ক্ষমতার দ্বিচারিতা ও ভিন্নমত দমন

মাসকাওয়াথ আহসান

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী তার গত প্রায় দশটি বছরের শাসনামলে ক্ষমতা নিরংকুশ করতে এক এক করে সমস্ত ভিন্নমতকে দমন নিপীড়নের যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন; তাকে একটি প্রতিশোধের মহাকাব্য বলা যায়।

আওয়ামী লীগ শাসন ক্ষমতায় এসেই স্থির করে, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীন ব্যাংকটি তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সেখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ জারী করবে। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করা হয়; এই দখলকে একটি আইনি চেহারা দিতে। ইউনুসের অবসরের বয়স হয়েছে; এই ন্যারেটিভ ঘোষণা করেন অধ্যাপক ইউনুসের চেয়ে বয়সে প্রবীন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু এই ঘটনার সুষ্পষ্ট অনুবাদ দাঁড়ায়, যেহেতু নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনুস রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন; সুতরাং তাকে তার সারাজীবনের সাধনায় প্রতিষ্ঠিত; গোটা বিশ্বে স্বীকৃত ও পঠিত গ্রামীন ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করা হলো। আওয়ামী লীগের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পিকেটাররা গত দশ বছর ধরে অধ্যাপক ইউনুসকে দেশের শত্রু প্রমাণে তার চরিত্রহনন ও তাকে অপমানের চেষ্টা চালিয়েছে প্রতিদিন।

গ্রামীন রাজনীতির কাচারী বাড়ির আদলে সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রতিটি প্রতিশোধ কাব্য পঠিত চর্চিত হয়েছে। সাংবাদিক সমাজের দলীয় বৃত্তটি প্রতিটি প্রতিশোধ ঘটনার প্রচারণায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

এই প্রতিশোধ যাত্রায় টেলিভিশনের টকশোকে শত্রু বধের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামকে এটিএন টিভির টকশোতে আমন্ত্রণ জানিয়ে আওয়ামী লীগের এমবেডেড সাংবাদিক দিয়ে প্রশ্ন করিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে মাহফুজ আনামকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়, সেনা সমর্থিত এক এগারো সরকারের সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ডেইলি স্টার ও অন্যান্য দৈনিকে ছাপা হয়েছিলো। স্বাভাবিক গণতন্ত্রের দেশে একাধিক সোর্সের কাছ থেকে নিশ্চিত না হয়ে কোন খবর ছাপা অনৈতিক। কিন্তু অস্বাভাবিক এক এগারো বা একপেশে গণতন্ত্রের দেশে সব মিডিয়াই এরকম খবর ছাপতে বাধ্য হয়।

খোদ শেখ হাসিনার শাসনামলেই কথিত ক্রসফায়ারের গল্পগুলো কেবল পুলিশ, এলিট ফোর্স আর গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটিএন টেলিভিশন সহ প্রতিটি টিভি ও দৈনিক প্রকাশ করে। কিন্তু মাহফুজ আনামকে বাগে পেয়ে তার কাছ থেকে কথিত
সাংবাদিকতা নৈতিকতা ভঙ্গের স্বীকারোক্তি আদায় করে; এরপর কাচারি ঘরের অনুপ্রেরণায় তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মানহানির মামলা দায়ের করা হয়। ভিলেজ পলিটিক্সে মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে আদালতের ঘানি টানানো “প্রতিশোধ” সংস্কৃতির গ্রাম্য অনুশীলন। মাহফুজ আনাম এটিএন টকশো’র উপকাচারী ঘরের ফাঁদে পড়ে সেই আদালতের বারান্দায় ঘোরার শাস্তি পেতে থাকেন।

ভিলেজ পলিটিক্সে’র আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে “গুপন (গোপন) কথা ফাঁস”। এইক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের টেলিফোনে আড়ি পেতে তাদের গ্রেফতারের উপযুক্ত একটি বাক্য খুঁজতে থাকে। আর আওয়ামী লীগের ফেসবুক পিকেটাররা বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তিগত টেলিফোন আলাপ ফাঁস করে গ্রাম্য রগড় ও বে-আইনি এই অশ্লীল অনাচার অব্যাহত রাখে। কিন্তু যেহেতু এগুলো প্রতিশোধের অস্ত্র; তাই শেখ হাসিনার সরকার এই বে-আইনি কার্যক্রমটিকে কখনো আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়নি।

সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা
মাহমুদুর রহমান মান্নার টেলিফোন আলাপ ফাঁস করে একটি অপরাধমূলক বাক্যের অপরাধে কারাগারে ছুঁড়ে ফেলা হয়। অথচ প্রকাশ্যে এর চেয়ে অনেক বেশী অপরাধমূলক বাক্য বলেও হেফাজত নেতা শাফি লাভ করেন আওয়ামী লীগের উপহার আর আশীর্বাদ।
মান্নার বলা বাক্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কোন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি; অথচ শাফির বলা বাক্যের ঘোষণায় ধারাবাহিক ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু একই দেশে দুই রকম আইন থাকায়, মান্না গেলেন কারাগারে; শাফি এলেন সরকারি সাজঘরে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়; দেশের মিডিয়ার ওপর নেমে আসে সরকারী সেন্সরশিপের খড়গ; জনগণের তথ্য জানার অধিকার যখন সংকুচিত; আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম তখন আল-জাযিরা টিভিতে গণতন্ত্রহীনতার নির্মম বাস্তবতার বিশ্লেষণ তুলে ধরার দায়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত ও নির্যাতিত হন। শহিদুলের বিরুদ্ধে কথিত “গুজব” রটনার অভিযোগ দায়ের করা হয়। বছর দশক ধরে নানারকম গুজব রটনার মাধ্যমে নিয়মিত ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় সহমত ভাই ও বুবুরা “গুজব” শব্দের বিরুদ্ধে আচম্বিতে জেহাদ ঘোষণা করে। কথিত “গুজব” ঠেকাতে এসে পড়ে; ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন; যা ব্লাসফেমি আইনের মতো নিপীড়নমূলক। শহিদুলের ওপর প্রতিশোধকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে দায়িত্বপূর্ণ অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, শহিদুল মানসিক রোগী ও তার পরিবারে মানসিক রোগ আছে এমন ডিফেমেটরি বা মানহানিকর মন্তব্য করেন।

ক্ষমতাসীন সরকারের সব চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে সহমত পোষণ করে; বিচার বিভাগের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এক রায়ের পর্যবেক্ষণে ভিন্নমত পোষণ করায়; সাবেক বিচারপতি এস কে সিনহাকে
আইনমন্ত্রী কতৃক ক্যানসার রোগী বলে ঘোষণা দিয়ে; গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে চাপ দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া ও পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এইভাবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নিরংকুশ করার ক্ষেত্রে এর নিরাপোষ মনোভাবের পরিচয় সুস্পষ্ট করে। এস কে সিনহা নির্বাসিত জীবনে “কিছুদিন আগে দেশে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে”র বিশদ বিবরণ দিয়ে একটি ইংরেজি গ্রন্থ প্রকাশ করলে; সম্প্রতি প্রচলিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ভঙ্গ করে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বিচারপতি এসকে সিনহাকে নিয়ে প্রতিশোধমূলক ও শিষ্টাচারে অনুত্তীর্ণ ফটোশপ প্রকাশ করেন। স্পষ্ট হয়ে যায়; এ আইন কেবল ক্ষমতাহীন ও ভিন্নমত পোষণকারীদের শিকার করার জাল।

জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের বর্ষীয়ান নেতা ড কামাল হোসেনকে নিয়ে অনুরূপ মানহানিকর ফটোশপ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। আর সেই গো এহেড পেয়ে আওয়ামী লীগের ফেসবুক পিকেটাররা প্রতিটি ভিন্নমত পোষণকারী সিনিয়ার সিটিজেন ও অন্যদের মানহানি করে চলেছে প্রতিদিন।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে অংশ নেয়া ব্যারিস্টার মইনুলের জন্য একাত্তর টিভির উপকাচারী ঘরে ফাঁদ পেতে সাম্প্রতিক এক টকশোতে একজন সরকারী সাংবাদিক (নারী), মইনুলকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে জামাতের প্রতিনিধি হিসেবে
ট্যাগিং করে একটি ডিফেমেটরি বা মানহানিকর প্রশ্ন করেন। মইনুল এর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এরকম প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আপনাকে চরিত্রহীন বলতে চাই; বরং শিক্ষিত ভদ্রমহিলার মত প্রশ্ন করুন। অমনি প্রশ্নেই মইনুলকে জামাতের প্রতিনিধি তকমা দেয়ার মানহানির কথা ভুলে; আওয়ামী নারীবাদীরা শুধু মইনুলের প্রতিক্রিয়ার ‘চরিত্রহীন’ শব্দটিকে ১০১ বার উচ্চারণ করে; মইনুল জাতীয় মহিলা অবমাননা করেছেন বলে আওয়াজ তোলে।

এই একাত্তর টিভির টকশোতে নারায়ণগঞ্জের মেয়র আইভী রহমানকে আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান যখন পুরুষতন্ত্রের অভিধান উজাড় করা মানহানিকর কথা-বার্তা বলেছিলেন; তখন এই আওয়ামী নারীবাদীরা স্পিকটি নট ছিলেন। একইরকম সিলেক্টিভ “অনুভূতি” ও “ন্যায়বিচারে”-র গণভবন সংবাদ সম্মেলনে বসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মইনুলের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রেরণা দেন। অমনি এই হুকুমের পরপরই মামলা ও গ্রেফতারের মাধ্যমে মইনুলের “প্রতিশোধ” কার্যকর হয়।

মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লা চৌধুরী একটি টিভি টকশোতে সেনাপ্রধান সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। জাফরুল্লা সংবাদ সম্মেলন করে দুঃখপ্রকাশ করার পরে তার বিরুদ্ধে “মাছচুরি”র মামলা হয়। কালো পেশীশক্তি এসে জাফরুল্লা প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের জন্য হামলা করে। এলিট ফোর্স গণস্বাস্থ্য ওষুধ কোম্পানিকে অর্থদণ্ড দিয়ে এতে তালা ঝুলিয়ে দেয়। জাফরুল্লা প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কালো পেশীশক্তি হামলা চালালে; সেই যে এলিট ফোর্সের গুলিতে পা হারানো আইনের ছাত্র ঝালকাঠির “লিমন”; তার হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়। মেয়েদের হলে ঢুকে মেয়েদের ওপর হামলা চালানো হয়। আওয়ামী নারীবাদীদের ১০১টি স্বাক্ষর সিলেক্টিভ “ন্যায়বিচারের” স্লিপিং পিল খেয়ে তখন আবার ঘুমিয়ে থাকে।

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *