মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াই

যারা বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করতে চান তারা মূলত রাষ্ট্রের যে সমস্ত অগণতান্ত্রিক আইন, বিধি, নীতিমালা, প্রশাসনিক, বিচারিক কাঠামো বিদ্যমান সেইগুলি পরিবর্তনের জন্য জনগণকে সংগঠিত করা এবং নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো বা রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করবেন। এই লক্ষেই আন্দোলন, সংগ্রাম এবং গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রীয় রূপান্তর ঘটানোর জন্য দেশব্যাপী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার কাজ হাতে নিতে হবে।

নিঃসন্দেহে এই কাজে বাধা আসবে। করা বাধা দিবে ? বাধা তারাই দিবে যারা এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ এবং আজকে এই অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থেকে সুযোগ, সুবিধা এবং অগাধ সম্পত্তি অর্জনের অধিকার অর্জন করেছে।

মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িক শক্তি বলতে আমাদের দেশে সাধারণত ইসলামী মৌলবাদ এবং ইসলামী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বুঝানো হয়ে থাকে।যদিও সকল ইসলামী শক্তিই মৌলবাদী নয়,আমাদের দেশের ধর্মপ্রান মানুষেরাও মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক নয় । আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোথায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোন ভাবে কোন আইনের মাধ্যমে ইসলামিক মৌলবাদী শক্তি আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ ? আমাদের প্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা, আইনি ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় সরকারের কোথাও ইসলামী শক্তির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান বা স্বীকৃতি নেই। তারা এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার সুবিধাভোগী অংশও নয়।

শুধুমাত্র জামাত ই ইসলামীকে ব্যতিক্রম হিসাবে নিতে হবে।এরা একদিকে শাসক শ্রেনীর অংশ এবং  স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল ।যদিও এদের সামাজিক ভিত্তি খুবই দুর্বল । তাবলীগ জামাত, কৌমী মাদ্রাসা ভিত্তিক হেফাজতে ইসলাম এবং বিভিন্ন পীরের অনুসারী এক বিড়াট অংশের মুসলিম জামাত বিরোধী । জামাত মূলত ওয়াহাবী মতাদর্শে দিক্ষিত একটি দল । এ দেশের মুসিলমান্দের উপর মূলত সূফীবাদের প্রভাব ব্যাপক ।ফলে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন যে সমস্ত দল দেখে ,তাদের সফল হবার কোন সম্ভাবনা এ দেশে অন্তত নেই ।স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী দল হিসাবে জামাতকে নিষিদ্ধ করা শুরুতেই উচিত ছিলো। কিন্তু শাসকশ্রেণী তা করবেনা।এরা এমনিতেই জনমানুষের কাছে ঘৃনীত দল।কিন্তু শাসকশ্রেণী তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে এদের টিকিয়ে রেখেছে ।সমাজে বিভক্তি তৈরী এবং ভোটের হিসাব নিকাশের কারনে শাসকদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই দলটি টিকে আছে।

এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। ধর্মের প্রভাব ব্যাপক জনগোষ্ঠীর উপর প্রবল মাত্রায় আছে এবং ক্রমশ তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু মানুষ জাগতিক সমস্যার জন্য বা রাজনৈতিক সমস্যার জন্য ইসলামী দল গুলির উপর নির্ভর করে না। সত্যি কথা বলতে গেলে আজকে করো উপরই নির্ভর করে না। রাজনৈতিক শক্তি হিসাবেও  উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তি নয়। শাসক শেণির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাবার জন্য বা ক্ষমতায় থাকার জন্য। অর্থনৈতিক ভাবে, সামাজিক ভাবে ,রাজনৈতিক ভাবে ইসলামী শক্তি গুলি রাষ্ট্রীয় লুটপাটের সাথে যুক্ত নয়।

আমাদের রাষ্ট্রের সত্যিকারের সুবিধাভোগী শ্রেণী হচ্ছে বিত্তবান শ্রেণী ,তাদের রাজনৈতিক দল সমূহ, সামরিক এবং বেসামরিক আমলা, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট কোম্পানিগুলি, তাদের দালাল মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবি গোষ্ঠী, উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী সমূহ। এরাই রাষ্ট্রের অর্থ বিত্ত লুট পাট করছে ,রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাচার করছে ,জনজীবনকে প্রতিনিয়ত দুর্বিসহ করে তুলছে। এ দেশের শাসকদের দুই প্রধান দলই ইসলামিক এবং মৌলবাদীদের তাদের দলীয় ছত্রছায়ায় আশ্রয় দিয়ে রেখেছে ।

শাসকরা নিজেদের শোষণ ,লুন্ঠন আড়াল করার জন্য, জনগণের সত্যিকারের দুর্দশার কারণ আড়াল করার জন্য জনগণকে ভুল শত্রুর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।যে মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তিকে শাসকরা তৈরী করে, লালন পালন করে তাদের বিরুদ্ধেই জনগণকে সংগ্রাম করতে উস্কানি দেয়।তাদেরকেই জনগণের প্রধানতম শত্রু হিসাবে হাজির করে। এ জন্য রয়েছে তাদের সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া ,সাংস্কৃতিক কর্মী বাহিনী।

যারা জনগণের জন্য একটি মানবিক,কল্যানকর এবং জবাবদিহী মূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করতে চান তাদের প্রধান সংগ্রাম হবে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর পরিবর্তন করা।একই সংগে নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা , আইন সভা , বিচার ব্যবস্থা ,ঔপনিবেশিক আইন সহ সমস্ত কিছুর পরিবর্তনের জন্য জনগণকে সংগঠিত করা। এই কাজ গুলি সঠিক ভাবে করতে পারলে মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িক শক্তির বিলুপ্তি এমনিতেই হয়ে যাবে।মৌলবাদ যে কাঠামোকে আশ্রয় করে টিকে থাকে সেই কাঠামোর বিপরীতে বিকল্প কাঠামো দাড় কারানোই মূখ্য কাজ ।

।মাহবুবুর রাহমান । সদস্য-রাষ্ট্রচিন্তা

fb.com/rashtrochinta

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *