বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ঋণ: দাসত্বের নতুন হাতিয়ার

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মত প্রতিষ্ঠানগুলো দাবী করে থাকে, তারা স্বল্প উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য সাহায্য করে থাকে। তারা এটাও দাবী করে যদি কোন রাষ্ট্র সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নিয়ে তাদের কাছে আসে তাহলে তারা সাহায্য করতে প্রস্তুত।
শুনে বেশ সাদামাটা মনে হলেও, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকান্ডে কখনই তা প্রকাশ পায় না। তাদের কাজ সুগভীর ভাবে পর্যবেক্ষন ও পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাদের কর্মকান্ডে কতিপয় গোষ্ঠী ব্যাপক লাভ অর্জন করছে এবং কিছু মানুষ, গোষ্ঠী গরীব থেকে গরীবতর হচ্ছে। যা কিনা তাদের কথার সম্পূর্ন বিপরীত।
এই প্রতিষ্ঠানপগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ঋণ দিয়ে থাকে নানাবিধ শর্ত, লক্ষমাত্রা পূরণ সাপেক্ষে। বেশ কিছু ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাদের দেয়া শর্ত বা লক্ষমাত্রা আপাত দৃষ্টিতে লাভজনক বা উন্নয়নের হাতিয়ার হলেও তার একটি ধ্বসাত্মক প্রভাব পড়ে সেই দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।
উদাহরণ হিসাবে আলোচনা করা যায় হাইতির ঘটনা। ১৯৮৬ সালে আইএমএফ হাইতিকে শর্ত সাপেক্ষে ২৪.৬ মিলিয়ন ডলার লোন দিতে রাজি হয়। শর্তের মধ্যে ছিল হাইতিকে তাদের আমদানী বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে, চাষীদের ভর্তুকি দেয়া বন্ধ করতে হবে, নানান সরকারি খাতে ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে এবং অলাভজনক রাষ্ট্রত্ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
আমদানী নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়ায় হাইতির বাজার আমেরিকান চালে ছেয়ে যায়। আইএমএফ হাইতির চাষীদের ভর্তুকির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও, হাইতির বাজার ভরে যায় বিপুলভাবে ভর্তুকি দেয়া আমেরিকান চালে। হাইতিতে প্রতি বছর আমেরিকান চালের আমদানী শূণ্য থেকে ২০০,০০০ টনে উঠে আসে। আমেরিকা প্রতি বছর প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়ে থাকে তাদের চাষীদের। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হাইতির অধিবাসীরা সস্তায় আমেরিকান চাল কেনায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফল স্বরূপ হাইতির চাষীদের অন্ন সংস্থান একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। একে ভর্তুকি বন্ধ, তার উপর সস্তা আমেরিকান চাল ফলে প্রতিযোগীতা করার কোন সক্ষমতাই ছিল না হাইতিয়ান চাষীদের। ফলে অনেকেই কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়ে জীবিকার সন্ধানে অন্যান্য কাজে জড়িয়ে পরে। অথচ হাইতি ছিল চাল উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ন। স্বয়ংসম্পুর্ন হাইতি চালের জন্য সম্পূর্নভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।  হাইতি ইনকাম পার ক্যাপিটা ৬০০ ডলার থেকে ৩৪৯ ডলারে নেমে আসে।
আইএমএফ হাইতির এই দুরবস্থার জন্য সরাসরি দায়ী না হলেও তাদের অর্থনৈতিক অবনতির পথ আইএমএফই তৈরি করে দিয়েছে। তাদের দেয়া শর্ত মেনে নিয়েই হাইতির অর্থনীতি নিম্নমুখী। আইএমএফ এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে, তারা হাইতির এই অবস্থার জন্য হাইতির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করেন।
১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাংক হাইতি সরকারকে বৈদেশিক সাহায্যের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এর জন্য হাইতি সরকারকে “Structural Adjustment Programs” বাস্তবায়ন করার বলে। যার মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর বেসরকারিকরণ(Privatization)। দাতব্য সংস্থা যুক্তি ছিল এই পলিসির বাস্তবায়ন হলে তা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তুলবে। ঐ বছরই সামরিক সামরিক অভ্যুথানে ক্ষমতা হারান হাইতির নির্বাচিত সরকার। আমেরিকার সহায়তায়(সামরিক) ১৯৯৫ সালে পুনরায় ক্ষমতা ফিরে পায় সরকার। তারপর থেকে সরকারের ওপর SAP বাস্তবায়ন করার জন্য নানামুখী চাপ আসতে থাকে। হাইতির জনগণ এর বিরুদ্ধে থাকলে সরকার নানাভাবে SAP এর বাস্তবায়নের ফলে কি কি উপকার হতে পারে সে বিষয়ে প্রচারণা চালায় কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। আরো চাপ প্রয়োগ করার জন্য AID(Agency of International Development) ৪.৫ মিলিয়ন ডলারের ব্যালান্স-অফ-পেমেন্ট আটকে দেয়। ফলে প্রায় সাথে সাথেই হাইতির মুদ্রার মান ২০ শতাংশ কমে যায়। খাদ্যশস্য ও জ্বালানী তেলের আমদানী প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। হাইতির জনগণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বেরসকারিকরণের বিরিদ্ধে থাকলেও সরকার নানা চাপের মুখে পড়ে ১৯৯৬ সালে বিশ্বব্যাংকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। [বিস্তারিতঃ https://fpif.org/haiti/ ] । এই বেসরকারীকরণের ফলে রাষ্ট্রয়ত্ত্ব এই প্রতিষ্ঠানগুলো চলে যায় ব্যাক্তিমালিকানায়। বিশেষত আমেরিকার। এর ফলে জনগন খুব কমই লাভবান হয়। লাভের বেশীর ভাগ হাইতির বাইরে চলে যায় এবং অবশিষ্ট অংশ হাইতির নানা ঋণ শোধে ব্যয় করা হয়।  বিশ্ব ব্যাংকের দেয়া পলিসির বাস্তবায়নের ফলে লাভবান হচ্ছে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংক, বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানীর, একমাত্র লাভের খাতা শুন্য সাধারণ জনগণের। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নেয়া ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে তাদেরই। ঋণ শোধের জন্য জাতীয় বাজেটে স্ব্যাস্থ, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে যাচ্ছে। নেমে যাচ্ছে তাদের জীবনযাত্রার মান, বেড়ে যাচ্ছে ট্যাক্সের বোঝা। তারা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে।
এছাড়াও ফিলিপাইনের কিছু প্রকল্পে দূর্নীতি ও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর সম্পৃতাও আলোচনা করা যায়।
বিশ্ব ব্যাংক ফিলিপাইনকে প্রায় দশটি ঋণ দিয়ে থাকে তাদের দেয়া “Structural Adjustment Plan” বাস্তবায়ন করার জন্য। এই প্ল্যানের অন্তর্গত ছিল শিল্প কারখানা বৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি। এছাড়া বিশ্বব্যাংক ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে লোন দেয় ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে মুদ্রা সরবরাহ করার জন্য। কিন্তু একনায়ক মার্কোসের শাসন ব্যাবস্থার সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির কারণে তা ব্যার্থ হয়। দেওলিয়া হয়ে যায় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক   বিশ্বব্যাংকের দেয়া “Structural Adjustment Plan” বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ফিলিপাইনের কৃষি জমি ধংস্ব করে গড়ে তোলা হয় কারখানা। বলা হয়, কারখান তৈরি করলে তা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করে তুলবে এবং এই কারখানার ফলে বহু লোকের কর্মসংস্থা হবে। কারখানা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ আসে বৈদেশিক ব্যাংকগুলো থেকে চড়া সুদের বিনিময়ে। ঐ কারখানাগুলোতে যে পণ্য উৎপন হয় তার সবই রপ্তানী হয় দেশের বাইরে। কৃষি জমি ধংস্বের ফলে দেখা দিচ্ছে খাদ্য সংকট আর বহু কৃষক, মানুষ যাদের জীবিকা কৃষিকে ঘিরে তারা হয়ে যাচ্ছে বেকার। এর উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ফিলিপাইনের কালাবার্যান প্রকল্পের কথা। জাপানি অর্থায়নে তৈরি একটি কারখানা যেখানে শুধুমাত্র রপ্তানি যোগ্য পণ্য উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় আট মিলিয়ন লোক (যারা কৃষি কাজে জড়িত ছিল) হারায় তাদের কর্মসংস্থান। বিনিময়ে তারা সরকারের পক্ষ থেকে পায়নি কোন ক্ষতিপূরণ। এই মানুষগুলোর পূনর্বাসের জন্য ফিলিপাইনের সরকারও নেয়নি কোন উদ্যোগ। উন্নয়ন প্রকল্পের ফলে এই লোকগুলো হল বেকার এবং তাদের উপর চেপে বসল বিপুল ট্যাক্সের বোঝা। ট্যাক্স, সেই ঋণ শোধের জন্য যে ঋণ তারা কখন চায় নি।
ফিলিপাইনের এই বিপুল ঋণ শোধ করার জন্য তাদের বৈদেশিক মুদ্রার পরিমান বাড়াতে হবে আর তার জন্য বাড়াতে হবে রপ্তানি। আর এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ফিলিপাইনে গড়ে উঠেছে বনভিত্তিক শিল্প। গড়ে উঠছে কাঠ প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা এবং ধ্বংস হচ্ছে বিপুল পরিমান বনভূমি। যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে ফিলিপাইনের সাধারণ জনগণের উপর। ১৯৯১ সালে টাইফুন যার প্রমাণ।
১৯৯১ সালের টাইফুন ইয়ানায় মারা যায় প্রায় ৬০০০ মানুষ, গৃহহীন হয় প্রায় ৪৩০০০ মানুষ। অথচ বনভূমি’ই আগে ওই এলাকার মানুষকে বন্যা, ভূমি ধসের মত দূর্যোগ থেকে রক্ষা করত।
বিপুল বৈদেশিক ঋণ শোধ করার জন্য সরকারকে মারাত্মক ভাবে কমিয়ে আনতে হয় শিক্ষা, চিকিৎসা সহ আরো নানান খাতের খরচ। ফলে জনগণ বঞ্চিত হয় তাদের মৌলিক অধিকার থেকে, নেমে যায় তাদের জীবনযাত্রার মান।
বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষাক্ত নিঃশ্বাস পড়ছে আমাদের উপরও। ১৯৯৯ সালে যানযট নিরসণের জন্য মহাখালী ও যাত্রাবাড়ি দুটি ফ্লাইওভার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এই জন্য প্রয়োজনীয় সমীক্ষা চালানো হয় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে। পরে এই সংস্থার অর্থায়নেই তৈরি হয় মহাখালী ফ্লাইওভার। এটির নির্মান সম্পন্ন হওয়ার পরপরই ২০০৭ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্টে উঠে আসে এর ব্যার্থতার কথা। ইকোনমিক রেট অব রিটার্ন এক্ষেত্রে মাত্র ১৭%। বিশ্বব্যাংকের দেয়া প্রেসকিপশপন মেনেই ঢাকায় গড়ে উঠছে একের পর এক ফ্লাইওভার। যার ফলাফল বিগত এক দশকে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতিবেগ ঘন্টায় ২১ কি.মি থেকে কমে ৬ কি.মি তে নেমে এসেছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক “Toward Great Dhaka”-ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। যেটা আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। পূর্ববর্তী দুইটি দেশের ঘটনা বিস্তারিত আলোচনার পর বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ বা অন্য কোন দাতব্য সংস্থা থেকে সাহায্য বা উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করার পূর্বে আমাদের সতর্ক হতে হবে। কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার পূর্বে আমাদের অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করতে হবে। নতুবা আমাদের দেশ, অর্থনীতি, রাজনীতি আটকে যেতে পারে নতুন কোন দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের ফাঁদে।
বিখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা জন পিলজারের  মতে, এখন যে যুদ্ধ চলে তাতে বুলেট খরচ হয় না তবুও মানুষ মরে। এ যুদ্ধ সাম্রাজ্য দখলের যুদ্ধ নয় এটা অর্থনীতির যুদ্ধ। ঋণ হল এই যুদ্ধের অস্ত্র। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ তাদের নানা লোভনীয় প্রস্তাব আর পলিসি দিয়ে আমাদের মত তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে আটকে ফেলছে ঋণের ফাঁদে। সাহায্যের নামে তারা যা দেয় তার দশগুন তুলে নেয় সুদের মাধ্যমে। এই ঋণের মাধ্যমে আমরা পরিণত হই অন্যশ্রেণির এক দাসে।

তথ্যসূত্রঃ
মুহাম্মদ, আনু “উন্নয়নের বৈপরীত্য সর্বজনের সম্পদ কতিপয়ের মালিকানা” মাওলা ব্রাদার্স।
“War by other means” – John Pilger, Documentary
হাইতিঃ
1.      http://www.historycommons.org/context.jsp?item=IMFLoanHaiti
2.      https://www.williambowles.info/haiti-news/archives/structural_adj_280995.html
3.      https://www.williambowles.info/haiti-news/archives/pm_080995.html
4.      https://www.williambowles.info/haiti-news/archives/hp_130995.html
5.      https://www.washingtonpost.com/archive/politics/2000/04/13/in-haiti/8338185d-7032-429d-a27b-a498178323d2/?utm_term=.44bdb7942c2b
6.      https://fpif.org/haiti/
ফিলিপাইনঃ
2. http://documents.worldbank.org/curated/en/245441468776739677/Philippines-Structural-Adjustment-Loan-Project
3. https://focusweb.org/publications/2000/The%20Turbulent%20and%20Dismal%20Record.htm
4. http://www.fao.org/docrep/005/ac778e/AC778E16.htm
5. http://www.fao.org/docrep/005/ac778e/AC778E17.htm#TopOfPage
6. https://www.philstar.com/business/2018/04/01/1801584/government-debt-hits-record-p682-trillion
বাংলাদেশঃ
1.      https://www.dailyinqilab.com/article/109483/%E0%A6%AB%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%93%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%AB%E0%A6%B2-%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BE

লেখকঃ
তাহমীদ
অর্থনীতি বিভাগ
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *