ডিজিটাল আইন : নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা ও সর্বাত্মক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রণালী

সারোয়ার তুষার
 
জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে ওশেনিয়া রাষ্ট্রের অধিবাসীদের টেলিস্ক্রিনে বারবার মনে করিয়ে দেয়া হয় “Big brother is watching you”. ওশেনিয়া একটি কাল্পনিক সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র ; যার অধিবাসীদের প্রত্যেকটি কাজ, চিন্তা রাষ্ট্র কর্তৃক নজরদারি করা হয়, নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এমনই মাত্রা সেই নজরদারির যে রাষ্ট্রের না-পছন্দ এমন কোন চিন্তা প্রকাশ করা তো দূরে থাক, এমন চিন্তা করাও অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। বিগ ব্রাদার তথা রাষ্ট্র সম্পর্কে ‘নেতিবাচক’, ভিন্নমত পোষণকারী চিন্তা মস্তিষ্কে হতে থাকলেই, চিন্তাপুলিশ আপনার দরজায় কড়া নাড়বে এবং আপনাকে আটক ও শাস্তি পেতে হবে।
বাংলাদেশ কোন কাল্পনিক রাষ্ট্র নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সরকার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নামক একটি আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের বিভিন্ন ধারা উপধারায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নাগরিকদের মত প্রকাশ, চিন্তা করার স্বাধীনতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দন্ড কী হতে পারে তার একের পর এক ফিরিস্তি। শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি করার জন্য দুই হাজারেরও অধিক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ নিয়োগ করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুলিশকে কোন রকম ওয়ারেন্ট বা পরোয়ানা ছাড়াই শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে যেকোন নাগরিকের বাসা বাড়ি, কর্মস্থলে ঢুকে তল্লাশি, ইলেক্ট্রনিক সরঞ্জামাদি জব্দ করা, এমনকি গ্রেফতার করার একচেটিয়া অধিকার দেয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে কাউকে আটক করার জন্য পুলিশের কেবলমাত্র বিশ্বাস করলেই চলবে যে আটক করার যথেষ্ট কারণ আছে। ওশেনিয়া রাষ্ট্রের পুলিশ চিন্তা প্রকাশিত হবার আগেই কিম্বা শুধুমাত্র কারোর চেহারায় রাষ্ট্রের প্রতি অসন্তোষ দেখেই ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তৎপরতা সনাক্ত করতে পারতো এবং চিন্তা ও চেহারা অপরাধের দায়ে যে কাউকে গ্রেফতার, রিমান্ডে নিতে পারতো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাংলাদেশের পুলিশকে সেই অধিকার দিয়েছে। পুলিশের ‘মনে হওয়া’, ‘বিশ্বাস হওয়া’র ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিশেবে আপনাকে গ্রেফতার রিমান্ডের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। পুলিশ চাইলেই ধরে নিতে পারে আপনি একজন ‘অপরাধী মন’ এর অধিকারী ব্যক্তি। বুঝতেই পারছেন, ফিকশন আর রিয়েলিটির মধ্যে কোনটা বেশি অকল্পনীয় তা নিয়ে ধন্দে পড়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
 
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘নিরাপত্তা’ তাহলে কার নিরাপত্তা? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কথিত নিরাপত্তার সংকট দেখা দিলে রাষ্ট্র তা কীভাবে সুরাহা করবে? বলাই বাহুল্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মূলত সরকার, রাষ্ট্র আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ফারাক ঘুচিয়ে এই তিনটি পৃথক সত্তাকে একক সত্তায় পরিণত করেছে। সবার উপরে পার্টি সত্য তাহার উপরে নাই। যেহেতু রাষ্ট্র, সরকার, আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কোন পার্থক্য থাকছেনা, সুতরাং এদের যেকোন একটির যৌক্তিক সমালোচনা করলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ নেমে আসতে পারে।
সরকারের সমালোচনা করলেই ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে গণ্য করে এই আইন প্রয়োগ করা হতে পারে। কারণ এই আইনে ব্যবহৃত ‘রাষ্ট্রের সুনাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা’, ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ ইত্যাদি শব্দবন্ধকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। সম্ভবত এসব শব্দবন্ধ অস্পষ্ট রাখাই এই আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এতে করে এসব শব্দবন্ধকে যখন যেভাবে খুশি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রের পক্ষে।
যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বহু মত বহু পথের সম্মিলন ঘটেছিল এবং সংগত কারণেই স্বাধীন দেশে তাদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য ছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সেটাই যা যুদ্ধে অংশ নেয়া এবং স্বাধীনতার পক্ষের সকল অংশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। এর কোন সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ীই স্বাধীন দেশে প্রত্যেক নাগরিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক সহ সমস্ত মহলের মুক্ত চিন্তা, মুক্ত পর্যালোচনা ও বাকস্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এই আইনে ব্যবহৃত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দবন্ধ ক্ষমতাসীন পার্টির খেয়ালখুশি মতো বিশ্লেষিত হবে। ফলে এর বাইরে যাবতীয় ভিন্নমত, যৌক্তিক আলাপ-আলোচনা-পর্যালোচনা-অনুসন্ধান ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী’ কর্মকান্ড বলে বিবেচিত হবে।
একইভাবে ‘রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি’ মূলত সরকারের উন্নয়ন প্রচারণার বিপরীত যেকোন প্রচারণাকেই অপরাধ সাব্যস্ত করবে। সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করা বাংলাদেশের প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে এরকম লেখালেখি, বিশেষজ্ঞ মতামতের কারণে রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণ্ণ করার দায়ে জেল জরিমানা নির্যাতন সহ্য করতে হতে পারে।
তার মানে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ মূলত যাবতীয় ভিন্নমত ও সমালোচনার হাত থেকে রাষ্ট্র/পার্টি/সরকারকে ‘নিরাপত্তা’ দেয়ার নিমিত্তে প্রণীত আইন। এই আইনের ফলে বাংলাদেশের জনগণের ইতোমধ্যেই নাজুক নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও স্বাধীনতাবোধ আরো বিপন্ন হতে যাচ্ছে। এই আইনের প্রত্যেকটি ধারা উপধারা ধরে ধরে আমরা এখানে বিশ্লেষণ করতে পারি, কিন্তু বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে না গিয়েও আপাতত এইটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই আইনের ফলে বাংলাদেশের জনগণ বিপুল পরিমাণ রক্তে অর্জিত তাদের স্বীয় রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে।
‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ কর্তৃক সংক্রমিত ত্রাস বাংলাদেশের জনগণকে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের ফাঁদে ফেলছে। রাষ্ট্রীয় স্বৈর-শাসনপ্রণালীর আইনগত বৈধতা তৈরি করেছে। অতীতে ভিন্নমত ও সকল প্রকার বিরোধীতা-সমালোচনা দমন করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র স্বাভাবিক আইনসমূহ রদ করে জরুরি অবস্থা জারি করতো, কিন্তু বর্তমানে তার দরকার পড়েনা, রাষ্ট্র এখন আইন প্রণয়ন করেই নাগরিকের সক্রিয়তা-বুদ্ধিজীবীতা-স্বৈরতন্ত্রের বিরোধীতা দমন করতে সক্ষম দিব্যি ‘স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি বজায় রেখে ; এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্র আরো প্রবল, আরো নিরঙ্কুশ আইনি এখতিয়ার ভোগ করছে।
 
অর্থাৎ রাষ্ট্রের মালিক জনগণকে নিরাপত্তাহীন ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে উন্মুক্ত করাই ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এর (রাষ্ট্রীয়) ‘নিরাপত্তা’ এবং সেই তথাকথিত নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে ফৌজদারি দন্ডবিধির মাধ্যমে। যেন একের পর এক জেল-জরিমানা করতে থাকলেই রাষ্ট্র ‘নিরাপদ’ অনুভব করবে। কিন্তু সত্য হচ্ছে ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টস’ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্র তার ঔপনিবেশিক চরিত্রই উন্মোচন করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এ অঞ্চলের মানুষকে প্রজা জ্ঞান করতো, তাই তাদের যাবতীয় লুটপাট-দুর্নীতিকে নিরঙ্কুশ, জবাবদিহির ঊর্ধে নেয়ার স্বার্থে তারা দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন’ প্রণয়ন করেছিল। 
 
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী একদিকে নিজেদের ‘ডিজিটাল’ ও ‘দিন বদলের’ সরকার দাবি করলেও তারা মূলত ঔপনিবেশিক মদের নেশায় চূড় হয়ে আছে, তারা এই দেশের মানুষকে নাগরিক ও রাষ্ট্রের মালিক মনে করেনা, প্রজা জ্ঞান করে। এই কারণেই ২০১৮ সালে এসেও নিজেদের দুর্নীতি-লুন্ঠন-লুটপাট-স্বেচ্ছাচারিতাকে যেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সমালোচনার মুখোমুখি না হতে হয়, তাই শত বছরের পুরোনো
ঔপনিবেশিক আইনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ‘গোপনীয়তা’ কী জিনিস? রাষ্ট্র যা প্রকাশ করতে চায়না, প্রচার হোক চায়না তাই তো ‘গোপনীয়’ জিনিস। সাংবাদিকতা যদি ‘গোপন’ দুর্নীতি, লুন্ঠনের খবর প্রকাশ না করে, তাহলে আর সেটা সাংবাদিকতা হয় কী করে? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী, কোন সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কোন ‘গোপন’ নথি সাংবাদিকরা যদি ধারণ করেন, তাহলে তারা জামিন অযোগ্য দন্ডবিধির আওতায় পড়বেন। গত দশবছরে শুধুমাত্র ব্যাংকিং খাতে যে পরিমাণ লুন্ঠন ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে, তা শত সীমাবদ্ধতার পরেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কল্যাণেই আমরা জানতে পেরেছি। এই ধরনের সাংবাদিকতা বন্ধ করার আইনি ভিত্তি এনে দিয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সাংবাদিকরা কি তাহলে কেবল রাষ্ট্র কর্তৃক প্রকাশিত, প্রচারিত তথ্যই প্রচার করবে? তাহলে সেটা আর যাই হোক ‘সাংবাদিকতা’ থাকেনা। “অমুক স্থানে র‌্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এতজন নিহত হয়েছে” ; শুধুমাত্র রাষ্ট্রপ্রদত্ত এই প্রেসনোট প্রচার করতে থাকলে এরইমধ্যে রাষ্ট্রের জনসংযোগ বিভাগে পরিণত হওয়া গণমাধ্যমের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা সম্পন্ন হবে।
 
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খুঁটিনাটি, চুলচেরা বিশ্লেষণের চেয়ে আমি মনোযোগ দিতে চাই এইরকম ভয়াবহ নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নের পেছনে রাষ্ট্রের প্রণোদনা কী? রাষ্ট্র কেন এরকম আইন প্রণয়ন করাকে অনিবার্য মনে করছে? ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি এই আইনের প্রাণভোমরা। কার নিরাপত্তা? কার কাছ থেকে নিরাপত্তা? নাগরিকের জানমাল, জীবিকা ও সুস্থ মানসিক বিকাশের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ওয়েলফেয়ার স্টেট তথা কল্যাণরাষ্ট্র কেন নিরাপত্তাকেই তার সুপ্রিম কনসার্ন মনে করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা বসবাস করছি বৈশ্বিক যুদ্ধ অর্থনীতির কালে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র বৈশ্বিক ‘ওয়ার অন টেরর’ এর স্থানীয় গ্রাহক। সদা সর্বদা জরুরি অবস্থা এখন আর ‘স্টেট অব এক্সসেপশন’ নয়, সদা সর্বদা জরুরি অবস্থাই এখন রুল (স্মরণ করা যেতে পারে ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের উক্তি, ” ‘state of emergency’ in which we live is not the exception but the rule)। এই যুদ্ধ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সামাজিক সম্পর্কের জাল, মূল্যবোধ। এর ফলে এমন এক শাসনপ্রণালী অনিবার্য হয়ে উঠেছে যার লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় পরিসরে কাছাছোলা পুঁজির অবাধ প্রবাহ নির্বিঘ্ন করা, পুঁজির প্রবাহে নূন্যতম হস্তক্ষেপ না করা। রাষ্ট্র যদি অর্থনীতিকে বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’ এর নিকট ছেড়ে দেয় তাহলে রাষ্ট্রের কাজ কী? রাষ্ট্র থেকে কী লাভ? কিন্তু রাষ্ট্রকে তো থাকতে হবে।
এই কারণেই আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা, নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা, ক্রমাগত সংকট উৎপাদন করা রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যুগে ‘সংকট’ শাসনপ্রণালীর অনিবার্য ডিসকোর্সে পরিণত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করতে নাগরিকের মনোজগতে সংকটকে স্থায়ী করে তোলা হয়েছে। সমাজে নিরাপত্তাহীনতা, ত্রাস ইনজেক্ট করা হচ্ছে পদ্ধতিগতভাবে। এরই লক্ষ্যে রাষ্ট্র মাত্রই পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সর্বব্যাপী নজরদারির জাল বিস্তার করার মাধ্যমে নাগরিকের সমস্ত কর্মকান্ড রাষ্ট্রের নাগালের মধ্যে আনা হচ্ছে। রাষ্ট্র নাগরিকের বেডরুমে নিরাপত্তা দিতে পারবেনা, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহির কাছ থেকে এই অপারগতা আমরা যেমন শুনি ; ঠিক তেমনি ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’র ( নিরাপত্তা মাত্রই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকের নয়) স্বার্থে প্রয়োজনে ঘরে-বাইরে যেকোন স্থানে যেকোন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তল্লাশি চালাতে পারে, তুলে নিয়ে যেতে পারে।
সুতরাং রাষ্ট্র কোথায় আছে আর কোথায় নেই এটা সনাক্ত করা ছাড়া রাষ্ট্রের বর্তমান চরিত্র অনুধাবন করা সম্ভব হবেনা, সম্ভব হবেনা বিকল্প অন্বেষণও। ওয়েলফেয়ার স্টেটের ওয়ারফেয়ার স্টেটে রূপান্তরিত হওয়ার সাথে সাথে সামাজিক মূল্যবোধ, সংবেদনশীলতারও উৎপাদন, পুনরুৎপাদন ঘটতে থাকে রাষ্ট্রীয় ছাঁচে। সেনসিটিভিটির বিকার কোন পর্যায়ে গেলে কালো পোশাক, কালো চশমা আর কালো রুমাল বেঁধে, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক চারপাশে ঘুরে বেড়ালে নাগরিকরা ‘নিরাপদ’ বোধ করেন। নাগরিকদের এটা ভাবতে বাধ্য করা হয়, যাবতীয় আয়োজন তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে, চারপাশে খতরনাক ‘শত্রু’, ‘সন্ত্রাসী’ গিজগিজ করছে। এদের নিয়ে মাঝেমধ্যে অস্ত্র ‘উদ্ধার’ করতেও যেতে হবে। এজন্যই আরো আরো নিবর্তনমূলক আইন দরকার।
ডিজিটাল যুগে ডিজিটালিও তো ‘নিরাপদ’ থাকতে হবে, তাইনা? ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্রের’ মত, ‘তার আগে চাই নিরাপত্তা’। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে অনন্ত ‘যুদ্ধ’ চলছে, এই যুদ্ধে জেতার কোন বিকল্প নাই। এমনকি ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিকে যুদ্ধের দোহাই দিতে দেখা গেছে। এই যুদ্ধে নাকি জিততেই হবে। ‘শত্রু’র বিরুদ্ধে এই রাষ্ট্রীয় ‘ন্যায়যুদ্ধ’ সর্বব্যাপ্ত ও সার্বজনীন। এই ‘যুদ্ধ’ চলতে চলতে যদি ‘নিষ্পাপ’ মানুষ যুদ্ধের বলি হয়, তাহলে তাকে কলেটোরেল ড্যামেজ তথা প্রয়োজনীয় ক্ষয়ক্ষতি হিশেবে মনে করতে হবে।
সুতরাং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মূলত ডিজিটাল যুগে নেটিজেনদের উপর চালিত রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের আইনি বৈধতা ; যেন সেল্ফ সেন্সরশিপের জাঁতাকলে পড়ে নেটিজেনের স্বাধীনতাবোধ আক্রান্ত হতে হতে স্বাধীনতাবোধই লুপ্ত হয়। নজরদারি, খবরদারি, ত্রাস, সন্ত্রাস অনিবার্য মনে হয়।
 
যাবতীয় ভিন্নমতকে ক্রিমিনালাইজ ও অসম্ভব করে তোলাই আলোচ্য আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ভিন্নমত কিন্তু কেবল একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রয়োজন না, ভিন্নমত দরকার একটা অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে। ভিন্নমত ছাড়া মানুষ ‘ব্যক্তি’ হয়না। ভিন্নমত ছাড়া সমাজ হয়না। কিন্তু একটা সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রপ্রণালী, তা যদি এমনকি ‘বিপ্লবী’ দাবিদার রাষ্ট্রও হয়, ভিন্নমতকে নির্মূল করার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করে এবং গোটা সমাজকে মনোলিথিক তথা সমজাতীয় সমাজে পরিণত করতে চায়। যেখানে ‘সত্য’ মানে সরকারি/রাষ্ট্রীয় বয়ান, ‘মিথ্যা’ মানে সরকারবিরোধীতা, সরকারের সমালোচনা।
গোটা সমাজের বহুস্বরকে রুদ্ধ করে একটা সরকার পরাক্রমশালী থেকে মহাপরাক্রমশালী হতে পারে ; কিন্তু সবচেয়ে মহাপরাক্রমশালী সরকারও একদিন গদিচ্যূত হয়। কিন্তু ভিন্নমতহীন ‘সহমত ভাই’ সমাজ আসলে একচেটিয়াতন্ত্র, গুটিকয়েকতন্ত্র ; কোন সরকারের অবসানের সাথে সাথে যা দেয়ালের পলেস্তারের মত ঝুরঝুর করে খসে পড়ে। ভিন্নমত জারি রাখা তাই সমাজকে রক্ষা করার অংশও বটে। সম্ভবত সেই কঠিন কাজটি আমাদের করে যেতে হবে।
‘১৯৮৪’ উপন্যাস দিয়ে শুরু করেছিলাম। অরওয়েলের মাধ্যমে ‘দ্বৈতচিন্তা’ বা ‘ডাবলথিংক’ নামক শব্দবন্ধের সাথে আমরা পরিচিত হই। Holding two contradictory beliefs simultaneously ; পরস্পর বিপরীতধর্মী চিন্তাকে যুগপৎভাবে ধারণ করা। বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দিকে তাকালে অজস্র দ্বৈতচিন্তার উদাহরণ পাওয়া যাবে। ডিজিটাল যুগে নিজেদের ‘ডিজিটাল সরকার’ দাবি করা, আবার অন্যদিকে ডিজিটাল নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন করা ; তথ্যঅধিকার আইন পাস করা, আবার ঔপনিবেশিক অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট প্রবর্তন করা ; বেডরুমে নিরাপত্তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করা, বেডরুম থেকে নিরাপত্তার অজুহাতে ধরে নিয়ে যাওয়া ; কোন অপরাধ না করলেও শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে আটক করার মাধ্যমে নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা, আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘সরল বিশ্বাসে’ কাউকে ভুলক্রমে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কোন শাস্তির বিধান না রাখা ইত্যাদি।
ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইন মূলত রাষ্ট্রকে যাবতীয় ভিন্নমত, বিরোধীতা, সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করার তাগিদে প্রণীত স্বৈরতান্ত্রিক আইন ; যা রাষ্ট্রীয় ভায়োলেন্সকে চরমমাত্রায় নিরঙ্কুশ, সর্বাত্মক ও দায়মুক্ত করবে, অপরদিকে নাগরিককে করবে আরো অনিরাপদ ও ক্ষমতাহীন। এই আইনের বিরুদ্ধে সক্রিয়তার কোন বিকল্প নাই, কারণ ত্রাস ও ভয়ের সংস্কৃতিতে নিষ্ক্রিয়তার চড়া মূল্য দিতে হয়।
 

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *