আয়েশাঃ ‘বর্তমান-সময়ের’ বারুদ ঠাসা অতীত

সদ্য বিবাহিত আয়েশা ও জয়নালের নির্বিবাদ সংসারী জীবনের ছেদ কেটে তাতে রাজনৈতিক দুনিয়ার প্রবেশ ঘটার প্রথম আলামত জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের উল্লেখ। এই উল্লেখের মাধ্যমেই আমরা প্রথম ‘আয়েশা’ নামক টেলিফিল্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্বন্ধে ধারণা পাই। ১৯৭৭ সালের ১ অক্টোবর ‘জাপানিজ রেড আর্মি’ নামক সশস্ত্র বামপন্থী সংগঠন ফ্রান্স থেকে জাপানগামী একটি বিমান ছিনতাই করে নিয়ে আসে ঢাকায়। জাপানি রেড আর্মি ছিল সেইসময় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন পিএলওর বামপন্থী অংশের বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সংগঠন। একি দিনে ঢাকায় সংগঠিত হয় বিমান বাহিনীর সৈনিকদের একটি বিদ্রোহ। এই সমস্ত সাল তারিখের উল্লেখ নাই আয়েশা সিনেমায়। বিমান বাহিনীর একজন কর্পোরাল জয়নাল। তার ভাষ্যমতে সে বিদ্রোহীদের হাত থেকে ‘চিফ’কে বাঁচিয়েছে। রাতের খাবার খেতে খেতে সামরিক বাহিনীতে জাসদের তৎপরতা, চিফের জীবন বাঁচানো ইত্যাদি নিয়ে জয়নালের বর্ণনা আর তার নিরাপত্তা নিয়ে স্ত্রী আয়েশার উদ্বেগ প্রকাশের মধ্য দিয়েই আবহমান বাঙলার সংসার ধরণের একটা কিছুর মধ্যে প্রবেশ ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সময়। কেউ চাইলে বলতে পারেন যে, আয়েশা সিনেমার মূল কাহিনির শুরু এইখানেই। অথবা সেই রাতের আধারেই কর্তৃপক্ষের ডাক পেয়ে সকালে ফিরে আসার কথা দিয়ে হাসিমুখে জয়নালের যে বিদায়, সেখান থেকেও শুরু ধরা যায়।

কিন্তু জয়নাল আর ফেরে না, অপ্রত্যাশিতভাবে বিদ্রোহের দায়ে আটক হয়ে পড়ে। তার আসল অপরাধ বা তার মাত্রা সম্বন্ধে কিছুই জানানো হয় না তার স্ত্রী আয়েশাকে, এবং সিনেমার দর্শকদের। জয়নাল, আয়েশা আর দর্শকদের এই অভিজ্ঞতাকে ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘দা ট্রায়ালে’র নায়ক ‘জোসেফ কে’-এর অভিজ্ঞতার সাথে তুলনা করা যায়; যে একদিন হঠাৎ করেই গ্রেফতার হয়, কিন্তু কী তার অপরাধ তা জানা যায় না। ‘আয়েশা’র কাহিনি ও চিত্রায়ন ঠিক ‘কাফকায়েস্ক’ বলতে যা বোঝায় ঠিক তা না। কাফকার গল্প-উপন্যাসে যেমন পাওয়া যায় তেমন অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক কোন কাল্পনিক দুনিয়া এই সিনেমায় তৈরি করা হয় নাই, বরং যে দুনিয়ার হাজির করা হয়েছে তা ১৯৭৭-এ বাংলাদেশের মানুষের কাছে যেমন বাস্তব ছিল, এখনো তেমনি বাস্তব আছে। জয়নালের হঠাৎ আটক হওয়া, তার উপর দৈহিক নির্যাতন, আয়েশার উদ্বেগ, আইন (সামরিক) ও আমলাতান্ত্রিক প্রাশাসনিকতার সামনে তার অসহায়ত্ব, বিভিন্ন সময়ে ছোট বড় অপেক্ষা মিলিয়ে প্রায় অনন্ত অপেক্ষার অনুভুতি, শাসনতন্ত্রের কাছে কাকুতি মিনতি ইত্যাদিতো কেবলি অতীত কোন ইতিহাসের বিষয় না; আমাদের বর্তমানের জীবনের বিষয়ও। সাম্প্রতিক ‘কিশোর বিদ্রোহ’ নামক বিপ্লবের পর তুলে নিয়ে যাওয়া ও অতঃপর আটক হওয়া ছাত্র, গৃহবধু, শিল্পীদের জন্যেতো পুরো জাতিই এইরকম উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করেছে। গভির রাতে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে যে শহিদুল আলমকে, তার জন্যেতো এখনো তার পরিবার, ছাত্র-ছাত্রী এবং দেশের বহু মানুষ অপেক্ষা করে আছে। গুম ও ক্রসফায়ারের এই বাংলাদেশে আমাদের সবার জীবনই একরকম ‘মার্শাল-ল’-এর অধীন, এবং কাকুতি মিনতি করে কাউকে গুম হয়ে যাওয়া, ক্রস ফায়ার কিংবা টর্চারের হাত থেকে বাঁচাতে পারলেও আমরা সরকারকে ধন্যবাদ দেই। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের নাগরিক অধিকার এবং বর্তমান দুনিয়ার মানবাধিকারের দিক থেকে বিবেচনা করলে এই পরিস্থিতি কাফকার গল্প-উপন্যাসের দুনিয়ার চাইতে কম অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক মনে হয় না। আয়েশার কাহিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের বাংলাদেশীদের ‘বাস্তবতা’ই এতোটা কাফকায়েস্ক যে, কাফকায়েস্ক রূপক বা প্রতীক নির্ভর কল্পনার প্রয়োজন হয় না তা তুলে ধরতে। শুধু বাস্তবতাটা তুলে ধরলেই চলে।

তারপরও আয়েশা নামক এই টেলিফিল্মে কিছু কাফকায়েস্ক প্রতীকের হাজিরা আছে। এরমধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য প্রতীক হলো সামরিক বাহিনীর সেই দফতরের সদর দরোজা যেখানে জয়নালকে আটকে রাখা হয়েছে। আয়েশা তার স্বামীর দেখা পেতে চায়, তার মুক্তির ফরিয়াদ জানানোর জন্যে ‘স্যারে’র সাথে দেখা করতে চায়। কিন্তু তার সামনে বাধা হিসাবে হাজির এই প্রকান্ড লোহার গেট। আর সেই গেটের পেছনকার দারোয়ান। কাফকার ‘দা ট্রায়ালে’ উল্লেখ করা এক কিচ্ছার নায়ক গ্রামের এক লোক। সে আইনের দরোজা দিয়ে প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু আইনের দরোজার সামনে দাঁড়ানো আছে এক দারোয়ান। দরোজাটা খোলা আছে। কিন্তু গ্রামের লোকটি প্রবেশ করতে পারে না। দারোয়ান তাকে অপেক্ষা করতে বলে। এই অপেক্ষার পালা আর শেষ হয় না, গ্রামের লোকটি সেখানে বসে অপেক্ষা করতে করতেই মৃত্যুবরণ করে।[1] এই কিচ্ছাটির নাম ‘আইনের সামনে’ (before the law)। আয়েশার দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে দরোজার সামনে নয়, পেছনে। দরোজাটাও খোলা নাই। গেটের মধ্যে চারকোনা একটা জানালার মতো অংশ খুলে দারোয়ান আয়েশার সাথে কথা বলে। অপেক্ষা করতে বলে। এই চারকোনা জানালা দিয়ে দরোজার পেছনকার খুব সামান্য অংশই দেখতে পারে আয়েশা। জানালার আকাবাকা গ্রিল পেছনকার দৃশ্যপটকে আরো দুর্বোদ্ধ করে তোলে। সেখানে দারোয়ানের আরো পেছনে চোখে সানগ্লাস ও হাতে ওয়ারলেসওয়ালা ভয়ালদর্শন একজনকে পায়চারি করতে দেখা যায়, যাকে দেখলেই গোয়েন্দা পুলিশের কথা মাথায় চলে আসে। দালান আর দেয়ালের মাঝের লম্বা একটা করিডোর চলে গেছে অনেক দূর, তার শেষে আছে আরেকটা লোহার গেট, বন্ধ। আমাদের বাস্তব দুনিয়া আর কাফকায়েস্ক দৃশ্যপট এইখানে একাকার হয়ে গেছে। এই গেটের সামনে আয়েশার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আইনের দরোজার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতার মতোই। এই দরোজাটা এমন কী খোলাও নাই। ছোট্ট একটা জানালা দিয়ে আমরা আইনের যতোটুকু দেখা পাই তা যথেষ্ট দুর্বোদ্ধ, ভয়াল ও রহস্যময়।

কাফকার গ্রামের লোকটির জন্যে দরোজাটি অবশ্য খোলা ছিল। কিন্তু দারোয়ান তাকে অপেক্ষা করতে বলে। গ্রামের লোকটি সাহস করে উকি দেয় দরোজার ওপাশে। দারোয়ান তাকে সাবধান করে দেয়। বলে যে তুমি চাইলে আমাকে অমান্য করতে পারো, কিন্তু “প্রতিটা কক্ষের সামনেই দাঁড়ানো আছে একজন করে দারোয়ান, একজন আরেকজনের চাইতে বেশি ক্ষমতাবান। তৃতীয় জনের চেহারা দেখে সহ্য করার ক্ষমতা এমন কী আমারো নাই”। আয়েশা অবশ্য গ্রামের লোকটির মতো বসে থাকে না। সে প্রতি পদে বাধার সাথে সংগ্রাম করে সামনে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশী নারীদের প্রতীক, এবং এই নারী রূপকে বাংলাদেশের সংগ্রামী সাধারণ মানুষদেরও। কাকুতি মিনতি করে সে গেট খোলাতে পারে, ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। আয়েশার দ্বিতীয় দারোয়ান একজন ‘স্যার’। তিনি আয়েশার প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে তার নিজের ‘স্যারে’র কাছে নিয়ে যান। এই দ্বিতীয় স্যারকে একজন অফিসার বলে মনে হয়। তিনি ওপরতলার এক অফিস কক্ষে বসেন, সেখানে যেতে হলে একটা পেঁচানো সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। এই স্যার আয়েশার তৃতীয় দারোয়ান। আর এইখানেই আয়েশার যাত্রার সমাপ্তি। এই দারোয়ানের সাথে কোন কাকুতি মিনতি কাজ আসে না, আগের দুই দারোয়ানের সাথে যেমন হয়েছে তেমন কোন মানবিক যোগাযোগ সম্ভব হয় না; ‘তদন্ত চলছে’ বলে তিনি আয়েশাকে ফেরত পাঠিয়ে দেন। এই অফিসারের সাথে আয়েশার সাক্ষাৎ, আইনের পেছনকার প্রতাপশালী ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’র সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাক্ষাতের মতো। এই অমানবিক এবং অলঙ্ঘনীয় ক্ষমতার সাথে এদেশের সকল মানুষের, ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে থাকা নাগরিকদের বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎ ঘটে।

জর্জিও আগামবেনের মতে, কাফকা তার গল্প-উপন্যাসে কর্মকর্তা, আমলা ও বার্তাবাহকদেরকে মূলত ছদ্মবেশে থাকা ফেরেশতা হিসাবে হাজির করেছেন। তার মতে, ফেরেশতাবিদ্যা (angelology) হলো ‘দুনিয়াবি সরকারে’র সবচাইতে প্রাচীন ও বিস্তারিত আলেখ্য প্রতিচ্ছবি।[2] অর্থাৎ, ফেরেশতাদের হায়ারার্কিকাল বিভাজন; দারোয়ান থেকে শুরু করে বার্তাবাহক, কেরানি, অফিসার, জেনারেল, মন্ত্রী ইত্যাদি বিভন্ন স্তরের যে সুসংবদ্ধ বিন্যাস পাওয়া যায় ইব্রাহিমি ধর্মসমূহের ফেরেশতাবিদ্যায়, তা দুনিয়ার সরকারেরই প্রতিচ্ছবির মতো। ইসলামি ঐতিহ্যে, যেমন আল-গাজালির মতে মানুষের বসবাস ‘আলম আল শাহাদাহ’ এবং ‘আলম আল মালাকুত’ নামক দুই স্তরের দুনিয়ায়। আলম আল শাহাদাহ হলো দৃশ্যমান দুনিয়া। আর আলম আল মালাকুত হলো ফেরেশতাদের দুনিয়া, আক্কেল তথা বুদ্ধিবৃত্তি এবং ধারণার (idea) দুনিয়াও। ইসলামি ফেরেশতাবিদ্যার প্রভাব দেখা যায় ‘রেইনার মারিয়া রিলকে’র কবিতা এবং চিন্তায়ও। এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন – ফেরেশতা হলো সেই জীব, যার মধ্যে আমাদের প্রণিত সবকিছুর দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যে রূপান্তর সংগঠিত হয়েছে।[3] তবে ফেরেশতাদের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের হায়ারার্কি থাকলেও তাদের কর্মকাণ্ডকে মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একভাগে আছে বার্তাবাহক বা সাহায্যকারী হিসাবে তাদের ভূমিকা, আরেকভাগে আছে তাদের প্রাশাসনিক ও সরকারি কর্মকান্ড। আয়েশা সিনেমায় উপস্থিত দরোজার ওপাশের দাপ্তরিক চরিত্রগুলোও মোটা দাগে এই দুই বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির আছে।

হাদিসে আছে, বেহেশতের দারোয়ান ফেরেশতার নাম রেদোয়ান আর দোযখের দারোয়ান ফেরেশতার নাম মালিক। কিন্তু আয়েশা সিনেমার দারোয়ানের নাম জানা যায় না। দাপ্তরিক সকল চরিত্রের নাম, পদবি ইত্যাদি প্রাথমিকভাবে অজানা থাকে সবার কাছে। তাদের নেমট্যাগ দেখানো হয়, কিন্তু নাম পড়া যায় না। দুইজন চরিত্রকে প্রাথমিকভাবে শুধুই ‘স্যার’ হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ এই চরিত্রগুলোকে ঠিক মানুষ হিসাবে না, বরং প্রাশাসনিক কল কব্জা হিসাবে, বা ফেরেশতাদের মতোই সদা সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনরত অমানবিক সত্ত্বা হিসাবে দেখানো হয়েছে। গেটের দারোয়ান আয়েশার কাছে শুরুতে শুধুই একজন প্রাশাসনিক চরিত্র, কিন্তু আয়েশের কাকুতি মিনতিতে সে রূপান্তরিত হয় একজন বার্তাবাহকে। এই বার্তাবাহক রূপটি খুব ভালোভাবে প্রকাশ পায় যখন ভেতর থেকে শুনে আসা কথা রোবট অথবা তোথাপাখির মত সে আয়েশাকে শোনায়। কিন্তু আয়েশা সহজে দমার পাত্র না, সে অনুরোধ করা বজায়ে রাখে, বার্তাবাহককে পরিণত করে একজন সাহায্যকারীতে। অর্থাৎ প্রাশাসনিক ও সরকারি ফেরেশতার মধ্য থেকে তার বার্তাবাহক ও সাহায্যকারী বৈশিষ্ট্য বের করে আনে। কিন্তু সবচাইতে বড় রূপান্তর ঘটে নিচের তলার স্যারের। শুরুতে ‘স্যার’ পরিচয়ে হাজির হলেও নাছোড়বান্দা আয়েশার প্রভাবে সে ‘সালাম’ নামে এক দয়াবান পিতাসুলভ মানুষে রূপান্তরিত হয়। ইবনে মিসকাওয়া, ইবনে খালদুন প্রমুখ জীবের ক্রমবিকাশ ও স্তরের যে হায়ারার্কিকাল বর্ণনা হাজির করেছেন তাতে মানুষের অবস্থান বানরের উপরে কিন্তু ফেরেশতার নিচে।[4],[5] কিন্তু নবী, রাসুল, ওলি-আউলিয়ারাও ফেরেশতায় রূপান্তরিত হতে পারেন বা ফেরেশতা স্তরে পৌছতে পারেন, আবার মানুষের স্তরে ফেরত আসতে পারেন। আয়েশা সিনেমায় সালামের ক্ষেত্রে ঘটে ফেরেশতা থেকে মানুষে রূপান্তরের ঘটনা। স্যারের কাছে সে যায় একজন বার্তাবাহক হিসাবে আর আয়েশার কাছে ফেরত আসে মিথ্যা বলে সান্তনা দেয়া একজন মানুষ হিসাবে।

আয়েশা যার কোন রূপান্তর ঘটাতে ব্যর্থ হয় সে হচ্ছে উপরতলার ‘স্যার’। এই স্যার তার  প্রকৃত রূপে হাজিরে হয় যখন সালাম তার কাছে আয়েশার সন্তানসম্ভবা হওয়ার বার্তা নিয়ে আসে। দর্শক তার গমগম করা গলার আওয়াজ শুনতে পায়, কাফকার কিচ্ছার তৃতীয় দারোয়ানের মতোই বোধহয় তার প্রকৃত চেহারা সহ্য করার মতো নয়, তাই সরাসরি ক্যামেরায় দেখানো হয় না তাকে। দেখানো হয় আয়নায়, প্রতিবিম্ব হিসাবে। এই অবস্থাতেই সে বলে ওঠে – আইন কানুন বুঝেন না দেশের? আগেই পরিস্কার হয়েছে যে এই স্যার হলো ফেরেশতার সেই রূপ, যার মধ্যে বার্তাবাহক কিংবা সাহায্যকারী অবশিষ্ট নাই, যিনি উপস্থিত হৃদয়হীণ প্রাশাসনিক যন্ত্র হিসাবে। কিন্তু এই মুহুর্তে আমরা আরো জানতে পারি যে, এই ‘স্যার’ আসলে আইনের সেই আদি ও সার্বভৌম চরিত্রের রূপায়ন যা আয়েশা বা সালামের মতো মানুষেরা ‘বুঝে’ উঠতে পারে না। এই সেই সার্বভৌম ক্ষমতা, যা জরুরি অবস্থা ও মার্শাল-ল’এর মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে স্বরূপে, যে ক্ষমতা জয়নালকে পরিণত করে একজন ‘বেয়ার লাইফে’। সামারি জাজমেন্টে মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত হয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুবরণ করে জয়নাল। এই বিচার প্রক্রিয়া ও রায় ঘোষণা আমাদের দেখানো হয় না।  এমন কী জয়নালের পরিবারের কাছে যে চিঠি আসে তাতে শাস্তির কথা উল্লেখ থাকলেও রায়ের কথা লেখা থাকে না। রায় জানতে গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে থাকা আয়েশার আবারো যেতে হয় উপরতলার স্যারের কক্ষে, পেচানো সিড়ি বেয়ে। এই বিচার প্রক্রিয়া আইনের ভেতর ও বাইরের দোড়গোরার যে অস্পষ্ট এলাকায় সংগঠিত হয়েছে, রায়ের অনুপস্থিতি অথবা অস্পষ্টতার মাধ্যমেই তা প্রকাশ পেয়েছে। এই অস্পষ্ট এলাকার অবস্থান উপরতলায়, আর তাতে পৌছানোর পথ বা শরিয়ত সরল সোজা নয়, পেচানো।

আয়েশার সাথে ‘স্যারে’র শেষ সাক্ষাতে স্যার চরিত্রটিকে অস্বস্তিবোধ করতে দেখা যায়, মনে হয় যেনো সে অপরাধবোধে ভুগছে। তার নেমট্যাগের নাম পড়া যায়। চেহারায় সরাসরি ক্যামেরা ফেলা হয়। অর্থাৎ এই সময়ে সে মানুষ রূপে হাজির হয়। কিন্তু এই মানুষ রূপ শুধু তার বাইরের চেহারা। সে থেকে যায় মানুষের ছদ্মবেশে একজন প্রাশাসনিক যন্ত্র, অথবা ফেরেশতা। আয়েশার স্বামীর কবরের ঠিকানা দিতেও সে অপারগ। জীবিত স্বামীকে নিয়ে আয়েশা ফিরে যেতে চেয়েছিল গ্রামে। তার স্বামী আর বিমান বাহিনীর চাকরি করবে না, কৃষিকাজ করে খাবে, তাকে ছেড়ে দেয়া হোক – এই ছিল তার অনুরোধ। সত্তরের দশকের বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সময় ত্যাগ করে সে তার স্বামীকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছে আবহমান বাঙলার সময়হীন এক কৃষিজীবী সংসারে। কিন্তু জীবিত স্বামী দূর থাক, মৃত স্বামীর লাশটাও দাফন করার সুযোগ সে পায় না। কোথায় দাফন করা হয়েছে সেই তথ্যটুকুও তাকে দেয় না শাহজাহান নামধারী এই ‘স্যার’। আয়েশার হাহাকার; “আমরা কবরটা জিয়ারত করতে পারবো না?এইটা কোন বিচার স্যার”? আসলেইতো, কোন বিচার এই বিচার? সার্বভৌম ক্ষমতার বিচার শাস্তিপ্রাপ্ত মানুষ ও তার প্রিয়জনের কাছে অবিচার বা অজানা ধরণের বিচার মনে হতে পারে; যার কারনে হাজার বছর ধরে অবিচারের মুখোমুখি হওয়া অথবা সার্বভৌমের বিচারকে মেনে নিতে না পারা বা বাধ্য হয়ে মেনে নেয়া মানুষের কাছে ধর্মীয় নাজাতের বিশ্বাস গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। দুনিয়ায় মুক্তির দেখা না পেলেও তারা মৃত মানুষের আত্মার মুক্তি কামনা করতে পারে। শেষ বিচারে আল্লাহর কাছে ন্যায় বিচার চাইতে পারে। কিন্তু এ কেমন বিচার যা পরকালে নাজাতের সম্ভাবনাকেও রূদ্ধ করে দিতে চায়? বর্তমান পুঁজিবাদী দুনিয়ায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সার্বভৌম ক্ষমতা কী আমাদের ঠিক এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফেলেছে না, যেখানে বিচার ও নাজাত দুইটাই ক্ষমতাবানদের অধিকারে আছে; আর মজলুমের জন্যে এই দুইয়ের দরোজাই বন্ধ হয়ে গেছে। বিচার ও নাজাতকে একসাথে এক বিন্দুতে পাওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া কী মজলুম বাংলাদেশীদের আর কোন উপায় আছে?

নাজাত আর বিচারকে এক বিন্দুতে আনা কোন বৈপ্লবিক ঘটনা অবশ্য আয়েশা ঘটায় না। স্বামীর কবরের সন্ধ্যান না জানলেও সে ঠিকই জিয়ারত করে। ঘোষণা দেয় – আমিতো জানিনা আমার স্বামীর কবর কই, তাই আমার কাছে এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলই আমার স্বামীর কবর। অর্থাৎ বিচার না পেলেও, নাজাতের সম্ভাবনা কঠিন হয়ে গেলেও, নাজাতের মধ্যেই সে অবিচারের নিদান খোঁজে। কিন্তু ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’কে কবর ঘোষণা দেয়ার মধ্যে একটা র‍্যাডিকাল সম্ভাবনা হাজির আছে। এই ঘটনা পুরো বাংলাদেশেরই একধরণের – মনুমেন্টালাইজেশন। সাতাত্তরে জিয়াউর রহমান সরকারের অফিশিয়াল ঘোষণা মোতাবেক, মোট ৫৬১জন বিমান বাহিনীর সদস্যকে সামরিক আদালত মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল।[6] সামরিক বাহিনীর মোট ১১৪৩ জন সদস্যকে এসময় মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় বলে জানা যায়। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ আয়েশার স্বামী জয়নালের মতো হাজার সৈনিকের কবরস্থান। আয়েশা সিনেমা তাদের স্মৃতির মনুমেন্ট। যাদের কবরের চিহ্নটুকুও হারিয়ে যেতে দেয়া হয়েছিল, এই সিনেমা যে তাদেরকে ইতিহাসের পাতা থেকে শুধু হারিয়ে যেতে দিলো না তাই না, বরং যুক্ত করলো আমাদের বর্তমানের অভিজ্ঞতায়। আনিসুল হক ‘আয়েশামঙ্গল’ উপন্যাসটি লিখেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। এই উপন্যাসটির ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক গুরুত্ব আছে বিশেষ। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত এই টেলিফিল্মটি, চল্লিশ বছর আগের এমন এক অতীতকে সামনে নিয়ে এসেছে যে অতীত ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের ভাষা ব্যবহার করে বলতে গেলে বর্তমান-সময়ের (now time/ Jetztzeit) বারুদ ঠাসা। টেলিফিল্মটি ইতিহাসের প্রবাহে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে (blasted out of the continuum of history)[7], সেই অতীতকে বের করে এনেছে। এই অতীতকে আমরা সহজেই চিনতে পারি, কারন তা আমাদের বর্তমানের বাস্তবতাও বটে। বাংলাদেশের মতো দেশের মানুষের বসবাস সদা সর্বদা ঘোষিত অথবা অঘোষিত জরুরি অবস্থার মধ্যে যখন তখন সার্বভৌম ক্ষমতার হাতে ‘সামারি জাজমেন্ট’ অথবা কোন জাজমেন্ট ছাড়াই নিহত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে। আর দুই হাজার আঠারো সালে সেই সম্ভাবনা প্রকট রূপে হাজির হয়েছে বলেই সাতাত্তর সালের যে ঐতিহাসিক মুহুর্তকে আয়েশা টেলিফিল্মটি ধরে রেখেছে, তাকে আমরা বর্তমান-সময়ে চিনে নিতে পারি।

 

এই চিনে নেয়ার মাধ্যমে ঐ ঐতিহাসিক মুহুর্তের একরকম নাজাত ঘটে। ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া বহু জয়নালের ঐতিহাসিক ‘সাবজেক্ট’ হিসাবে পুনরুত্থান ঘটার অর্থে। যে জাতির মানুষ নিজেরা ঐতিহাসিক সাবজেক্ট হিসাবে হাজির হতে পারে না, তারপক্ষে এইভাবে অতীতকে নাজাত দেয়াও সম্ভব হয়না। এতে প্রমানিত হয় যে জাতি হিসাবে আমাদের একরকম নাজাত ও পুনরুত্থান ঘটে গেছে। অতীতকে এইভাবে (ঠিকভাবে) চিনতে পারাটাও, বেনিয়ামিনের মতে, কেবল নাজাতপ্রাপ্ত তথা পুনরুত্থিত মানব জাতির পক্ষেই সম্ভব। সম্প্রতি কিশোর বিদ্রোহ নামে যে বিপ্লব সংগঠিত হয়ে গেলো, তা জাতি হিসাবে আমাদের নাজাত ও পুনরুত্থানের প্রমান। বর্তমান সরকার তার সার্বভৌম ক্ষমতার ভয়াল ও কদর্য রূপের প্রকাশ ঘটিয়ে, আইনি ও বেআইনির, পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারদের সকল ভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে এই বিপ্লবের ফল পালটে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তা তারা পারে নাই। পারবেও না। ‘আয়েশা’র মতো শিল্প যথাযথ সময়ে যে দেশের শিল্পীরা হাজির করতে পারে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সে দেশের জনগণের বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। ফ্যাসিবাদের এই যুগে ‘আয়েশা’ তাই একটি মহৎ শিল্পকর্ম।

 

তথ্যসূত্রঃ

[1] Franz Kafka. The Trial. Translated by Breon Mitchell. Schocken Books, New York, 1998. pp. 215‐217.

[2] Giorgio Agamben. Angels. Translated by Lorenzo Chiesa. Journal of the Theoretical Humanities

Volume: 16, number: 3, September 2011.p.118.

[3] Ibid.p.122.

[4] Ibn Khaldun. The Muqaddimah. Translated by Franz Rosenthal. “The real meaning of prophecy”. Pantheon Books / Bollingen Series. 1958.

[5] Ludwig Adamec. Historical Dictionary of Islam. Rowman & Littlefield Publishing Group, 2017. pp. 290-291.

[6] Bangladesh says 561 military men hanged after 1977 coup attempt.United Press International, Oct. 2, 1977.

[7] Walter Benjamin. Selected Writings, volume 4, 1938-1940. Translated by Edmund Jephcott

and Others. “On the Concept of History”. Harvard University Press, 2003. P. 395.

লেখকঃ পারভেজ আলম

মুক্তিফোরামে লেখা পাঠানোর ইমেইল এড্রেস [email protected]

 

 

 

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *