গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক– ন্যায়বিচারকে ঘরে নিয়ে আসুন, শহীদুল আলমকে মুক্ত করুন

শহীদুল আলমের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে তা লজ্জাজনক। আমরা ওঁর মুক্তি দাবি করছি। সেই সঙ্গে যে কথাটার উপর আমি জোর দিতে চাইতা হল, ওঁর মত একজন মানুষের কণ্ঠ রোধ করলে রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করা হয়। শহীদুল আলমের মত শিল্পী বা বুদ্ধিজীবীর বাক-স্বাধীনতা হরণ করলে রাষ্ট্রীয় বিবেকের মৃত্যু ঘটে। সৃজনশীল শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব গঠনমূলক সমালোচনা করা যাতে রাষ্ট্র খাঁটি গণতন্ত্র হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্র যখন এমন আইন বানায় যে নিজের দায়িত্ব পালন করলেশাস্তি পেতে হয়, তখন সেই কাজটা করা অসম্ভব হয়ে যায়।

অতএব এই মুহূর্তে, যখন নিদারুণ অপমানের মুহূর্তে রাষ্ট্রপুঞ্জের দরবারে গভীর ক্ষোভ জানাবার জন্যে আমরা প্রস্তুত, তখন আমরা শুধু বাক-স্বাধীনতার বিমূর্ত অধিকারের সমর্থনে কথা বলছিনা। আমরা একজন বিশেষ মানুষের, একজন বিশ্বজনীন মানুষের, বাক-স্বাধীনতার দাবিতে কথা বলছি। একটি দেশের নিজস্ব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আমি অবশ্যই বিরোধী; কিন্তু আমি শিল্পী বুদ্ধিজীবী সমাজের সদস্য হিসেবে কথা বলছি। আমাদের বিশ্বাস, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আমাদের এই কথা জানানো উচিত।

রাষ্ট্র কণ্ঠরোধ করার পরিচিত পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। প্রথমে বলেছে, শহীদুল মিথ্যে বলছেন। কিন্তু তা সত্যি নয়। আমি ভিডিয়ো-তে দেখেছি, পুলিশ টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় উনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করছেন, উকিলের সাহায্য চাইছেন। এছাড়াও আরো বহু প্রমাণ ছড়িয়ে আছে প্রকাশিত ছবিতে, সংবাদে।

এবং নৈতিক সমালোচনাকে দলীয় রাজনীতি বলা, ওঁকে বিরোধী শিবিরের দালাল বলা খুবই আপত্তিকর।

আমরা শহীদুল আলমকে ভালোভাবে চিনি। উনি নৈতিক দায় থেকে কথা বলেছেন। বস্তুত, উনি রাষ্ট্রের স্বার্থেই কথা বলছেন যাতে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। এইরকম কণ্ঠ ও দৃষ্টিকে স্তব্ধ করে দিলে ত্রাসের সংস্কৃতি সৃষ্টি করা হয়; ন্যায়বিচার যেখানে পরিণত হবে প্রতিহিংসায়, ক্ষমতা ছাড়া যেখানে আর কোনো কিছু হৃদয়ঙ্গম হয় না।

এই কারণেই আমরা প্রতিবাদ করছি, শুধুমাত্র ওঁর আধিকার হরণ করা হয়েছে বলে নয়। আমরা ওঁকে চিনি, আমরা ওঁর এই অন্যায় বলিদান মেনে নিতে পারছি না। আমরা ওঁর মুক্তি চাই, কারণ যেসব আইন উনি ভেঙেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে সেগুলো আইন নয়। সেই সব আইন তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের বিবেককে স্তব্ধ করে রাখার জন্য। অতএব আমাদের দাবিঃ মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, নিরাপত্তার অধিকার। আমরা নির্যাতনের নিন্দা করছি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা-দের সাহায্য করার জন্যে দুটি পুরষ্কার পেয়েছেন। আমি নিজেও রোহিঙ্গা আন্দোলনে সক্রিয়। সেই সুত্রে আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলবঃ আন্তর্জাতিক শরণার্থী বিষয়ক ভৌগলিক রাজনীতির সীমানায় আটকে থাকবেন না। ন্যায়বিচারকে নিজের ঘরে নিয়ে আসুন। শহীদুল আলমকে মুক্ত করুন, অবিলম্বে।

লিখেছেনঃ গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *