স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু ও ‘অনিচ্ছুক’ জাতিতত্ত্ব

“বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন…”

অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং পূর্ব বাংলার জনগোষ্ঠীর নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও লড়াই-সংগ্রামের প্রতি চরম অবমাননাকর এই উক্তিটির জনক সম্ভবত মুনতাসীর মামুন । সন্দেহ নাই খুবই পপুলিস্ট একটা উক্তি এবং যেহেতু বঙ্গবন্ধুর নাম এই উক্তির সাথে জড়িত তাই এটাকে কাউন্টার করারও অনেক বিপদ আছে । ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ আছে । কিন্তু তারপরেও এই ক্ষতিকর উক্তির বিরোধীতা করতেই হবে । কারণ মুনতাসীর মামুনের ইতিহাসবোধই যে চূড়ান্ত নয়, সেই আলাপ-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার দরকার আছে ।

এই ধরনের কথাবার্তাই বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে “মূলধারার” বোঝাপড়া, এবং অনেকেই ভাবেন এই রকম কথা বলে এই জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ দুই যুগের সংগ্রামকে উনারা সঠিক মূল্যায়ন করছেন । যারা ‘৫২র ভাষা আন্দোলনের স্রষ্টা, যারা ষাটের দশকের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়াই সংগ্রাম করেছে, রক্ত দিয়েছে ; যারা শেখ মুজিবকে এই জনগোষ্ঠীর অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছে, তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” বানিয়েছে, সামরিক শাসকের মিথ্যা মামলায় জেলে বন্দি বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করেছে, যারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক আক্ষরিক অর্থেই ‘যার যা কিছু আছে’ তাই নিয়ে একটা দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছে খোদ তাদের নেতা গ্রেফতার হওয়ার পরেও, যারা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একমাত্র জাতি হিশেবে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে ; সেই জনগোষ্ঠী কিনা “অনিচ্ছুক” !

বঙ্গবন্ধুর প্রতি ফাঁপা অতি আবেগ দেখাতে গিয়ে অনেকেই ভুলে যায় যে এই জনগোষ্ঠীর ত্যাগ-সংগ্রামকে অস্বীকার/ খাটো করে দেখার মানে খোদ বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ-সংগ্রামকেই অস্বীকার/খাটো করে দেখা । কারণ এই জনগোষ্ঠী ছাড়া বঙ্গবন্ধুর কোন অস্তিত্ব নাই । এই জনগোষ্ঠীর একটা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিশেবে উত্থান আর শেখ মুজিবের “বঙ্গবন্ধু” হয়ে ওঠার ইতিহাস সমান্তরাল । শেখ মুজিবের “বঙ্গবন্ধু” হয়ে ওঠার ইতিহাস তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাস কেবলমাত্র নয়, এটা বাংলাদেশের ইতিহাস, এই জনগোষ্ঠীর সমস্ত মানুষের ইতিহাস । আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিশেবে আত্মপ্রকাশের তীব্র আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর অংশ হয়ে গেছে । বঙ্গবন্ধু ও পূর্ব বাংলার জনপদের অন্তত দুই যুগের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য ।

সুতরাং এই জনগোষ্ঠীর লড়াই-সংগ্রাম-আত্মত্যাগের প্রতি অসম্মানসূচক মন্তব্য করে কেউ যদি ভাবে বেশ বড়সড় ‘ইতিহাসবিদ’ তকমা অর্জন করা গেল, তাহলে তাঁর ইতিহাসবোধ নিয়েই প্রশ্ন উঠবে । ‘ইতিহাসবোধ’ নিছক দিন-তারিখ-ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মায়াকান্নার আসর জুড়ে বসা নয়, ইতিহাসবোধ এর চেয়ে বেশি কিছু । বঙ্গবন্ধুকে ‘বড়’ করে দেখাতে গিয়ে তাঁর সংগ্রামের উদ্দেশ্যকেই খাটো করা হচ্ছে কিনা ভেবে দেখা দরকার । উটকো মন্তব্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে ‘বড়’ করে দেখানোর কোন দরকার আছে বলে মনে করিনা, বঙ্গবন্ধু এমনিতেই মহাকায়, মহিরুহ । সম্ভব হলে আগে তাঁর সংগ্রামের তাৎপর্য বুঝতে চেষ্টা করুন….

 

লেখক : সারোয়ার তুষার

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *