বন্দুক যুদ্ধে উন্মোচিত জীবন অথবা ‘বাংলাক্যাম্প’

পারভেজ আলম

[এই প্রবন্ধটি সর্বজনকথা, আগস্ট-অক্টোবর, ২০১৮ সংখ্যায় পূর্ব প্রকাশিত ]

ইব্রাহিমি ধর্মীয় ঐতিহ্য মোতাবেক পৃথিবীর প্রথম হত্যাকান্ডের শিকার হন আদম পুত্র হাবিল, তার ভাই কাবিলের হাতে। হত্যার কারণ হিসাবে হিংসার কথা বলা হয়। হাবিল ও কাবিল উভয়েই আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানি দিয়েছিলেন। হাবিল দিয়েলেন পশু কুরবানি, কাবিল দিয়েছিলেন শষ্য। আল্লাহ হাবিলের কুরবানি গ্রহণ করলেন, কিন্তু কাবিলের কুরবানি গ্রহণ করলেন না। এতে হিংসার বশবর্তি হয়ে কাবিল হাবিলকে খুন করলেন। ইহুদিদের মিদ্রাস এবং মুসলমানদের কোরানের বিভিন্ন তাফসির ও সিরাত গ্রন্থ মোতাবেক কুরবানি কবুল হওয়ার সাথে পছন্দের নারীকে বিয়ে করার সুযোগের সম্পর্ক ছিল, আর তাই হিংসার প্রধান কারন। আল থালাবি, আল তাবারি প্রমুখের লেখা সিরাত মোতাবেক এই পছন্দের নারী কাবিলের জমজ বোন আকলিমা।[1] থালাবির বর্ণনামতে কাবিল ও আকলিমা উভয়েরই জন্ম বেহেশতে, সুতরাং কাবিল আকলিমাকে শুধু তার উপযুক্ত মনে করতেন, হাবিলের উপযুক্ত নয় যার জন্ম দুনিয়ায়। অন্যদিকে জাফর আল সাদিকের (তিনি অজাচার থেকে মানব জাতির জন্মের কাহিনি মানতে পারেন নাই) মতে এই পছন্দের নারী হলেন একজন হুর, যার নাম তারাকাহ।[2] তারাকাহ হোক বা আকলিমা, লড়াই এখানে একজন বেহেশতি নারীর জন্যে।

হাবিলের লাশ বয়ে বেড়াচ্ছে কাবিল ; কিসাস আল আমবিয়ার মধ্যযুগীয় সচিত্র সংস্করণ থেকে

হত্যাকান্ডের কারন যাই হয়ে থাক না কেনো, পৃথিবীর প্রথম এই হত্যাকান্ডের কোন বিচার হয়েছে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তাওরাত মোতাবেক, আল্লাহ কাবিলকে বহিস্কার করেছিলেন। বহিস্কার করা একটি শাস্তি বটে, যদি আপনি প্রাচীন দুনিয়ার কথা হিসাব করেন তবে তা খুবি কঠিন শাস্তি। গোত্র বা নগর থেকে বহিস্কৃত ব্যক্তির যেহেতু কোন নিরাপত্তা ছিল না তাই বহিস্কার আর মৃত্যু ছিল সমান। তাওরাতে কাবিলকে তাই আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলতে দেখা যায় – এই শাস্তি আমার সহ্যের বাইরে। … পলাতক হয়ে যখন আমি দুনিয়াতে ঘুরে বেড়াব তখন যার সামনে আমি পড়ব সে-ই আমাকে খুন করতে পারে” (পয়দায়েশ ৪:১৩,১৪)। তাই দয়াপরবশ হয়ে আল্লাহ কাবিলকে একটি নিরাপত্তার চিহ্ন দিয়ে দিলেন যাতে তাকে কেউ হত্যা না করে। এবং ঘোষণা দিলেন – যে তোমাকে খুন করবে তার উপর সাতগুণ প্রতিশোধ নেওয়া হবে (পয়দায়েশ ৪:১৫)। সুতরাং, তাওরাতে কাবিলের বহিস্কারকে নিশ্চিতভাবে শাস্তি বলা যাচ্ছে না। বরং দেখা যায় যে, এরপর কাবিল একজন নগর প্রতিষ্ঠাকারী ও জাতির পিতায় পরিণত হন। তাওরাতের কাবিল তাই একজন সার্বভৌম শাসক চরিত্র।

 

সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন রাজা, সম্রাট কিংবা আধুনিক রাষ্ট্রের সহিংস হওয়ার বৈধতা থাকে, এমন কি প্রয়োজনে হত্যাকান্ড সংগঠনেরও। সার্বভৌমের হত্যাকান্ড বিচারিক হত্যাকান্ড। সাধারণত সুনির্দিষ্ট আইন মেনে ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্র কাউকে হত্যা করে। সাধারণত বলছি, কারন এই নিয়মের ব্যতিক্রম আছে। ব্যতিক্রম অবস্থা বা জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই রাষ্ট্রীয়, জাতীয়, নাগরিক ইত্যাদি নিরাপত্তার অযুহাতে বিচারবহির্ভূতভাবেও হত্যা করতে পারে। আগের কালে রাজা বাদশারা কাউকে খুন করলেও সেটা বিচারিক হত্যাকান্ড ধরা হতো, তবে অন্তত খুনের পরে হলেও হত্যার পক্ষে অযুহাত অথবা রায় দেয়ার প্রয়োজন পড়তো। আধুনিক রাষ্ট্রে, যেমন বর্তমান বাংলাদেশে পুলিশ বা র‍্যাব বন্দুক যুদ্ধের বিবৃতি দেয়ার মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে। কাবিলের হাতে হাবিলের হত্যাকান্ডটি বিচারিক হত্যাকান্ড হতে পারতো যদি কাবিল এই হত্যাকান্ডের সময় একজন সার্বভৌম থাকতেন। কিন্তু ঘটনা তা নয়। হত্যাকান্ডের পরবর্তি সময়ে কাবিলের একজন সার্বভৌম চরিত্রে পরিণত হওয়াটা তাই তার বিচারবিহর্ভূত হত্যাকান্ডের বৈধতার মিথিকাল বিবৃতি হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে। বাংলাদেশের র‍্যাব অথবা পুলিশদের বিবৃতিগুলোও একধরণের মিথিকাল বিবৃতি। যাই হোক, কাবিল যদি খুন করার সময় সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী না হয়ে থাকে তাহলে তার হাতে হাবিলের হত্যাকান্ডটি কি একটি হোমিসাইড গণ্য করা হবে? ইব্রাহিমি ঐতিহ্যে এই হত্যাকান্ডের যতো কাহিনি প্রচলিত আছে, বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিকরা এই হত্যাকান্ড সম্বন্ধে যে মতামত দিয়েছেন, তাতে এই প্রশ্নের সহজ ও সরাসরি উত্তর পাওয়া যায় না। আগামবেনের মতে, ‘সহিংসতা’ হলো বিচার ব্যবস্থার আদি ভিত্তি।[3] সেইসাথে, সার্বভৌমের ক্ষমতা আসলে আইনের ভেতরে বা বাইরে না; বরং বৈধ এবং অবৈধ সহিংসতা, কিংবা বৈধ অথবা অবৈধ হত্যাকান্ড যেই দোড়গোরায় একাকার হয়ে যায় সেই অবিচ্ছেদের এলাকায় বিরাজ করে। একিসাথে আইনের ভেতরে ও বাইরে থাকার এই প্যারাডক্সকে আগামবেন ব্যাখ্যা করেছেন এই বাক্যের মধ্যেঃ “আমি, সার্বভৌম, যিনি আইনের বাইরে, ঘোষনা করছি যে আইনের বাইরে কিছু নাই”।[4] সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিষ্ঠাই ঘটেছে সকল জীবনকে তার কাছে সম্ভাব্য হত্যাকান্ডের জন্যে উন্মুক্ত জীবন হিসাবে গ্রেফতার করার মাধ্যমে। কাবিল চরিত্রটি সার্বভৌম ক্ষমতার সেই দোরগোড়ায় অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে যা বিচার ব্যবস্থার আদি ভিত্তিও বটে।

 

কিন্তু খুন হওয়া হাবিলের কি হবে? তার খুনের বৈধতা নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে না আসা গেলেও তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে বলেই ইব্রাহিমি ঐতিহ্যে মনে করা হয়। ধর্মীয় পন্ডিতরা তার প্রতি সহানুভুতিশীল। এই খুন ‘অন্যায়’ হলেও তাকে আইনগতভাবে ‘অপরাধ’ হিসাবে চিহ্নিত করা কঠিন, অথচ অন্যায়-অপরাধ আমরা একযোগে উচ্চারণ করি এমন ভাবে যেনোবা এই দুই একি। নীতিশাস্ত্র আর আইনশাস্ত্র পরস্পরের উপরে নির্ভর করলেও এক বিষয় না। কাবিলের হাতে হাবিলের খুন তাই ইব্রাহিমি ধর্মতাত্ত্বিকদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এমন এক অবস্থার সামনে যাকে দেরিদার ভাষায় বলা হয় ‘আনডিসাইডেবিলিটি’, মানে যখন আর ভালো বনাম মন্দ অপরাধ বনাম নিরপরাধ এইরকম বাইনারি দিয়ে অর্থ উৎপাদন করা যায় না। এই আনডিসাইডেবিলিটি অতিক্রম করার জন্যে সাধু অগাস্টিন প্রস্তাব করেছেন যে – আল্লাহ কাবিলকে দিয়েছে এই দুনিয়ার নগর আর হাবিলের জন্যে খুলে দিয়েছেন খোদ ‘আল্লাহর নগরে’র দরোজা এবং তাকে সেখানে দাখিল করেছেন।[5] অগাস্টিনের এই প্রস্তাব খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব অনুসারেই। অগাস্টিনের হাবিল ঈসা মসিহ ও আদি খ্রিস্টান সাধুদের মতো একজন শহীদ চরিত্র, যে এই দুনিয়ায় বিচার না পেলেও আল্লাহ তাকে নিজ রাজ্যে জায়গা দিয়েছেন। আগামবেন তার পাইলেত ও ঈসা গ্রন্থে বাইবেলে বর্ণিত পাইলেত কর্তৃক ঈসার বিচারের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন দুনিয়ার রাজত্ব এবং আল্লাহর রাজত্বের পরস্পরের মুখোমুখি হওয়ার রূপক হিসাবে, যাতে দুই রাজ্যই একে অপরের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত রায় দেয়া থেকে বিরত থাকে।[6] এই বিরতি বজায়ে থাকবে শেষ জমানা পর্যন্ত, কেয়ামত ও শেষ বিচার সংগঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত। সাধু অগাস্টিন কাবিলের হত্যাকান্ডকে এই দুনিয়ার সার্বভৌমত্বের অধিন নয়, বরং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধিন ছেড়ে দিয়েছেন। এর যদি কোন সমাধান হয় তবে শেষ জমানাতেই হওয়ার কথা। কাবিলকে একজন শহীদ চরিত্র হিসাবে চিত্রায়ন এবং তার খুনের বিচারকে আল্লাহর হাতে তথা শেষ বিচারের হাতে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে আরো সুস্পষ্ট অবস্থান দেখা যায় কোরান শরীফে। আল থালাবি হাবিলের জন্যে সরাসরি শহীদ শব্দটির ব্যবহার করেছেন। কোরানের সুরা মায়েদায় যে হাবিলকে পাওয়া যায়, সে হাবিল ইসা মসিহা ও গৌতম বুদ্ধের মতো অহিংস চরিত্র। কাবিল যখন তাকে মারতে উদ্যত হলো, তখন সে বললো – যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবে আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা, আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি (সুরা মায়েদা, ২৮)। এইদিক থেকে কোরানের হাবিল ইহুদি মিদ্রাসের হাবিলের চাইতে কাঠামোগতভাবেই ভিন্ন একটি চরিত্র। মিদ্রাসের হাবিল কাবিলের সাথে কুস্তি করে পরাজিত হয়ে নিহত হয়েছে, কোরানের মতো লড়াই না করেই মৃত্যুবরণ করে নাই। কোরানের হাবিল একটি পরিস্কার ভাবেই একটি শহীদ চরিত্র। তাই সে কাবিলকে বলে যে – আমি চাই যে, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও। অতঃপর তুমি দোযখীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাও। এটাই অত্যাচারীদের (জালিমদের) শাস্তি (সুরা মায়েদা,২৯)। অর্থাৎ, কোরান অনুসারে, হাবিলের মতে কাবিল এই দুনিয়ায় শাস্তির মুখোমুখি না হলেও আল্লাহর বিচারে তার গন্তব্য হবে দোযখের আগুন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত র‍্যাবের হাতে একরামুল হত্যাকান্ডের পর তার স্ত্রীকে র‍্যাবের সদস্যরা আল্লাহর কাছে বিচার দেয়ার জন্যে বলেছিলেন বলে খবরে প্রকাশ পেয়েছিল। র‍্যাব এখানে ‘আল্লাহর বিচার’ বলতে যা বুঝিয়েছে তার সাথে কাবিলের হাতে হাবিলের হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিচারের পার্থক্য নাই। এর আসল অর্থ হলো – দুনিয়ায় বিচারের অনুপস্থিতি। অর্থাৎ সার্বভৌম ক্ষমতা যে অন্যায় হত্যাকান্ডকে বৈধতা দেয় তাকে অবিচার মনে হলেও মেনে নিতে বাধ্য হওয়ার যে যাতনা তারই বহিপ্রকাশ ‘আল্লাহর বিচারে’র আকাঙ্খা।

 

বৈধভাবে সহিংসতা ঘটানো এবং হত্যা করতে পারাটা সার্বভৌম ক্ষমতার সবচাইতে প্রধান ক্ষমতা ছিল হাজার বছর ধরেই। কিন্তু আধুনিক যুগে বায়োপলিটিক্সের আবির্ভাবের পর থেকে এই ক্ষমতার রূপ ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা নতুন রূপ ধারণ করেছে। মিশেল ফুকো আধুনিক রাষ্ট্রের বায়োপাওয়ার নিয়ে লিখেছেন তার ‘হিস্টোরি অফ সেক্সুয়ালিটি (প্রথম খন্ড)’, ‘সোসাইটি মাস্ট বি ডিফেন্ডেট’ ইত্যাদি গ্রন্থে। ফুকোর দাবি ছিল যে আধুনিক রাষ্ট্রে জীবের জীবন, যেমন মানুষের জীবন সরাসরি রাজনীতির ভিত্তি ও হিসাবের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফুকোর ভাষায় – হাজার বছর যাবৎ, মানুষ ছিল তাই যেমনটা এরিস্টোটল বলেছেনঃ এমন এক জীব যার রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্ববান হওয়ার সামর্থ আছে; কিন্তু আধুনিক মানুষ এমন এক প্রাণী যার রাজনীতি জীবসত্তা হিসাবে তার অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।[7] তবে ফুকো বায়োপাওয়ারের যেই দিকগুলোতে বেশি জোর দিয়েছেন তাহলো আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রনমূলক ক্ষমতা (regulatory power) এবং শৃঙ্খলার কলাকৌশল(deciplinary mechanism)। ফুকো মনে করতেন যে আগের কালের রাজ্য বা সাম্রাজ্যের সাথে আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার পার্থক্য আছে। আগের কালের সার্বভৌম রাজা বা সম্রাটরা নির্ভর করতেন প্রকাশ্যে সহিংস শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রদর্শনের উপর। জনসাধারণের সামনে গিলোটিনে হত্যাকান্ড অথবা অপরাধীদের লাশ বা কাটা মুন্ডু প্রদর্শন করাটা এই ধরণের প্রদর্শনীমূলক সার্বভৌম ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য ছিল। আধুনিক যুগে বিষয়টা ভিন্ন। ফুকোর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র অপরাধীতো বটেই, সকল নাগরিককেই নানানরকম প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখে। অপরাধীদের জন্যে জেল আছে। আবার জেলখানার বাইরেও নানাধরণের প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে কাজে লাগে। ফুকোর মতে স্কুল, মাদ্রাসা, চার্চ, মসজিদ, হাসপাতাল, পাগলাগারদ ইত্যাদিও জনগণকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে কাজে লাগে। এসব প্রতিষ্ঠানে সবচাইতে বেশি শেখানো হয় শৃঙ্খলা, যেহেতু পুঁজিবাদী উৎপাদনযন্ত্রের জন্যে প্রয়োজন সুশৃঙ্খল তথা শৃঙ্খলাবদ্ধ নাগরিক। এই ধরণের নিয়ন্ত্রনমূলক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজকে ফুকো নাম দিয়েছেন – পেনোপটপিক সমাজ। অর্থাৎ তিনি এই ধরণের সমাজকে তুলনা করেছেন ‘পেনোপটিক (panoptopic) জেলখানা’র সাথে। পেনোপটপিক জেলখানা ছিল একধরণের পরীক্ষামূলক জেলখানা যেখানে একজন মাত্র জেলার প্রত্যেক আসামীর উপর এক জায়গায় বসেই নজর রাখতে পারে, যাতে তাদেরকে সুশৃঙ্খল রাখাটা সহজ হয়। উপযোগবাদী ইংরেজ দার্শনিক জেরামি ব্যান্থাম এই মডেলের জেলখানার প্রস্তাব করেছিলেন। যদিও এই ধরণের জেলখানা খুব বেশি নির্মিত হয় নাই, কিন্তু ফুকো পেনোপটিক জেলখানার উদাহরণকে ব্যবহার করেছেন আধুনিক রাষ্ট্রের ডিসিপ্লিনারি এবং সার্ভেইলেন্স নির্ভর ক্ষমতার একটা প্যারাডাইম হিসাবে, আর এই ধরণের ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতির নাম দিয়েছিলেন – পেনপটিসিজম।[8] ফুকো এই প্যারাডাইম হাজির করেছিলেন ইন্টারনেট সার্ভেইলেন্স যুগ শুরু হওয়ার অনেক আগে। বর্তমানে ইন্টারনেট সার্ভেইলেন্সের যুগে এখন এই পেনোপটপিক সমাজের ধারণা বুঝাটা আরো সহজ হয়েছে।

 

অবশ্য আগামবেন মনে করেন যে, শুধু আধুনিক যুগেই নয়, বরং জীবের জীবনকে (zoe) রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসাটা সার্বভৌম ক্ষমতার অতি পুরাতন, হাজার বছরের, বলা যায় ‘আদিমতম বৈশিষ্ট্য’। আর ফুকো যেখানে আধুনিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনমূলক ক্ষমতার দিকে বেশি মনযোগ দিয়েছেন সেখানে আগামবেন আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন সার্বভৌমের সেই আদিম ও সবচাইতে ভয়াবহ ক্ষমতার দিকে – খুন করার ক্ষমতা। তবে আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের খুন করার উপযুক্ত জীবনের ক্যাটাগোরি তৈরি করা, তাদেরকে নজরাদারির মধ্যে রাখা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা, খুন করার আগে পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করার যে ক্ষমতা বা ‘বায়োপাওয়ার’ তা সার্বভৌম ক্ষমতাকে এমন এক স্তরে নিয়ে গেছে যা অতীতে আর কোন যুগে সম্ভব ছিল না। ফুকো যেখানে আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা বোঝানোর জন্যে পেনপটিক জেলখানার উদাহরণ টেনেছেন, আগামবেন সেখানে হাজির করেছেন ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে’র উদাহরণ। আগামবেনের মতে, উনবিংশ শতকের শেষদিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কালে ইউরোপিয় সার্বভৌম শক্তিগুলো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নামে যা আবিস্কার করেছিল তারমধ্যেই আধুনিক যুগের নামুস (nomos) সবচাইতে প্রকটরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারমতে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পই হলো আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত রূপ। যদিও এই প্রকট রূপ নিয়ে তা সবসময় আত্মপ্রকাশ করে না, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র সবসময়ই একটি সম্ভাব্য কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর যদিও ইউরোপে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বিলুপ্তি ঘটেছে এবং জনগণকে খুন করার সার্বভৌম ক্ষমতা ইউরোপিয় রাষ্ট্রগুলোতে আর আগের মতো প্রকাশ্য নয়, কিন্তু উন্নত দুনিয়ার বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নামুস এর সবচাইতে প্রকটরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ তার উল্লেখযোগ্য একটি উদাহরণ। অন্তত দশ লক্ষ নাগরিক আছে এমন ভুখন্ডের মধ্যে জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান পাঁচ নম্বরে। তবে এই পাঁচ দেশের মধ্যে বর্তমান দুনিয়ায় চলাচলের স্বাধীনতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দুই নম্বরে। এক নম্বরে আছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নামুস যেখানে সবচাইতে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রকটরূপে প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে অন্ততপক্ষে কোটিখানেক জনসংখ্যা আছে এমন দেশের মধ্যে বাংলাদেশেই মানুষের ঘনত্ব সবচাইতে বেশি, আবার আমাদের দেশের মানুষের চলাচলের স্বাধীনতাও দুনিয়ায় সবচাইতে কম স্বাধীনতা সম্পন্ন মানুষের কাতারে পড়বে। মিয়ানমার ও ভারত থেকেও বাঙালি এবং মুসলমান ক্যাটাগোরিতে ফেলে বাংলাদেশে আরো মানুষ ঢোকানো হচ্ছে। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের তিনদিকে কাটাতারের বেড়া দিয়ে এবং সীমান্তে মানুষ খুন করে এদেশের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প রূপটা আরো ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

বর্তমান দুনিয়ায় উন্নতদেশগুলোর বায়োপাওয়ার বোঝাতে যেখানে পেনোপটিকনের উদাহরণ ভালো খাটে, অনুন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে খাটে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের উদাহরণ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশের পরিস্থিতি বোঝার জন্যে এই দুইরূপকেই বিবেচনা করার দরকার আছে। সেইসাথে ইন্টারনেটের এই যুগে রেগুলেটরি মেকানিজম আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নামুস টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যে সামাজিক সম্মতি উৎপাদন তথা হেজিমনির উপর কতোটা নির্ভরশীল তা বিবেচনায় না নিলে এই জটিল পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। বন্দুক যুদ্ধ ও ক্রসফায়ারের নামে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যতো খুন হয়েছে তেমন প্রতিটা খুনের ক্ষেত্রে সমাজের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন অংশের সম্মতি উৎপাদন করা গেছে। ইন্টারনেট প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন অংশ আপন উদ্যোগেই বিচারপতির ভূমিকায় হাজির হয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষে রায় দিয়েছে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বিভিন্ন সময়ে ক্রসফায়ারে মানুষ মারার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। কেউ চান মাদক ব্যাবসায়ীদের ক্রস ফায়ারে মারা হউক, কেউ চান জঙ্গীদের ক্রসফায়ারে মারা হউক, কেউ চান ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে মারা হউক, কেউ চান নাস্তিকদের মেরে ফেলা হউক। উল্লেখযোগ্য একটি উদাহরণ হতে পারে বাবুল আক্তারের স্ত্রীর হত্যাকান্ড। এই হত্যাকান্ডের সুরাহা এখনো হয় নাই বরং এর রহস্য আরো ঘণিভুত হয়েছে। অথচ যখন এই হত্যাকান্ড সংগঠিত হলো তখন পুলিশ, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এবং সোস্যাল মিডিয়া মিলে একরকম রায় দিয়ে দিলো যে জঙ্গীরাই এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। পুলিশ তখন রণহুঙ্কার দিতে লাগলো, আর প্রগতিশীল ফেসবুক প্রজন্ম আবির্ভুত হলো চিয়ার লিডারের ভুমিকায়। তাতে প্রায় বিনা প্রতিবাদে ও জনসমর্থন নিয়ে ব্যাপক হারে পুলিশি নির্যাতন, গ্রেফতার বানিজ্য ও বন্দুক যুদ্ধ সংগঠিত হয়ে গেলো তখন। অভিজিত থেকে শুরু করে জুলহাজ পর্যন্ত সকল হত্যাকান্ডের দায় নিয়ে একজনকে হত্যাও করা হলো। সাম্প্রতিক সময়ে মাদক বিরোধী অভিযানের নামে মানুষ হত্যাও ব্যাপক জনসমর্থন নিয়েই সংগঠিত হচ্ছিল। বছরের পর বছর ধরে মিডিয়ায় নানানরকম তালিকা প্রকাশ করে এবং সোস্যাল মিডিয়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের বিমানবিকিকরণের মাধ্যমে এই ধরণের হত্যাকান্ডের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। একরাম হত্যাকান্ডের অডিও প্রকাশ পাওয়ার পরেই এই ধরণের হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে মানুষ কয়েকদিনের জন্যে সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু তারপর আরো অনেকেই মাদক ব্যাবসায়ী হিসাবে নিহত হয়েছেন। শাহজাহান বাচ্চুর হত্যাকান্ডের পর জেএমবিকে দায়ি করে একজনকে জঙ্গী হিসাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই হত্যার পক্ষেও প্রগতিশীল বলে পরিচিতদের একাংশকে সমর্থন দিতে দেখা গেছে অথবা প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় নাই।

 

এইরকম সবসময়ই কোন না কোন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডকে বৈধতা দিতে সমাজের একাংশকে তৎপর দেখা যায়। কিন্তু সবাই আবার চান যে শুধুমাত্র কিছু মানুষকেই যাতে ক্রসফায়ারে মারা হয়, সবাইকে যাতে হরেদরে না মারা হয়। অর্থাৎ, তারা চান যে, ক্রসফায়ারে মানুষ মারাটা একটা ‘ব্যতিক্রম বা জরুরি অবস্থা’ হিসাবেই থাকুক, স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত না হউক। তারা চান যে আইন বা নিয়মের ব্যতিক্রম শুধু কিছু লোকের উপরেই প্রয়োগ হউক, যাদেরকে তারা বিপদজনক মনে করেন অথবা পরিচয় কিংবা সহানুভুতির অভাবে যাদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থন ও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নাই। কিন্তু যারা তাদের পরিচিত ও যাদের অকাল মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারে না, তারা চান তাদের ক্ষেত্রে আইন চলুক সঠিক নিয়মে, নিয়মের ব্যাতিক্রম না ঘটুক। এই সমাজ বিচার চায়, আবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চায় বিচারের ব্যাতিক্রম। এ এক আত্মঘাতি সামাজিক ‘এপোরিয়া’। এইভাবে বিভিন্ন পক্ষের মানুষ কোন না কোন ক্যাটাগোরির মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যাতিক্রম সমর্থন করার ফলে ‘ব্যতিক্রম অবস্থা’ই বাংলাদেশে বর্তমানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি বোঝার জন্যে আমরা ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের সেই বিখ্যাত উক্তির স্মরণ নিতে পারি। বেনিয়ামিন লিখেছিলেন সেই সময়ে যখন ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছিল, যখন ইহুদিদের দিয়ে শুরু করে একের পর এক বিভিন্ন ক্যাটাগোরির মানুষ তৈরি করা হচ্ছিল যাদের ক্ষেত্রে ‘নিয়মের ব্যতিক্রম’ করা যায়, যাদেরকে হত্যাযোগ্য পশুতে পরিণত করা যায়। বেনিয়ামিন লিখেছিলেন – যেই ‘ব্যতিক্রম অবস্থায়’ আমরা বসবাস করিতেছি তাহাই নিয়ম।[9] সুতরাং এই নিয়মের মধ্যে বাংলাদেশের সকল মানুষই, যারা কোন না কোনক্ষেত্রে বিচারকের ভূমিকায় হাজির হয়ে কারো না কারো বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড জায়েজ করেন, তারাও সবসময়ই বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যাযোগ্য জীবনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেই বসবাস করেন। এ এক জটিল পরিস্থিতি। রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনিতো বটেই, সমাজ নিজেই নানানরকম রেগুলেশনের পক্ষে প্রচার চালিয়ে একটা পেনোপটিক সমাজে পরিণত হয়েছে। এই সমাজের ব্যক্তিরা নিজেদের উপর সেলফ রেগুলেশন আরোপ করে ও অন্যদেরকে তা করতে উৎসাহিত করে, বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া নির্ভর একটিভিজমে অতি নির্ভরশীল হয়ে সদা সার্ভেইলেন্সে অন্তর্ভূক্ত জীবনে পরিণত হয়েছে। সেইসাথে সমাজের সবচাইতে নির্যাতিত মানুষদেরকেও দেখা যায় নাজিবাদী, ফ্যাসিবাদী, তাকফিরিদের মতো বিভিন্ন হত্যাযোগ্য ক্যাটাগোরির জীবন উৎপাদনে তৎপরতা চালাতে, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের পাহারাদারে পরিণত হতে। বাংলাদেশের সবাই এখন এক একজন সার্বভৌম, এবং এক একজন হোমো স্যাকের। যুগপগতভাবেই সবাই হাবিল, এবং কাবিলও বটে।

 

সাধু অগাস্টিন যে হাবিল এবং কাবিলকে হাজির করেছেন, তাদের মধ্যে একটা মিল আছে। এই মিল তাদের ‘ব্যান’ বা বহিস্কারে। একজন দুনিয়ার রাজ্য থেকে বহিস্কৃত, আরেকজন খোদার রাজ্য থেকে। দুইজন একসাথে আমাদের সামনে হাজির করে আগামবেনের বিবেচনায় হোমো স্যাকের ও সার্বভৌমের জীবন, যার সাথে দুনিয়াবি এবং খোদায়ি এই দুই আইনের সম্পর্কই বহিস্কার বা ব্যানের সম্পর্ক। আগামবেনের মতে হোমো স্যাকের এবং সার্বভৌম এই দুই জীবনের মধ্যে কাঠামোগত মিল আছে, আর এই মিল দুই জীবনেরই খোদায়ি এবং দুনিয়াবি আইন থেকে বহিস্কারের জীবন হিসাবে। আগামবেনের এই বক্তব্য সরলভাবে নেয়াটা সমস্যার, কারন এতে আল্লাহর আইনে সার্বভৌমের এবং সার্বভৌমের আইনে জনগনের জীবনের বহির্ভূত হিসাবে অন্তর্ভুক্তির জটিল সমিকরণ বাদ থেকে যায়। কিন্তু এইটুকু বলা যায় সহজেই যে, হোমো স্যাকের এবং সার্বভৌম, হাবিল ও কাবিল এই দুই ধরণের জীবনই বিরাজ করে সম্ভাব্য আইনের বাইরের জীবন হিসাবে, নিয়মের মধ্যে তারা অন্তর্ভূক্ত নিয়মের ব্যতিক্রম হিসাবে উন্মোচিত জীবন হিসাবে। আগামবেনের ভাষায়, সার্বভৌম হলো সে যার কাছে সকল মানুষই সম্ভাব্য হোমো স্যাকের, আর হোমো স্যাকের হলো সে যার কাছে সকল মানুষই সম্ভাব্য সার্বভৌম।[10] আগের কালে যেমন শুধুমাত্র একজন রাজা বা সম্রাটেরই একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সার্বভৌম হওয়ার অধিকার ও ক্ষমতা ছিল, এখন আর তেমনটা না। সার্বভৌমত্ব এখন একটা জাতীয় বা সামাজিক ব্যাপার, কবির ভাষায় – আমরা সবাই রাজা। উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে এই পরিস্থিতির সামাল দেয়া হয়েছে কাউকেই রাজার ক্ষমতা না দেয়ার চেষ্টার মাধ্যমে, অথবা কনস্টিটিউশনাল মনার্কির মাধ্যমে রাজা তথা সার্বভৌমকে একজন প্রতীকে পরিণত করার মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো কিছুটা সামন্ত, কিছুটা আধুনিক সমাজে এই পরিস্থিতি হাজির হয়েছে এর সবচাইতে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে। একদিকে যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা সার্বভৌম রাজাদের মতোই ক্ষমতা চর্চা করেন, তেমনি প্রায় প্রতিটা নাগরিকই নিজের সার্বভৌমত্বের সবচাইতে ভয়ঙ্কর ক্ষমতাটির চর্চা করতে উন্মুখ হয়ে থাকে – হত্যা করা বা হত্যার বৈধতা দেয়ার ক্ষমতা। থমাস হবসের পরিভাষা ব্যবহার করলে এই পরিস্থিতিকে আইনের শাসনের বদলে ‘স্টেট অফ নেচার’ বলা যেতে পারে, যেখানে সবাই সবার সাথে যুদ্ধে রত। তবে আগামবেন বলবেন যে আসলে তা নয়, বরং এই হলো সেই পরিস্থিতি যেখানে সবার জীবনই সবার কাছে উন্মুক্ত, বা হোমো স্যাকের।[11] এবং এই পরিস্থিতির সুবাদেই, এবং সবার সমর্থন নিয়েই পেনোপটিক জেলখানা ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প রূপী রাষ্ট্রযন্ত্র ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

 

আগামবেন ব্যান বা বহিস্কারের যে ধারণা হাজির করেন রাষ্ট্রের সাথে সার্বভৌম এবং নাগরিকের সম্পর্ক বুঝাতে তার জন্যে বাংলা ‘বন্ধ’ শব্দটি খুবি কার্যকর। ইংরেজিসহ বিভিন্ন জার্মানিক ভাষায় ‘ব্যান’ (ban) যে শব্দটা আছে, আর বাংলা ‘বন্ধ’, এই দুই শব্দের উৎস মনে হয় এক। বন্ধ শব্দটি যথেষ্ট বৈচিত্রময়, আবার এই বৈচিত্রের মধ্যেও শব্দটির একটা সাধারণ অর্থবোধক কাঠামো পাওয়া যাবে। প্রাশঙ্গিক উদাহরণ হিসাবে ‘দরজা বন্ধ’ নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। আপনি বন্ধ করলেন দরজা, কিন্তু কারো জন্যেতো তা বন্ধ হলো। মানে যে আছে দরজার বাইরে তার মুখের উপরেই তো বন্ধ করলেন দরজাটা। এটা ঘরের দরজা হতে পারে অথবা হৃদয়ের দরজা। আবার আইনের দরজাও হতে পারে। এর সাথে দরজার বাইরে যে আছে তার সম্পর্ক ‘বহিস্কারে’র সম্পর্ক। অর্থাৎ বন্ধ শব্দটি এখানে বহিস্কারের প্রতিনিধিত্ব করে। দরজা বন্ধ করে কাউকে ঘর (অথবা হৃদয় অথবা আইন)থেকে বহিস্কার করার পাশাপাশি কিন্তু আবার আপনি নিজেকেও নিজে একটা জায়গার মধ্যে আবদ্ধ করলেন। অথবা ঘরটা কিন্তু হতে পারে একটা জেলখানা, কিংবা একটা কনসেন্ট্রেসশন ক্যাম্প। ‘দরজা বন্ধ’ করা তখন আবদ্ধ করার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা। বন্ধ করা তাই বহিস্কার বা বহির্ভূত করা এবং আবদ্ধ ও অন্তর্ভুক্ত করা – এই দুই ঘটনাই হতে পারে। একিসাথে। বন্ধ শব্দের অর্থ যুক্ত করাও বটে, বন্ধন ক্রিয়া পদ দিয়ে যা বুঝানো হয়। অর্থাৎ এই শব্দ দিয়ে একিসাথে বহির্ভূত ও অন্তর্ভূক্ত করা, এই দুই ধরণের ঘটনাই বুঝানো যায়। ‘বন্ধন’ ও ‘আবদ্ধ’ এই দুইটা শব্দের সাথেই ইংরেজি এবান্ডন (abandon) শব্দটির মিল পাওয়া যায়। বন্ধ শব্দের মধ্যে তাই একিসাথে ‘বহির্ভূত করা’ ও ‘অন্তর্ভূক্ত করা’ এই দুই অর্থ একসাথে সামিল আছে। বন্ধ শব্দটির আরেক অর্থ – অবিচ্ছেদ। বন্ধ শব্দটি তাই অবিচ্ছেদের এলাকা (zone of indistinction) নির্দেশ করে। ‘দরজা বন্ধ’ করার ঘটনায় বন্ধ শব্দটি তাই বহির্ভূত ও অন্তর্ভুক্তের অবিচ্ছেদের এলাকা নির্দেশ করে। আপনি যখন দরজা বন্ধ করবেন তখন আপনার দাঁড়াতে হবে এই অবিচ্ছেদের এলাকাতেই, বাংলা ভাষায় যাকে বলে – দোরগোড়া। ইংরেজিতে – Threshold। আগামবেনের মতে সার্বভৌম ক্ষমতা বিরাজ করে দোরগোড়াতে, অবিচ্ছেদের এলাকায়। সেই অবিচ্ছেদের এলাকায় যেইখানে আইনি ও বেআইনি, অন্তর্ভুক্ত ও বহির্ভুত একসাথে বিরাজ করে। ফলে আপনি যখন সার্বভৌমের মতো আচরণ করবেন, যখন আপনি কারো (মাদক ব্যবসায়ী, জঙ্গী ইত্যাদি) মুখের উপর আইনের দরজাটা বন্ধ করে দিতে যাবেন, তখন এই দোরগোড়াতেই আপনার গিয়ে দাঁড়াতে হবে। আর দোরগোড়া থেকে দরজার বাইরের এলাকাটা খুব দূরের নয়, এবং যেকোন সময় আমাদের সমাজে নিজেকে সার্বভৌম মনে করা যে কেউ আপনাকে অন্যকোন ক্যাটাগোরিতে ফেলে দোরগোড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে আইনের দরজার বাইরে ফেলে দিতে পারে। দরজাটা আপনার মুখের উপর বন্ধ করে দিতে পারে। দোরগোড়া থেকে ঘর ও বাহির কোনটাই দূরের নয়, বরং দোরগোড়াতেই এই দুইয়ের শুরু। আমাদের ঘরের জন্যে, মানে বাংলাদেশের জন্যে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের রূপকটাই সবচাইতে ভাল খাটে। মজার ব্যাপার, অথবা ট্রাজেডিও বলা যেতে পারে, যেহেতু এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কিছু কিছু মানুষ নিজেদেরকে সর্বদা আবিস্কার করে সেই দোরগোড়ায় যেখানে দাঁড়িয়ে এরা কিছু মানুষকে বহিস্কারের মাধ্যমেই নিজেকে এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় যেখানে তার জীবন সর্বদাই অন্তর্ভুক্ত থাকে ‘আবদ্ধ’ হিসাবে, যা বহিস্কারের মাধ্যমে বহির্ভূত হওয়ার চাইতে আলাদা কিছু নয়। শেখ হাসিনা, যার মধ্যে বাংলাদেশের সার্বভৌম ক্ষমতা বর্তমানে সবচাইতে প্রকট রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে তিনি কোনদিন তার অবস্থানটা (দোরগোড়ায়) বুঝতে পারবেন কি না তা জানি না। কিন্তু তার চাইতে জরুরি চিন্তা, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যারা শেখ হাসিনার মতোই আচরণ করে তারা নিজেদের অবস্থানটা বুঝতে পারবেন কি না।

 

মিদ্রাস, মিশনা কিংবা সাধু অগাস্টিনের সাথে কোরানে কাবিলের হাতে হাবিলের হত্যাকান্ড বিবেচনার কিছু পার্থক্য আছে। যদিও কোরানেও কাবিলকে চিত্রায়িত করা হয়েছে অনুশোচনাকারীদের (নাদিমিন) অন্তর্ভুক্ত হিসাবে এবং আল্লাহ তাকে অন্তত নিজ ভাইকে কবর দেয়ার জন্যে সহনুভুতিশীল হয়ে দিক নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। কিন্তু কোরানে খুব পরিস্কার ভাষায়ই বলা হয়েছে যে হাবিলকে হত্যা করার মাধ্যমে কাবিল ‘ক্ষতিগ্রস্ত’দের (খাসিরিন) অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছেন। সেই সাথে কোরানের কাহিনিটি শেষ হয়েছে সেই বিখ্যাত লাইন দিয়ে – যে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করলো, সে যেনো সব মানুষকেই হত্যা করলো, এবং যে কারো জীবন রক্ষা করলো সে যেনো সব মানুষের জীবনই রক্ষা করলো। অর্থাৎ, একজন মানুষেরও বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করার জন্যে যে সার্বভৌম হিসাবে হাজির হয়, সে আসলে গোটা মানব জাতিকেই উন্মোচিত করে মৃত্যুর সামনে, তার নিজের জীবনও যার অন্তর্ভূক্ত। অন্যদিকে একজন নিরপরাধের জীবন রক্ষাও আমাদের গোটা মানব জাতির নাজাতের রাস্তাটি প্রশস্ত করে। এই শিক্ষাটি মাথায় রাখলে হয়তো আমরা সার্বভৌমত্বের কদর্য রূপ অতিক্রম করে নতুন রাজনীতির ভিত্তি স্থাপন করতে পারবো।

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] Robert C. Gregg. Shared Stories, Rival Tellings; Early Encounters of Jews, Christians, and Muslims. Oxford Univeristy Press,2015,pp.93,94

[2] Ibid.p.95

[3] Giorgio Agamben. HOMO SACER; Sovereign Power and Bare Life. Originally published as Homo sacer. Il potere sovrano e la nuda vita, Giulio Einaudi editor s.p.a, 1995. P.19.

[4] Ibid, p.12.

[5] Julian Andres and Gonzalez Holguin. Cain, Abel, and the Politics of God: An Agambenian Reading of Genesis 4:1-16, Routledge, 2018, p.53.

[6] Giorgio Agamben. Pilate and Jesus. Translated by Adam Kotsko. Stanford university press, 2015.

[7] Michel Foucault, The History of Sexuality: Volume One, Vintage Books, 1990, p.143.

[8] Michel Foucault. Discipline and Punishment. Vintage Books, 1995.

[9] Giorgio Agamben. The Messiah and the Sovereign: The problem of Law in Walter Benjamin. Potentialities; Collected Essays in Philosophy, Ed and Trans, Daniel Heller – Roazen. Stanford University Press, 1999,p.162.

[10] Giorgio Agamben. HOMO SACER; Sovereign Power and Bare Life. Originally published as Homo sacer. Il potere sovrano e la nuda vita, Giulio Einaudi editor s.p.a, 1995. P.56.

[11] Ibid. p.70.

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *