শান্তি ও ন্যায়ের সপক্ষে একটি গণমার্চ প্রয়োজন

সারাদেশ জুড়ে চলছে একটি নির্বোধ সরকারের নারকীয়তা। খুব সহজ কিছু সংস্কার ও পরিবর্তনের দাবিতে যে সাধারণ ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলো, তাদের দাবি ঠান্ডা মাথায় শোনার বদলে তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করবার চেষ্টা করা হচ্ছে। সারাদেশে চলছে রক্তের লীলাখেলা। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, এক্টিভিস্ট, ছাত্রছাত্রী, কেউই বাদ পড়েনাই এই নির্বুদ্ধিতার চক্রের থেকে। এক অদ্ভুত আধারের দিকে হেটে চলেছে বাংলাদেশ।

“একত্র হোক, সংগঠিত হোন, শান্তিপূর্ণ গণমার্চ করুন সংসদ অথবা অন্য কোন কেন্দ্রীয় সরকারি ভবনের দিকে। সাধারণ মানুষের নেতারা এক হয়ে এগিয়ে এলে কেউ আর তাদের দাবিকে অন্য কারো দাবি বলে চালিয়ে দিতে পারবেনা, লক্ষ মানুষ একত্রে হাটলে কেউ তাকে দমিয়ে দিতে পারবেনা আর ঐকতানে কোটিমানুষ শান্তি ও ন্যায়ের দাবি তুললে কেউ তাকে অগ্রাহ্য করতে পারবেনা।”

এর সবটাই হচ্ছে কেননা সরকার হয় এতো উন্নাসিক, এতো অন্ধ নাহয় এতো ভগ্ন যে সাধারণ মানুষকে তারা আর দেখতে পায়না। সাধারণ মানুষ কোন দাবি তুললেই তাদের কাছে মনে হয় কোন অপশক্তির হাত রয়েছে এর পেছনে। নিরাপদ সড়কের সহজ দাবির পেছনেও তারা বিরোধী দলের হাত দেখতে পায়। শুধু তারা নয়, যারা বিরোধী দলের অতীত দূঃশাসন নিয়ে চিন্তিত, তারা অনেকেই এমনটা দেখতে পায়। হয়তো ভয়ের থেকে, হয়তো শংকার থেকে–অথবা হয়তো বেপরোয়া অহংকারের থেকে।
তবে যদি দ্বিতীয় কোন শক্তি এই আন্দোলনের কর্ণধার হতো তবে এখনও পর্যন্ত এর দাবি কেবলমাত্র শান্তি আর ন্যায়ের মতন সহজ সরল উদার দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকতো না। সরকার পতনের দাবি অনেক আগেই মুখ্য হয়ে উঠতো। তা হয়নাই। সর্বোচ্চ কঠিন যে দাবি এখনও ছাত্ররা তুলেছে সেটি হলো নৌমন্ত্রী এবং সিন্ডিকেট নেতা শাজাহান খানের পদত্যাগের দাবি। সেই দাবির কারণ সরকারকে বিপাকে ফেলা নয়, বরং এই একজন ব্যক্তির দুঃশাসন এবং সেই কারণে সৃষ্ট মৃত্যুফাঁদকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করা।
তবে সেই কথা শোনবার মতন কান আমাদের সরকারের এখন নাই। তারা যেনো একটা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির বাইরের কথা শুনতেই পাননা। তারা আমির খসরু সাহেবের এক গোপন ফোনালাপ শুনে অনেক কিছু ভাবতে পারেন, তবে তারা ভাবতেই পারেননা যে সাধারণ মানুষ সরকার পতন আর রাজনৈতিক পালাবদল ছাড়াও রাষ্ট্রনৈতিক সংস্কারের কোন দাবি তুলতে পারে।
কাজেই জনবিচ্ছিন্ন পাগলা সরকার আরো দমন করতে চেষ্টা করে। সবাইকে চুপ করিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সবকিছু লুকিয়ে ফেলতে চেষ্টা করে, যেমনটা তারা করেছে এই গোটা দশক জুড়ে। তবে জনগণ তাদের সব কূটচাল দেখে ফেলেছে, দেখে তারা শিখেছে। কাজেই কোন ফাদেই তাদেরকে আটকে রাখা যাচ্ছেনা। না আক্রমণের ফাদ, না গুজব নিয়ে গুজবের ফাদ, না বিরোধীদলের ইন্ধনের ফাদ-বেপরোয়া তৃতীয় শক্তি কিছুই শুনছে না।তারা জেগেই আছে, তারা তেড়েই চলেছে। তাদেরকে কেউ রুখতে পারছে না।
তবে সরকারের আক্রমণে মুখে, নির্যাতনের মুখে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। মার খেতে খেতে আর নিজেদের বাচাতে মার দিতে দিতে তারা নিজেদের নিয়েই দিশাহারা হয়ে পড়ছে। যে রাজনৈতিক প্রকল্প নিয়ে কোটা আন্দোলনকের ৯ দফা ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ৩ দফা একত্র হয়েছিলো, সেটি এখন খুব সোজাসাপটা প্রতিরোধ আর প্রতিশোধের দাবিতে পরিণত হচ্ছে। যে আকাঙ্ক্ষা একটা নতুন দেশ, নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নে শুরু হয়েছিলো, সেটি এখন অনন্যোপায় হয়ে নতুন সরকারের অথবা নতুন কোন শক্তির সাহায্যের দিকে মুখ চেয়ে আছে।
তাই আমরা বারবার দেখছি তৃতীয় শক্তির এই ক্লান্ত বিদ্রোহীরা সাহায্য খুজছে চতুর্থ কারো থেকে। সরকার তাদেরকে পিষে দিয়েছে, বিরোধীদল তাদেরকে আশাহত করেছে আর নিজেদের ওপর অত্যাচার তাদেরকে বেপরোয়া করেছে। তাই তারা চাচ্ছে বাইরের কেউ এসে এইসব পুরোনো শকুনের থেকে তাদের বাচাক। এই চাওয়া আসছে একটি দমবন্ধ মৃত্যুপুরীর থেকে, তবে এই দাবি শংকাজনক ও জাতির ভবিষ্যতের জন্যে ভয়ংকর।
অতীতে যখনই তৃতীয় শক্তির আন্দোলনকে অন্য কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে, হোক তা প্রথম শক্তি বা দ্বিতীয় শক্তি, সেটি কখনই সাধারণ জনতার জন্যে সুখকর হয়নি। চতুর্থ কোন শক্তি যদি এসে এখন তৃতীয় শক্তিকে মুক্তি দেয়, সেটি স্বল্প সময়ের জন্যে আমাদের আক্রমণ থেকে রেহাই দিলেও দীর্ঘমেয়াদে আমাদের জন্যে দারুণ ভয়ংকর হয়ে উঠবে। জনতার শক্তি ছাড়া আর কোন শক্তিকেই বিশ্বাস করবার কোন অবকাশ নাই, ইতিহাস আমাদেরকে সেটা শিখিয়েছে।
কাজেই তৃতীয় শক্তির যে কারো কিছুটা শক্তি, সাহস ও সামর্থ্য অবশিষ্ট আছে, তাদেরকে এখন উঠে দাড়াতে হবে শান্তি ও ন্যায়ের দাবিতে। যেই উদার দাবিতে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল, সেই দাবিতে তাকে বহাল রাখতে এবং সকল নিষ্পেষণের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান করতে এখন সরকারকে তৃতীয় শক্তির অস্তিত্ব জানান দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নাই। সেটি কেবলমাত্র হতে পারে যদি তৃতীয় শক্তির সকলে একত্র হয়ে সংসদ বা সরকারী কোন কেন্দ্রীয় ভবনের দিকে শান্তিপূর্ণ গণমার্চ করে এবং শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে দাবি তোলে। সকলে সারাদেশের থেকে একত্র হয়ে একটি জায়গায় জড়ো হলে খুব সহজে আক্রমণ করাও সম্ভব হবেনা, রুখে দেয়াও হবে দুষ্কর। ইন্টারনেট ফিরে এসেছে, মিডিয়া সংবাদ প্রচার শুরু করেছে। যদি নাগরিক সমাজের নেতারা, শিক্ষকেরা, বুদ্ধিজীবিরা, অভিভাবকেরা, সাংস্কৃতিক কর্মীরা আর মানুষের বিশ্বাসী মানুষেরা এক হয়ে একটি গণমিছিলের ডাক দিন-তাতে সাড়া দেবে সাধারণ মানুষ এবই ভোটের রাজনীতির টিনের চশমা খুলে তৃতীয় শক্তির দুর্বার রূপকে মেনে নিতে হবে সরকারকে।
এই সরকার প্রমাণ করেছে যে তারা জনগণের কথা শুনতে পায়না। তাদেরকে বাধ্য করতে হবে সেই কথা শুনতে। সকলে একমুখে, এক দাবিতে, এক স্থানে একত্র না হলে সেটি সম্ভব হবেনা। সবাই যদি আলাদা আলদা ভাবে নানান জায়গায় মার খেতে থাকে আর সেই মারের প্রতিরোধ প্রতিশোধ নিয়েই ব্যস্ত না থাকে, সংগঠিত না হয়, তবে তৃতীয় শক্তি নিজের ওপর আস্থা হারাবে এবং চতুর্থ কোন শক্তিকে কামনা করা শুরু করবে। সেই আজানা চতুর্থ শক্তি হতে পারে আমাদের দেশ ও জাতির জন্যে মারাত্মক ভয়ংকর।
কাজেই এখনই শেষ সুযোগ। একত্র হোক, সংগঠিত হোন, শান্তিপূর্ণ গণমার্চ করুন সংসদ অথবা অন্য কোন কেন্দ্রীয় সরকারি ভবনের দিকে। সাধারণ মানুষের নেতারা এক হয়ে এগিয়ে এলে কেউ আর তাদের দাবিকে অন্য কারো দাবি বলে চালিয়ে দিতে পারবেনা, লক্ষ মানুষ একত্রে হাটলে কেউ তাকে দমিয়ে দিতে পারবেনা আর ঐকতানে কোটিমানুষ শান্তি ও ন্যায়ের দাবি তুললে কেউ তাকে অগ্রাহ্য করতে পারবেনা।
এখনই সময়, এখনই সুযোগ। সংগঠিত হতে হবে এখনই। সাধারণ মানুষের নেতারা, আপনারা সাধারণ মানুষের সপক্ষে পদযাত্রা ডাকুন, প্রচারের দায়িত্ব আমরা নেবো। এখন সময় উন্নাসিকতার নয়, এখন সময় প্রতিশোধপরায়নার নয়, এখন সময় বিভক্তির নয়–এখন সময় সংগঠনের। এখন সময় এই মৃত প্রান্তরে জীবন সঞ্চারণের।

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *