শ্রমিকের শাস্তি বাড়িয়ে সড়কে সমাধান আসবে না

বখতিয়ার আহমেদ
[ এই আর্টিকেলটি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরুর প্রেক্ষিতে লিখিত হয়েছিল, ২ আগস্ট, ২০১৮। ]
প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহণ আইন যেটুকু দেখলাম তাতে মনে হচ্ছে না সমস্যার কোন সমাধান হবে। কারণ যতদূর মনে হল, এই আইনে সমাধান খোঁজা হয়েছে মূলত পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ফাঁসিসহ বড় বড় শাস্তির মধ্যে। এই আইন হয়তো পপুলার হইতে পারে, কিন্তু এদিয়ে সড়কে কোন বাড়তি নিরাপত্তা আসবে বলে মনে হয় না। না, আই অ্যাম নট কনভিন্সড অ্যাট অল।
পরিবহন খাত শ্রমিকের জন্য গার্মেন্টসের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত। মহাসড়কের ঝুঁকি আপনার আমার মতন মাঝে মাঝে ট্রাভেল করাদের জন্য যত, একই রুটে দিনে তিন ট্রিপ মারাদের জন্য প্রতিদিন তার তিনগুণ। উল্টা দিক থেকে ধেয়ে আসা সম্ভাব্য মৃত্যুকে যারা প্রতি ট্রিপে শতবার গা ঘেঁষে পাশ কাটায়, তাদের আপনি ফাঁসির ভয় দেখায় লাইনে আনতে পারবেন? মনে হয়না। মরার ভয় থাকলে বাংলাদেশের পরিবহন খাতে কেউ করে-কর্মে খেতে পারেনা। ডাউট থাকলে যে কোন ড্রাইভার-হেল্পারকে জিজ্ঞেস করে দেখেন।
প্রস্তাবিত আইনে যাত্রী আর যাত্রীসেবা নিয়ে কঠোর সব বিধান থাকলেও পরিবহণ শ্রমিকদের জন্য দেখলাম আছে শুধু শতাধিক শর্ত আর শাস্তি। কোন অধিকার, মজুরি আর মজুরির ধরণ, মালিকের সাথে চুক্তির ধরণ ও শর্ত, এসব নিয়ে কিছুই নেই। একটা চুক্তিপত্র করবার কথা বলা হলেও তার শর্ত নিয়ে কোন নির্দেশনা নেই। নিয়োগের আগে লাইসেন্স দেখা ছাড়া মালিকের আর কোন দায়ও দেখলাম না। শ্রমিকের শ্রম-ঘন্টা শ্রম-আইনের উপর ছেড়ে দেয়া হলেও চালকের শ্রমঘন্টা শ্রম আইনের বাইরে রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে এ ব্যাপারে সরকারের গেজেট হবে।
নিজেকে শ্রমিকের জায়গায় বসায় ভেবে দেখলাম এই আইন আমি হলেও মানতে চাইতাম না। মানতে বাধ্য হলে এর জন্য পাব্লিককে দায়ী করতাম, এই আন্দোলনকে দায়ী করতাম। যাত্রীদের প্রতি শত্রুতাবোধ করতাম।
বাংলাদেশের শ্রমজীবিদের জন্য পরিবহন খাত সবচে ইজি এক্সেসের জীবিকা। শিক্ষাগত যোগ্যতার তেমন দরকার নাই, হেল্পার হিসেবে ঢুকে পরে ওস্তাদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে শিখতে থাকা, একদিন ড্রাইভার হয়ার স্বপ্ন দেখা, আর ড্রাইভার হলে একদিন একটা গাড়ি নামানোর স্বপ্ন দেখা, এই হচ্ছে এখানে জীবিকার জার্নি।
তুলনামূলকভাবে ভাল আয়ের খাত হইলেও, এই খাতের প্রধাণ বৈশিষ্ট হচ্ছে অনিশ্চয়তা। মালিকের কাছে দিনে কন্ট্রাক্ট নিছেন পাচ হাজার টাকায়, ঢাকার ভেতরে ঠিক মতন সিরিয়াল পাইলে হেল্পার ড্রাইভারের ২ হাজার থাকতে পারে, আর ঠিক মত সিরিয়াল না পাইলে, জামে টাইম খাইলে তিনশ টাকাও না জুটতে পারে। মালিকের মুনাফা কিন্তু আগেই গ্যারান্টিড। আবার সিরিয়ালের পাড়াপাড়ি করতে গিয়ে একটা কেস খাইলে কিন্তু তিনদিনের গড় ইনকাম নাই হয়ে যেতে পারে। ঢাকা-রাজশাহী টানা তিন ট্রিপ মারতে পারলে ড্রাইভার, ধরেন দিয়ার বাবা, চার হাজার টাকা নিয়েও ফিরতে পারেন, আবার চন্দ্রায় জ্যাম খাইলে দেড়দিন স্টিয়ারিং ধরে দেড় হাজারের বেশি নাও জুটতে পারে। জীবনের ঝূঁকি আর অমানবিক পরিশ্রম থাকলেও, একদিকে মালিকের মুনাফার আগাম নিশ্চয়তা আর অন্যদিকে রাস্তার জ্যাম মিলিয়ে দেশের পরিবহন খাতের শ্রমিকের জীবিকাকে প্রায় জুয়ার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। স্টিয়ারিং হাতে মানুষটার জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকলে পেছনের আরাম কেদারায় বসা কিম্বা রাস্তায় ইভনিং ওয়াকে নামা আপনার আমার জীবনের নিরাপত্তাও যে থাকবে না, এইটা বোঝার জন্য আপনার মার্ক্সবাদ বোঝা লাগেনা কিম্বা শ্রমিক-শ্রেণীর উপর বামপন্থাপ্রসূত মায়া-মমতাও লাগে না। যেটা লাগে সেইটা হইল কমনসেন্স। আর মিডিয়া মোতাবেক পরিবহন শ্রমিকরে দানব ভাবতে থাকলে সেই কমনসেন্স আর আপনার জন্য কমন থাকবে না। রেয়ার হয়ে যাবে। হাইপোথেটিক্যালি হইলেও ভাবেন এয়ারপোর্ট রোডে সেদিন মরে যাওয়া একতা পরিবহনের ড্রাইভারের মেয়ে দিয়ার কথা। ভাবেন এসএসসি’তে ভাল রেজাল্ট করা দিয়ার বড় সাধ রমিজুদ্দিন কলেজে পড়বে। কালকেই ভর্তি হতে লাগবে পাঁচ হাজার টাকা। দিয়ার বাবা স্টিয়ারিং হাতে চার ঘন্টা ধরে বসে আছেন চন্দ্রার জ্যামে। আর বারো ঘন্টার মধ্যে আরো দুই ট্রিপ না মারলে হবে না চার হাজার। জ্যাম ছোটার পর উনি কি করবেন? অ্যাক্সিলেটরে সুশীল চাপ দিবেন? নাকি জোরেই দিবেন চাপটা। ঝুঁকি শুধু উনি কি আপনার জীবনের উপরে নিলেন তখন, নাকি বাসের সবচে সামনে বসে নিজের জীবনের উপরেও নিলেন? আপনি-আমি নিইনা সন্তানের জন্য জীবনের ঝুঁকি?
অনিশ্চিত জীবিকার বাইরে আছে আরো বড় অনিশ্চয়তা – অ্যাক্সিডেন্ট। অ্যাক্সিডেন্ট মানে শুধু ইনজুরি না, সাথে মামলাও। পরিবহনের মতন অনিশ্চিত খাতে শ্রমিকের সঞ্চয় বলে তেমন কিছু থাকেনা। আর অ্যাক্সিডেন্ট-মামলা খাইলে নেমে যেতে পারে কয়েক বছরের সঞ্চয় কিম্বা স্বপ্ন, সাথে ইনকামও। তখন না আছে মালিক, না আছে সরকার, না আছি আপনি-আমি। অ্যাক্সিডেন্ট-মামলা ছাড়াও অন্য অসুখ-বিশুখে পড়লেও তাই। কেউ নাই তখন এই শ্রমিকদের, নাই কোন জীবন-বীমা, নাই কোন অ্যাক্সিডেন্ট বা হেলথ কাভারেজ, নাই কোন প্রভিডেন্ট ফান্ড, নাই কোন পেনশন-গ্রাচুইটি। পপুলার পারসেপশন মোতাবেক অশিক্ষিত হওয়ার কারণে উনারা শুধু অ্যাক্সিডেন্টই বেশি করেন না, এই ধরণের ব্যাপার-স্যাপার যে রুজি-রোজগারে থাকতে পারে, সেটাও ঠিকমত জানেন না। তাইলে কে আছে উনাদের? আছে একমাত্র শ্রমিক ফেডারেশন। অ্যাক্সিডেন্ট বলেন, মামলা বলেন, অসুখ বলেন, কি মালিকের সাথে মূলামূলি বলেন, ফেডারেশন ছাড়া আর কোন গতি নাই। একারণেই উনারা ফেডারেশনের চাঁদা বিনা-বাক্য ব্যয়ে দিয়ে দেন। একারণেই ফেডারেশন নেতারাই উনাদের ত্রাণকর্তা। উনাদের নেতার যে হাসি আপনার-আমার বীভৎস লাগে, সেই হাসিই কোর্ট-কাচারি থেকে শুরু করে জেল-জরিমানা ভয় থেকে উনাদের আস্বস্ত করে। দেশের সবচে ঝুঁকিপূর্ণ পেশার তাবৎ অনিশ্চয়তার মাঝে এই নেতারাই উনাদের একমাত্র নিশ্চয়তা। আপনারা শ্রমিকদের যত বেশি শাস্তির ভয় দেখাবেন, তারা উনাকে তত বেশি আঁকড়ে ধরবেন, সেই হাসি-সমেত উনাকে আরো ক্ষমতাবান করে তুলবেন। শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মাঝে রেখে সড়কে আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা আসবার কোন সুযোগ নাই। আমরা যতই শাস্তির দাবিতে তড়পাই, স্টিয়ারিং কিন্তু উনাদের হাতে। উনাদের প্রতি মায়া-মমতা না লাগতে পারে, আমার নিজেরও যে খুব লাগে তা না, কিন্তু আমার বাচ্চার নিরাপত্তা যে উনাদের স্টিয়ারিং ধরা হাতের জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া আসবে না, এইটা আমি কমনসেন্স দিয়া বুঝতে পারছি। ফলে আমি আমার বাচ্চার কাছে উনাদের অযথাই দানব বানাইতে রাজী না।
একারনেই বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ সড়ক যে চালক-শ্রমিকের যথার্থ শ্রমঘন্টা, ট্রিপ-সিস্টেমের বদলে মাসিক মজুরি আর ঝুঁকি ভাতা না দেয়া হলে, চালক-শ্রমিককে চুক্তি-ভিত্তিক গাড়ি বর্গা দেয়া বন্ধ না করা হলে নিশ্চিত করা সম্ভব না – সেইটা আমি গত কয়দিন ধরেই বলার চেষ্টা করেতেছি। এসব ছাড়া শ্রমিকদের ফেডারেশন নেতাদের বলয় থেকে বের করে আনা সম্ভব না, মালিকের মুনাফা-তাড়িত মার্ডারাস ড্রাইভিং থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব না। সাবধানে গাড়ি চালিয়ে যদি সংসার চলে, কে যাবে বেপরোয়া চালাতে? বেপরোয়া চালিয়ে যদি বাড়তি আয় না হয় তবে কে যাবে বেপরোয়া চালাতে? কিন্তু ট্রিপ-বর্গা ব্যবস্থায় রেখে যতই আপনেরা শাস্তির ভয় দেখান, জীবিকার দায়ই উনাদের গাড়িগুলান উম্মত্ত দাবড়ে নিয়ে বেড়াবে। এই সমস্ত কারণেই আমি আমি স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের শ্রমিকদের মুখোমুখি দাঁড় করাইতে রাজী না। বরং বাচ্চাদের সাথে উনাদের নিশ্চিত জীবিকার দাবিতে দাঁড়ানোর পক্ষপাতি। আর সেইটা মোটেও এই শ্রমিক-শ্রেণীর স্বার্থে না, একদম আমার নিজের ব্যক্তিগত আর পারিবারিক স্বার্থে। নিরাপদ সড়ক আমারো দরকার, সন্তান আমারো আছে।

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *