এগুলো সাহসী তরুণদের অপমানের শামিল

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী যখন এরশাদীয় কায়দায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের ঘোষণা দিলেন তারপর বুধবার রাত থেকে যারা শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার, ক্লাসে ফেরার পরামর্শ বিতরণ করছেন তারা নিশ্চয় এখন বুঝতে পারছেন তাদের এইসব পরামর্শের তোয়াক্কা শিক্ষার্থীরা করেন না; তাদের পরামর্শ নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়নি – তাদের পরামর্শ চাইলে এই আন্দোলন হতো না| যারা এই জন্যে শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপত্তার’ অজুহাত খাড়া করছেন তারা বরঞ্চ যে বা যারা নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটাতে পারে তাদের মোকাবেলা করুন – এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কারণে নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটেনি| নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটেছে লেলিয়ে দেয়া পেটোয়া বাহিনীর কারণে|

যদি পরামর্শ দিতে চান তবে সরকারের যে সব কর্তারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ডাহা মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছেন তাদের পরামর্শ দিন, লেলিয়ে দেয়া গুন্ডাদের নিরস্ত করার জন্যে চেষ্টা করুন|

যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের টিসি দিচ্ছে তাদের বলুন এইসব অন্যায় অবিলম্বে বন্ধ করতে| শিক্ষার্থীদেরকে সম্মিলিত করার নামে যারা একটি জায়গায়, একক নেতৃত্বে আসার দিকে ঠেলছেন তারা কী চান? আমার ধারণা তারা চান শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ততার বিপরীতে নিয়ন্ত্রণযোগ্য নেতৃত্ব যাদের ভয় দেখিয়ে ঘরে পাঠানো যাবে| তাদের শনাক্ত করা যাবে এবং পাল্টাপাল্টি নেতৃত্ব দাঁড় করানো যাবে| বলা হচ্ছে যে, প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের পরে রাস্তায় কেন?

কারণটা একজন স্কুল ছাত্রীর কাছে শুনুন “জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের দশম শ্রেণির এক ছাত্রী বলে, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবিও প্রধানমন্ত্রী মেনে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই আন্দোলনের পরিণতি আমরা দেখেছি। ফেসবুকে দেখলাম কোটার এক নেতার লাশ পাওয়া গেছে নদীতে। আমরা চাই সুস্পষ্ট ঘোষণা আসবে।’ এই কথা আপনারা জানেন না তা বললে বিশ্বাস করার কারণ নেই| শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে যাক তা চাইলে সরকার অন্তত একটা দাবি মানুক| দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন বা দুইজন মন্ত্রী পদত্যাগ করলে সমস্যার সমাধান হবে না এই বক্তব্য বোধগম্য ; কিন্তু অগ্রহণযোগ্য এই কারণে যে – এই পদত্যাগ সমাধানের জন্যে দাবি করেনি শিক্ষার্থীরা; করেছে কেউ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ সেই স্বীকৃতির জন্যে, সমাধানের জন্যে আন্তরিকতা আছে সেটা প্রমানের জন্যে| এটা হচ্ছে জবাবদিহির দাবি; সেটা যদি বুঝতে অপারগ হন আপনার সঙ্গে আলোচনা করা যাবে, যদি বুঝতে না চান বোঝানোর চেষ্টা করে ফলোদয় হবে না|

পরিবহন আইন বদলানো হবে এই আশ্বাস কতটা নির্ভরযোগ্য সেটা বুঝুন ইতিহাস থেকে —“২০১২ সালে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, ২০১৬ সালে আইনের খসড়া হয়। মন্ত্রিসভা আইনটির নীতিগত অনুমোদন দিয়ে গত বছরের নভেম্বরে এটি ভেটিংয়ের (আইনি মত) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। নয় মাস ধরে আইনটি নিয়ে শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষাই চলছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর আইনটির খোঁজাখুঁজি শুরু হয়।” যে আইনের খসড়া ‘খুঁজে’ বের করতে হয় তার ভবিষ্যৎ কী? আর আইন যা আছে তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে বলুন? এই নতুন আইন আলোচনার জন্যে মন্ত্রীসভার বিশেষ বৈঠক করা কি অসম্ভব ছিল? অনুপ্রবেশের তত্ব নিয়ে বলা বাহুল্য; কেননা এইগুলো ভিত্তিহীন| ধরেই নেয়া হয়েছে এই শিক্ষার্থীরা নির্বোধ, তাদের কেউ উস্কে দিচ্ছে| এগুলো সাহসী তরুণদের অপমানের শামিল|

যাদের হাতে সমাধান তাদেরকে পরামর্শ দিন – যারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে যে নাগরিকের অধিকার আদায়ের পথ কেবল অনুনয় বা করুণা প্রার্থনা করা নয় তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেবেন না – ঐ কাঠগড়ায় আমার-আপনার দাঁড়াবার কথা সেটা ভুলে যাবার কারণ নেই|

|Dr. Ali Riaz|

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *