শেষে ‘অনুবাদকের টীকা’ দ্রষ্টব্য।] হেফাজতকারিণীদের কেউ কেউ প্রতিযোগিনীদেরই বয়েসী বা আরও ছোট। যেভাবে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে সেভাবেই প্রতিযোগিনীরা খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন আর কাজকর্ম করছেন কিনা সেটা নিশ্চিত করেন হেফাজতকারিণীরা। যদিও প্রতিযোগিনীদের সাথে হেফাজতকারিণীদের কোনো ঝুটঝামেলা হতে আমি কখনোই দেখিনি, তবু সারাক্ষণ পর্যবেক্ষিত হওয়ার চাপ সম্পর্কে সারাক্ষণই আমি সজাগ ছিলাম। প্রতিযোগিনীরা যে তাদেরকে দেওয়া রুটিন মেনে চলছেন তা নিশ্চিত করার দায়দায়িত্বের কথা একজন হেফাজতকারিণী উল্লেখ করেছিলেন:

প্রত্যেক সপ্তাহে তারা [প্রতিযোগিনীরা] একটা করে নতুন ডায়েট পায়। এটা বরাদ্দ করা হয় অঞ্জলির সাথে ব্যক্তিগত পরামর্শের সময়। আমাকে নিশ্চিত করতে হয় যেন তারা সেটা বিশ্বস্ততার সাথে মেনে চলে। একটা মেয়ে ৭ কিলো নিম্ন-ওজনের। কাজেই সে আছে ওজন বাড়ানোর ডায়েটে। আর তাই সে সবার সামনেই প্যাস্ট্রি আর কেক খেতে পারে। আর এটা প্রত্যেককেই ঝামেলায় ফেলে।

পূর্ণবয়ষ্ক নারীদের দেখভাল-পাহারা করার মতোন অদ্ভুত অবস্থানে থাকা এই হেফাজতকারিণী-দের অভিযোগ আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে প্রতিযোগিনীরা সারাক্ষণই নজরদারির মধ্যে থাকেন। তার ওপর, প্রতিযোগিনীরা আবার নিজেরাই নিজেদেরকে এবং একে-অন্যকে চোখে চোখে রাখেন। সব খাওয়াই যে একটা গ্রুপ হিসাবে খাওয়া হয়ে থাকে (খাওয়াটা যেখানে সবার পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব)– খোদ এই ঘটনাটাই নজরদারির একটা অংশ।

তরুন নারীদের সাথে একদিন সকালে আমি যখন বসেছিলাম, তখন ডায়েট-বিশারদ তাদেরকে কীসব ডায়েট দিয়েছেন তাই নিয়ে একটা জটিল আলোচনায় ঢুকে পড়লেন তারা। একজন মেয়ে বললেন,

আমি ২০০ গ্রাম কমেছি, এই আর কি। ঠিক এখন আমি সাড়ে ৬১ কিলো, আর হতে চাই ৬০। তিনি [ডায়েট-বিশারদ অঞ্জলি] বলেছেন আজকে আমি ফল খেতে পারব না, কারণ এটা মোটা বানিয়ে ফেলে।

দরদের সাথে আরেকজন বলল, দুই দিন কুমড়া আর চাটনির পর নাস্তার জন্যে তাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ডিম আর রুট। ডায়েট-গেম খেলাটার মধ্যে সহজাতভাবেই থাকে অদ্ভুত সব অনুমান। এইসব অদ্ভুত অনুমানের অংশ হিসাবে মেয়েরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, ফল আসলে ঠিক মোটা বানানোর ভাগে পড়ে না, কারণ “এটা আসলে রক্ষণাবেক্ষণকারী খাদ্যই বটে”।

খাওয়ার ভয়

যে-উদ্বেগজনক তীব্রতার সাথে তরুণ নারীরা তাদের খাওয়ার প্যাটার্ণ নিয়ে আলাপ করছিলেন তা টের পাইয়ে দেয়, ট্রেনিং-প্রোগ্রামের পুরা প্রতিষ্ঠানটাই কীভাবে এক ধরনের আত্ম-নজরদারি প্রয়োগ করে। প্রতিযোগিনীদের খাদ্যগ্রহণ নজরদারি করাটা কখনো-কখনো অবশ্য সরাসরি পুলিশগিরি পর্যন্ত গিয়েও ঠেকে। প্রেসের সাথে সাক্ষাতের জন্যে তরুণ নারীদেরকে যখন অ্যাম্বি উপত্যকায় নিয়ে যাওয়া হল (এক মাসের মধ্যে হোটেলের বাইরে তাদের এই প্রথম যাওয়া), একজন প্রদর্শনী-সংগঠক সতর্ক করে দিয়ে বললেন,

এখানে স্বাভাবিক খাবার থাকবে, কিন্তু সাবধান, নিজেরা নিজেদেরকে ঠেকিয়ে রাখবে। আমি একেবারে তোমাদের সামনে গিয়ে হাজির হয়ে খাওয়া থামানোর কথা বলতে চাই না।

পুরা ট্রেনিংকাল জুড়ে ব্যাপক আলোচনার বিষয় ছিল খাদ্যগ্রহণের রাজনীতি। প্রত্যেক বেলার খাবার প্রতিযোগিনীরা খেত একটা বুফে টেবিল থেকে। তাদের জন্যে টেবিলের ওপর সাজানো থাকত খাবারের ৩টা বড় গামলা থাকত। নাস্তায় তাদের জন্যে বিকল্প হিসাবে থাকত সিরিয়াল [শস্যজাতীয় খাবার] অথবা ফল। লাঞ্চে থাকত দুইটা সব্জি আর সুপ। আর রাতে থাকত ভাত এবং আমিষজাতীয় একটা রান্না। আশা করা হত, এইসব নির্বাচিত জিনিস থেকে প্রতিযোগিনীরা শুধু সেইগুলা বেছে নেবেন, যেগুলা অঞ্জলি তাদের খাওয়ার জন্যে বরাদ্দ করেছেন।

বেশি খেয়ে ফেলার ভয় এবং সেই সঙ্গে প্রতিযোগিতার আগে-আগে খাওয়ার সময় নজরদারির মধ্যে থাকার চাপ– এই দুই জিনিস প্রতিযোগিনীদের কাছে একটা বিষয় কার্যত বেদনা-দায়কভাবে ফুটিয়ে তোলে। সেটা হল: প্রতিযোগিনীদের নিজেদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণ আর এক্সপার্টদের পরামর্শের প্রতি তাদের মনোযোগ — এই উভয়ের উপর সৌন্দর্যের স্ট্যান্ডার্ডগুলা নির্ভরশীল। এটা করতে যেয়ে যদিও তরুণ নারীদের কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছেন (এবং কেউ কেউ সেটা অতিরিক্তই করেছেন), তবু, সুন্দর হতে গেলে সংগ্রাম করতে হবে– এই বার্তাটা এই ট্রেনিঙে সর্বদাই হাজির ছিল।

সুন্দর হওয়াটা অতিরিক্ত পাতলা, ফরসা আর লম্বা হওয়ার একটা অবস্থা হিসাবে সংজ্ঞায়িত হতে থাকে। আর, মিস-ইন্ডিয়ায় এই তিনটা গুণের কোনোটাকেই কেউ অতিরিক্ত পরিমাণে ধারণ করতে সক্ষম হন না। [মিস-ইন্ডিয়ায় ফরসা, পাতলা আর লম্বা হওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বলে কিছু নাই।] পরস্পরকে নজরদারি করতে বন্দীদেরকে বাধ্য করার ক্ষেত্রে প্যানোপটিকন কীভাবে কাজ করে সে-বিষয়ক ফুকোর ধারণার সাথে এটার বেশ ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। ফুকো, প্রকৃতপক্ষে, ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করেন “বিভিন্ন কৌশল”-এর মধ্যে অবয়বপ্রাপ্ত একটা ব্যাপার হিসাবে “… যেগুলার সাধারণ নকশা বা প্রাতিষ্ঠানিক সংহতি অঙ্গীভূত থাকে … বিভিন্ন সামাজিক আধিপত্যের মধ্যে” (Michel Foucault: ১৯৭৫: ৯৩)। শুধু প্রতিযোগিনীদের জন্যেই না, প্রদর্শনীটার ইমেজসমুদয়কে যারা খায় সেই শহুরে লোকজনের জন্যেও, সৌন্দর্যের স্ট্যান্ডার্ডগুলাকে আরও পোক্ত করার কাজ করে মিস-ইন্ডিয়া।

এমনকি পরিবারের সদস্যদের জন্যে বরাদ্দ এক ঘণ্টার দেখা-সাক্ষাতও (হোটেলের কফিশপে প্রতি রাতে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে অনুষ্ঠিত) হেফাজতকারিণীদের দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হত। বলতে গেলে রীতিমতো পর্যবেক্ষণযোগ্যভাবে, কফিশপটাকে বসানো হয়েছিল হোটেলের ঠিক মাঝখানে। করিডোরসমূহের সমস্ত ২৪ তলাই এটার দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকাতো। এর ফলে প্রতিযোগিনীদের পক্ষে এমন কোনো আবেগ পরিবারের কাছে প্রকাশ করাটা অসম্ভব হয়ে পড়ত, যেটা অন্যদের সামনে যেটা প্রকাশ করতে তারা হয়ত অস্বস্তি বোধ করতেন। একজন হেফাজতকারিণী এই নীতির পেছনকার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছিলেন এভাবে:

কারণ, এখানে ঝুঁকির মধ্যে থাকে [খোদ] প্রদর্শনীটার নাম-যশ, আর কুৎসিত গুজবকে তো আমরা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গজিয়ে উঠতে দিতে পারি না।

এজন্যেই, তিনি যুক্তি দেখিয়ে বললেন, এটা দরকার যে, প্রতিযোগিনীরা সবসময় হেফাজত-কারিণীদের সাথে সম্পূর্ণ দৃশ্যমান অবস্থায় থাকবে।

রেশমের গুটির মধ্যে বসবাস

সংগঠকদেরকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন প্রতিযোগিনীদেরকে তাদের জন্যে বরাদ্দকৃত সীমিত পরিমাণ ফাঁকা সময়েও হোটেলের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না? তখন একজন হেফাজতকারিণী এই ঘটনার উপর জোর দিলেন যে, মিস-ইন্ডিয়ার প্রতিযোগিনীরা যেরকম, সেই ধরনের তরুণ নারীদের জন্যে বাইরের জগত বলতে গেলে রেডি না:

আরেকদিন যখন আমরা তাদেরকে শপিঙে নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন তাদেরকে আমাদের ঠেলে বাসে তুলতে হয়েছিল, কারণ পুরা জনতা জড়ো হচ্ছিল তাদেরকে দেখার জন্যে। ভারতে, নারীরা খাটো জিনিসপত্র পরতে পারে না, আর এসব মেয়ে যেসব জিনিস পরে তার ফলে খ্যাচড়া লোকজন (আক্ষরিক অর্থে ‘পচা-নোংরা’ লোকজন) তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই কারণেই আমাদেরকে সবসময় তাদেরকে হোটেলে রাখতে হয়।

পাহারা-নিরাপত্তার কথামালা ব্যবহার করে এই হেফাজতকারিণী আসলে মিস-ইন্ডিয়ার জগত আর সত্যিকারের ভারতের বাস্তবতার মধ্যকার তীব্র পার্থক্যকেই গুরুত্বের সাথে তুলে ধরলেন। খুব একটা মনোযোগ আকর্ষণ না-করেই নানা মাত্রায় পোশাকহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রে হোটেলে প্রতিযোগিনীরা ছিলেন স্বাধীন। কিন্তু রাস্তার একজন গড়পড়তা লোক মিনি স্কার্ট পরা অবস্থায় একজন গ্ল্যামারাস নারীর উপর থেকে চোখ সরাতে সক্ষম হবেন না। শুধু এই জন্যে যে, এটা এমন একটা জিনিস যা তিনি সাধারণত টিভিতে দেখেন। কারণ যেসব জায়গায় এরকম পোশাক-আশাক সাধারণ ঘটনা মাত্র সেসব জায়গায় সচরাচর তিনি যেতে অক্ষম।

তা সত্ত্বেও, পর্যবেক্ষিত হওয়ার ক্ষমতার দ্বারা পর্যবেক্ষিত হওয়ার ব্যাপারটার পরিপূরণও ঘটে বটে। দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ অংশে, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকা জিনিসটা রূঢ় কিছু না; এটা আসলে মামুলি একটা ব্যাপার। যদি কেউ আলাদা হয়, অন্যেরা তার দিকে তাকিয়ে থেকে সেটা তাকে বুঝিয়ে দেবেন। ‘দর্শন’ বা পবিত্র দৃষ্টির ধারণা হিন্দু ঐতিহ্যে গভীরভাবে শেকড়-গাড়া আছে। আর ‘বুরি’ নজর বা খারাপ চোখের মতো ধারণাগুলা তো সেই বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলেরও বহু আগের মধ্য এশীয় সাংস্কৃতিক সংস্পর্শ থেকে আমদানি।

সার্বক্ষণিক প্রদর্শনের মধ্যে থাকা

পর্যবেক্ষিত হওয়াটা তাহলে ক্ষমতারই একটা রূপ। কীভাবে চাকরবাকররা তাকে তার চিকন ফিতার পাতলা অন্তর্বাস পরা অবস্থায় দেখতে “স্রেফ ভালোবাসে” তার বিবরণ দিতে গিয়ে একজন প্রতিযোগিনী হাসছিলেন। একজন চাকরের পরিপ্রেক্ষিত থেকে এরকম একটা পোশাকের বাস্তবযোগ্যতা সম্পর্কে তার খাঁটি অবিশ্বাসের কারণে এটা ঘটে থাকতে পারে ঠিকই, কিন্তু এক ঠাঁয় পরিলক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাওয়াটা বোম্বে আর দিল্লীতে দারুণ কাঙ্ক্ষিত একটা ব্যাপারও বটে। বোম্বে টাইমস বা দিল্লীতে দিল্লী টাইমস-এর ৩য় পাতা বা টাইমস অফ ইন্ডিয়ার কোনো একটা ক্রোড়পত্র খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের নৈশজীবন দৃশ্যগতভাবে নথিবদ্ধ করছে আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পাঠকসমাজ সেটা হৈহৈ করে খাচ্ছেন।

ট্রেনিং-প্রোগ্রামের জন্যে নির্বাচিত হওয়ার আগে তার আপন কলকাতায় সফল একজন মডেল সোনাল বললেন, কলকাতায় ভালো করা আর মিস-ইন্ডিয়ায় ভালো করা পুরাপুরি আলাদা দুইটা ব্যাপার।

যদি জিতি, আমি আমার প্রাইভেসি হারাবো। কলকাতায় মানুষজন আমাকে চেনে, আর কী বলছি কী করছি তা নিয়ে আমাকে সতর্ক থাকতে হয়। কিন্তু মিস-ইন্ডিয়া হিসাবে আমি তো কখনোই আরাম করতে পারব না। এখানে আপনাকে উনারা সম্পূর্ণ নারীতে রূপান্তরিত করেন, কিন্তু মানুষজন যখন আপনাকে আরও আরও দেখতে থাকেন, আপনার স্বাধীনতা-স্বাতন্ত্র্যের ধারণাটাই তখন স্রেফ চলে যায়।

“কখনোই আরাম করতে পারব না” এই মর্মে সোনালের ঘোষণাটাই দেখিয়ে দেয়, কী রকম সার্বক্ষণিক পাবলিক নজরদারির মধ্যে প্রতিযোগিনীদেরকে থাকতে হয়, আর কীভাবে সেটা ১০ গুণ বেড়ে যায় যদি তারা জেতেন। যখন তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, “মানুষজন তোমাকে আরও আরও দেখতে থাকে”, তখন প্যানোপটিকনের রূপকটা, এবং সেই সাথে তাকিয়ে থাকাথাকির ঐ দ্বিমুখী পরিপূরণটা বিশেষভাবে পরিষ্কার হয়ে ওঠে ঘটনার সোজাসাপ্টা সত্যতায়: পর্যবেক্ষিত হতে থাকা। মনে হয়, এটা সৌন্দর্য-রাণীর জীবনের স্রেফ একটা অংশ।

আসলেই, প্রতিযোগিনীদেরকে নজরদারির মধ্যে থাকতে শেখানোর মতো করেই সাজানো হয়েছিল ট্রেনিং-প্রোগ্রামটার অসংখ্য সেশন। এক বিকালে বেশ কয় ঘণ্টা ধরে বাকভঙ্গি-এ·পার্ট সাবিরা মার্চেণ্ট প্রতিযোগিনীদেরকে টেলিভিশনের (যেটা সম্ভবত তাকিয়ে থাকাথাকির চূড়ান্ত হাতিয়ার) উপযুক্ত করে তোলার জন্যে একটা মহড়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। একে একে প্রত্যেক প্রতিযোগিনী ডায়াসে আসলেন। সেখানে সাবিরা তাদেরকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন:

প্রত্যেকে তোমাকে দেখছে। মাইকটা তোমার বুকের উচ্চতায় ধর। নিশ্চিত কর যে, এটা তোমার আত্ম-সত্তারই একটা বিস্তার। ঐভাবে তোমাকে সেক্সি শোনাবে, ভালোই মানিয়ে নিয়েছ। সত্যি কথা বলতে কি, দর্শকদেরকে তোমার সেক্সআপ করতে হবে। প্রত্যেকে তোমাকে দেখতে থাকবে, কাজেই প্রফুল্ল, সুখী আর স্থিত হও।

উপরমুখী সচলতার রাস্তা

অল্প কয়েকটা বাক্যের মধ্যে সাবিরা প্রতিযোগিনীদের সেক্সি কিন্তু অনাক্রমণমূলক এবং শান্ত কিন্তু তারপরও স্থিত হিসাবে কাজকর্ম-চলাফেরা করার প্রয়োজনীয়তার সারসংক্ষেপ করলেন। নিজেকে সৌন্দর্য-রাণী হিসেবে হাজির করা যে কত কঠিন তা আমি যত বেশি করে জানতে থাকলাম, তত বেশি করে আমি বুঝতে পারলাম, এটা অবিশ্বাস্যরকম দুঃখজনক যে, বেশিরভাগ নারীঘটিত জিনিসের মতোন এই প্রদর্শনীটার কর্ম-পরিধির মধ্যেও মেয়েদের কাজকে কত গভীরভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়। ট্রেনিং-প্রোগ্রামটার কারণে সম্ভব-হয়ে-ওঠা সুযোগের মাধ্যমে পর্যবেক্ষিত হওয়ার চান্স পাওয়ার পর পর্যবেক্ষিত হওয়ার চাপটাকে অবশ্য অনেক তরুণ নারী, বেশ ভালোভাবেই, কাজের জিনিস হিসাবে বিবেচনা করে থাকেন।

পুরা ট্রেনিং-কাল ধরে প্রতিযোগিনীরা শেখেন কীভাবে নিজেরা নিজেদেরকে এমনভাবে কর্ষণ করতে হয়, যাতে করে তারা লিঙ্গ শ্রেণী আর সৌন্দর্যকে ঘিরে বিরাজমান রীতিনীতি-মানদন্ডের উপযুক্ত হতে পারেন। তারা যেটা করছিলেন সেটা হল, খোদ তাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গঠন করা আর, একই সাথে, ঐসব আনকোরা নতুন আত্ম-সত্তাকে জগত-মধ্যে স্থাপন করা। উদারিকরণ-পরবর্তী ভারত নামক একটা আনকোরা-নতুন জিনিস নির্মিত হয়েছে অনেক অনেক শহুরে ভারতীয়র মাধ্যমে, বচন-বাচন-বয়ান-ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে, অন্তর্লীনভাবে। এই ভারতের প্রতিনিধি হিসাবে মিস-ইন্ডিয়া-প্রতিযোগিনীরা আক্ষরিক অর্থেই জাতির প্রাণ-প্রতিমা হিসাবে কাজ করেন।

সাম্প্রতিক নারীবাদী আলাপ-আলোচনা-বচন-বাচন-ডিসকোর্সের ধারাগুলার মধ্যে আসলেই একটা জিনিসের অভাব রয়েছে। সেটা হল: নারীরা তাদের নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে যেভাবে একটা লিঙ্গায়িত বিশ্বজগতের সাথে দরকষাকষি করেন সে-সম্পর্কিত উপলব্ধি। বৃহত্তর পরিসরে মিস-ইন্ডিয়ার মতো সৌন্দর্য প্রদর্শনীগুলা যদিও অবশ্য-অবশ্যই পুরুষাধিপত্যের হাতিয়ার, কিন্তু তা সত্তে¡ও সেগুলা নারীর আপেক্ষিক ক্ষমতায়নের এবং সামাজিক সচলতার জায়গাও হতে পারে। বাস্তব দুনিয়ার নারীবাদ পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বতন্ত্র নারীদের অংশগ্রহণ করার প্রণোদোনার দিকে ঠিক ততখানিই মনোযোগ দেয়, যতখানি মনোযোগ দেয় পিতৃতন্ত্রের টিকিয়ে-রাখা ত্রুটিপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানের দিকে। বাস্তব দুনিয়ার এরকম নারীবাদ সম্পর্কে পুরাপুরি ওয়াকিবহাল দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে মিস-ইন্ডিয়া-প্রদর্শনীকে বিচার করতে পারলে সেটা হবে কাজের জিনিস।

এটা এখন আপনা থেকেই স্পষ্ট যে, নারীরা হচ্ছেন [নানা প্রতিষ্ঠান ও ডিসকোর্সের মধ্যে] অঙ্গীভূত কর্তাসত্তা (Juduth Butler, 1993)। অথচ, বচন-বাচন-বয়ান-ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে, অন্তর্লীনভাবে, নারীত্বের যে-চেহারাটা সুন্দর বলে নির্মাণ করে তোলা হয়েছে সেই চেহারাটাকেই অর্জন করার জন্যে কেমন করে নারীরা শরীরের পরিসরের মধ্যে সফলভাবে রাস্তা খুঁজে নিচ্ছেন সেটা নিয়ে কথা বলার মতো লেখালেখির ঘাটতি আছে। এরকম নারীদেরকে পুরুষাধিপত্যের সরল শিকার হিসাবে ছাপ্পা মেরে দেওয়াটা বিপজ্জনক। কারণ, সেটা করা মানে তাদের কর্তাসত্তাকে এবং সামাজিক জগতের সাথে দরকষাকষি করার বুদ্ধিমত্তাকে প্রত্যাখ্যান করতেই সাহায্য করা। [মূল লেখা সমাপ্ত]

অনুবাদকের টীকা

প্রথমেই ‘হেফাজতকারিণী’ প্রসঙ্গে। এখানে “শ্যাপারৌন” শব্দের বাংলা আপাতত করেছি হেফাজতকারিনী। “সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে তরুণ অবিবাহিতা নারীকে সঙ্গ দেন এবং দেখাশোনা করেন” “এমন কোনো নারী, বিশেষত বিবাহিতা নারী”কে বলে “শ্যাপারৌন”; অর্থাৎ “শ্যাপারৌন” হচ্ছে “তরুণ নারীর সুপারভাইজার” বা দেখভালকারিণী, বা দেখাশোনাকারিণী, বা হেফাজতকারিণী (মাইক্রোসফ্ট্ এনকার্টা অভিধান, ২০০৪)।

আয়োজক-কর্তৃপক্ষ-এক্সপার্টরা যখন প্রতিযোগী মেয়েদের সাথে কথা বলেছেন, তখন কোথাও ‘আপনি’ লেখা হয় নি। মিস-ইন্ডিয়া-ট্রেনিং তাদেরকে ‘আপনি’র মর্যাদা দেয় না। অন্যত্র ‘আপনি’ রাখা হয়েছে। খানিকটা একইভাবে, মিস-ইন্ডিয়ার প্রতিযোগীদেরকে সর্বত্র ‘প্রতিযোগিনী’ লেখা হয়েছে। এটাই এই মেয়েদের প্রতি আয়োজক-ইন্ডাস্ট্রির একান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। অনুবাদে এই দৃষ্টিভঙ্গিটা সঞ্চারিত করার জন্যে ‘প্রতিযোগিনী’। একই কারণে ‘বিজয়িনী’, ‘হেফাজতকারিণী’ ইত্যাদি। আবার, প্রতিযোগিনীদেরকে সার্বক্ষণিকভাবে তত্ত্বাবধান করার কাজে নিয়োজিত  মানুষটা যে নিজেও একজন নারী, সেটা ‘হেফাজত-কারী’ বললে বোঝা যায় না, ‘হেফাজতকারিণী’ বললে বোঝা যায়। এসব সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে কিনা সে-ব্যাপারে অবশ্য অনুবাদকের সংশয় আছে। প্রসঙ্গত, বাংলায় শব্দের জেন্ডার নিয়ে কী করা উচিত? এই জেন্ডার-বন্দোবস্ত নারীর জন্যে কি অধীনস্ততারই বন্দোবস্ত? নিঃসংশয়ভাবে? যদি হয়, সব শব্দের বেলায়ই কি তাই? সব শব্দের বেলায় না হলে, কোন কোন ধরনের শব্দের বেলায়? এই সব প্রশ্নের ফয়সালা কী, তা অনুবাদকের সঠিক জানা নাই। এই মুহূর্তে পাঠকদের দ্বারস্থ তিনি।

এই অনুবাদের মধ্যে জায়গায় জায়গায় তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যকার কথাগুলা মূল লেখকের নয়, অনুবাদকের। কোথাও কোথাও হরফ বাঁকা করাটাও অনুবাদকের সিদ্ধান্ত। প্রতিযোগিতার নাম, পত্রিকার নাম, দোকানের নাম, সিনেমার নাম ইত্যাদি ক্ষেত্রে, এবং কোথাও কোথাও গুরুত্ব আরোপ করার জন্যে, অনুবাদক কতিপয় হরফ বাঁকা করে দিয়েছেন। আর, অনুবাদে নিশ্চয়ই অনেক ত্রæটিবিচ্যুতি থেকে গেছে। আপনার চোখে পড়লে দয়া করে একটু ধরিয়ে দেবেন।

এলিট-মহাজনী মিডিয়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক লেখালেখি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে আগ্রহী পাঠকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এই অনুবাদকের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। সেই কর্তব্য পালনে বিপুল গাফেলতি তার আছে। তথাপি যোগাযোগের সুযোগ-স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা অবারিত। আজকালকার দিন-দুনিয়ায় এলিট-মহাজনী মিডিয়া-সংস্কৃতির সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে পারস্পরিক যোগাযোগমন্ত্রি তৎপরতা আমাদের দেহমনের স্বাধীনতার জমিন, পাড় ও নকশাকে আরও বিস্তৃত এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলবে।

সবশেষে একটা বিশেষ মুশকিল। সুসানের লেখায় প্রতিযোগী মেয়ের সংখ্যা কোথাও ২৩, কোথাও ২৬ লেখা হয়েছে। ব্যক্তিগত ইমেইলে যদিও সুসান ‘সানন্দে’ আমাকে অনুবাদের অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু পরের একটা ইমেইলে ২৩/২৬ এর গোলমাল এবং অন্য দুই-একটা জিনিস জানতে চেয়েছিলাম, সেটার আর উত্তর পাই নি। অগত্যা আমি সব জায়গাতে ২৬-ই লিখেছি। পরে সংশোধনের সুযোগ থাকল।

অক্টোবর-নভেম্বর ২০০৫

মূল লেখায় উল্লেখিত বইপত্র

AR Riverol, Live from Atlantic City: History of Miss America Befor, After And In Spite of Television,  Popular Press New York, 1992.

Colleen Cohen, Richard Wilk Stoeltje Beverly, eds Beauty Queens on the Global Stage: Gende, Contest and Powe, Routledge, New York, 1995.

Judith Butler, Bodies That Matter, Routledge, New York, 1993.

Kathy Davis, Embodies Practice,  Routledge, New York, 1995.

Kathy Davis, Reshaping the Female Body: Dilemma of Cosmetic Surgery, Routledge, New York, 1995.

Keith Lovegrove, Pageant: The Beauty Culture, te Neues Publishing Compan,  New York, 2002.

Michel Foucaul,  Discipline and Punish Vintage, New York, 1975.

Sarah Banet-Weiser, The Most Beautiful Girl in the World, University of California Press, Berkele,  1999.

অনুবাদকের উল্লেখিতসূত্র

মাইক্রোসফট এনকার্টা অভিধান (২০০৪)। Microsoft Encarta Reference Library (2004).©1993-2003 Microsoft Corporation.All right reserved.

লেখকের পরিচিতি

সুসান রাঙ্কল সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী। সিরাকিউস ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন মুম্বাইয়ের সৌন্দর্য-সংস্কৃতির ওপর। উপমহাদেশে প্রথম আসেন ১৬ বছর বয়েসে, এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট হিসাবে। এক দশকের বেশি সময় ধরে মাঠকর্ম করেছেন দক্ষিণ এশিয়ায়। রোমানিয়াতেও কাজ করেছেন। বর্তমানে ডিপও ইউনিভার্সিটিতে নৃবিজ্ঞান ও নারী-অধ্যয়ন-এর সহকারী অধ্যাপক। বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিবর্তন কীভাবে নারীর শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে– এটা হচ্ছে তার গবেষণা-প্রশ্নসমূহের কেন্দ্র। প্রকাশিতব্য গ্রন্থ: মেকিং মিস ইন্ডিয়া মিস ইউনিভার্স: কনস্ট্রাক্টিং জেন্ডার, পাওয়ার অ্যান্ড ন্যাশনাল আইডেন্টিটি। দুটো উপন্যাসও লিখেছেন। প্রথমটা প্রকাশিত হয়েছে নয়া দিল্লি থেকে।

অনুবাদকের পরিচিতি

সেলিম রেজা নিউটন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও প্রাক্তন সভাপতি। ‘মানুষ আর প্রকৃতি বিষয়ক পত্রিকা’ মানুষ এবং বিজ্ঞাপন, যোগাযোগ ও সমাজ বিষয়ক পত্রিকা অ্যাডকমসো জার্নাল-এর সম্পাদক। ইন্টারনেটে ‘মানুষ নেটওয়ার্ক’ (group.yahoo.com/ group/manooshnetwork) নামে একটা অবাধ ও উন্মুক্ত আলোচনা-চক্রের সূত্রধর। কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন। ইমেইল: [email protected]

লেখার উৎস

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্ডিয়া টুগেদার-এ প্রকাশিত মানুষী পত্রিকার ১৪৩-তম সংখ্যা থেকে এই লেখাটা নেওয়া হয়েছে। লেখাটার ইন্টারনেট-ঠিকানা হল: www.indiatogether.com/manushi/issue 143/beautie.htm

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *