স্বরের রাজনীতি, ইতিহাস ও সর্বজনতন্ত্র নির্মাণ

১: স্বরের রাজনীতি

আমাদের আশে পাশে অনেকের কথা শোনা যায়, আবার অনেকের কথা শোনা যায় না। এই যে শোনা যাওয়া এবং না যাওয়ার সমস্যা, এটা রাজনীতির দিক থেকে অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ। কথা শোনা যাবে কোথায়? রাজনৈতিক পরিসরে। অর্থাৎ বলা ও অপরকে শোনানোর মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক পরিসর গড়ে ওঠে। অন্যদিকে রাজনীতির পরিসরে যিনি কথা বলতে পারেন না, তিনি তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়েও অবস্থান করতে পারেন না। তিনি রাজনীতিতে অনুপস্থিত হয়ে যান। ফলে তার অস্তিত্বহীনতাই একমাত্র তার স্বর শুনা বা শুনা না যাওয়ার কারণ। যখন আপনি আপনার স্বর নিয়ে উপস্থিতি জানান দিতে পারেন না এবং আপনার কথা কেউ শোনে না, আপনি সমাজে উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত আপনি তখন ‘সাবঅলটার্ন হয়ে যান। ‘সাবঅলটার্ন মানে হল আপনি পলিটিকাল স্ফেয়ারের মধ্যে হাজির নাই, আপনার কন্ঠস্বর ধর্তব্য নয়, আমল অযোগ্য । গায়ত্রী স্পিভাকের একটা লেখার কথা আপনারা অনেকেই জানেন, ‘ক্যান দ্যা সাবঅলটার্ন স্পিক?’ মানে নিম্নবর্গ কি কথা বলতেপারেন? এখানে ফিজিক্যালি কথা বলতে পারেন কিনা এমন প্রশ্ন না। রাজনৈতিক পরিসরে আপনার কথা আপনি বলতে ও শোনাতে পারেন কিনা,সেটাই প্রশ্ন।

ইতিহাসে একটা স্বর অনুপস্থিত। ইতিহাস একটা বিশেষ বয়ান একটা বিশেষ স্বরকেই কেবল প্রতিষ্ঠা করছে, যেখান অন্যের স্বর নাই হয়ে যায়। অন্যের স্বর এবংঅস্তিত্বকে সেখানে বিলীন করে দেয়া হয়। এ স্বরটা কারো ব্যক্তি বা মানুষ হিসেবে কথা বলার সক্ষমতার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল রাজনৈতিক পরিসর বলতে যেটা বোঝায়, রাজনীতির ধারনার সাথে এর সম্পর্ক সেখানে গরহাজির করে রাখা। আমরা দেখছি গ্রিসে ‘পলিস’কথাটা থেকে ‘পলিটি’ এসেছে। ‘পলিস ’মানে নগর বা সিটি। যেখানে এসে আপনি সামষ্টিক জীবনের একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ কেমন হবে তা অনুসন্ধান করতে নামেন। সমষ্টি তখনই হবে যখন ‘সামষ্টিক পরিসর’ নামক জায়গায় নিজের স্বরটা অন্যের কাছে হাজির করতে পারে; এবং অন্যে সে স্বরটা শুনতে পারে। অন্যের সাথে নিজের কথাটা বলতে পারার মানে হল ‘সামষ্টিক পরিসর’ যেটাকে বলা হয় রাজনৈতিক পরিসর বা পাবলিক স্পেয়ার– সেইখানে হাজির থাকা বা হাজির নিশ্চিত করা।এপরিসরে সামষ্টিক স্বর তৈরি হওয়ার জন্য প্রত্যেকে অংশ নিতে পারে। যে অংশ নিতে পারেনা সে আর সমষ্টির অংশ হতে পারে না। এখান থেকে সে বাদ পড়ে যায়।

পলিটিক্সের এবং পলিটি তৈরির পারপাসটা ছিল মূলত নিজেরাই নিজেদের পরিচালিত হওয়ার পদ্ধতি ঠিক করা। এখান থেকেই পরবর্তীতে সেলফ ডিটারমিনেশনের ধারনাটা এসেছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কথাটা আমরা বলি। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের সময় যেটা প্রধান আন্তর্জাতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায্যতা আকারে সামনে আসে। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর এই অধিকার স্বীকার করে নেওয়া উচিত যে, সে ঠিক করবে কি করে সে নিজের জীবনব্যবস্থা পরিচালনা করবে। এই অর্থেই এটা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনেও এটি স্বীকৃত। যেহেতু উপনিবেশ মুক্ত হওয়ার সময়ে আধুনিক রাষ্ট্রের ধারনা প্রধান হয়ে গেছে; ফলে এটা রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রোমান ধারনার মধ্যে রাষ্ট্র ধারনার অন্য একটা মানে ছিল। রোমান ধারনায় এসে পাবলিক এবং রিপাবলিক দুটো ধারনা এসেছে। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রসহ যে কোন আধুনিক রাষ্ট্রই কম-বেশি ‘রিপাবলিক’ শব্দ ব্যবহার করে।

‘রিপাবলিক’ মানে কি?‘রিপাবলিক’ ধারনা আসলে ‘রেস পাবলিকা’ থেকে এসেছে; যেখানে ‘পাবলিক রেলম’ দ্বারা তা চালিত হবে। রেলম মানে পরিসর, স্ফেয়ার। ‘রিপাবলিক’ ছিল রোমান এম্পায়ারের নিজেদের সিস্টেম অব গভার্নেন্স। রোমান নাগরিকরা নিজেরা যে পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালিত করত সেটাকেই ‘রিপাবলিক’ বলা হত। সেখানে তারা অংশগ্রহণ করত। এই অংশগ্রহণের জন্য যে কাঠামোটা তারা তৈরি করছিল সেটাকে বলা হত ‘সিনেট’।

রিপাবলিকের ধারনা বা পাবলিক স্পেসের ধারনা হচ্ছে সবসময় নিজেরা অংশগ্রহণ করার জায়গা তৈরি করা। এই অর্থে আমরা বলি ‘রিপাবলিক’ হল এমন একটা সরকার পদ্ধতি, যা আপনি নিজেই নির্ধারণ করতে পারেন। আপনি যখন এর রূপটা একবার ঠিক করেন, তার পরবর্তীতে ‘একটিভলি’(সক্রিয়) এবং ‘ইফেকটিভলি’ (কার্যকরভাবে) তাতে পার্টিসিপেট করেন। আপনার এক্টিভ এবং ইফেক্টিভনেসের মধ্য দিয়ে পাবলিকস্ফেয়ার কাজ করে বা যে পাবলিক রেলমটা থাকে এটাই সিস্টেম অব গভার্নেন্স আকারে থাকে। এবং ধরে নেওয়া হয় অন্যকেউ এটা নির্ধারণ করছে না। আপনারা নিজেরাই একত্রিত হয়ে সেটা করছেন। এইযে একত্রিত হওয়ার প্রক্রিয়ার প্রশ্নেই যেটা পলিটিক্স-সেটা হল স্বর। যেখানে আপনার কথা শোনা যাবে, শোনানো যাবে। আপনি এখান থেকে বাদ পড়ে যাবেন না বা আপনাকে এখান থেকে বাদ দেয়া হবে না।

আপনি যদি এখান থেকে বাদ পড়েন বা আপনাকে এখান থেকে বাদ দেয়া হয় তাহলে তো আপনি আর পার্টিসিপেট করেন নাই। অর্থাৎ আপনি এটার অংশ নয়। যখন আপনি এটার অংশ নন আপনি যখন বাদ পড়লেন তখন রাজনীতি থেকে আপনার অস্তিত্ব বাদ পড়ে গেল। অর্থাৎ আপনি থাকলেও আপনার কথা কেউ শোনে না বা আপনি শোনাতে পারেন না। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপ্লবের পর তারা রিপাবলিকের ধারনাটা আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে তারা যখন সংগ্রাম পরিচালনা করল এবংএক পর্যায়ে গিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করল। তারা তখন বলল যে, প্রত্যেক মানুষের প্রাকৃতিক অধিকার আছে, সে কি ধরনের সরকার বেছে নেবে। এটাকে নিশ্চিত করার জন্য পরবর্তীতে তারা ফিরে গেলেন রোমান সিস্টেমে। ফলে যখন অন্যের কাছে নিজের স্বর নিয়ে আপনি উপস্থিত হতে পারেন অর্থাৎ যখন নিজেরা সবাই মিলে একটা স্বর দ্বারা নিজেদের জীবন ব্যবস্থা রূপায়ন করতে পারেন, তখন তার দ্বারাই পরিচালিত হয় রাজনীতি। কিন্তু রাজনীতি তো সবসময় এমন আইডিয়াল অবস্থায় ছিল না। রোমান যামানায়ও ছিল না, গ্রিক যামানায়ও ছিল না।

গ্রিক যামানায় আমরা দেখব, দাসরা স্বাধীন ছিল না, একারণে তারা পলিসের অন্তর্ভুক্তও ছিল না। অর্থাৎ ফ্রি যিনি তিনিই ছিলেন সিটিজেন। এবংতারা সবাই মিলে রাজনৈতিক পরিসরের সভ্য ছিল। একইকথা রোমান রিপাবলিকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রিপাবলিক একারণেই কিন্তু নট নেসেসারিলি এ কশ্চেন অফ ডেমোক্রেসি ইন দ্য মডার্ন সেন্স। এ কারণে আমরা দেখব যে ,আধুনিক রাষ্ট্রগুলো গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে গড়ে উঠেছে ‘পিপলস রিপাবলিক’ শব্দযুক্ত করে। যদিও রিপাবলিক ধারনার মধ্যে সেটা আছে। তাদের ইতিহাসের মধ্যে সিটিজেন হওয়ার বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। মানুষ মাত্রই তার সভ্য ছিল না, সভ্য হওয়ার জন্য তার অর্থনৈতিক এবংঅপরাপর জিনিসগুলোর সক্ষমতা ছিল ক্রাইটেরিয়া। ফলে আসলে তাদের সবার সেখানে আসার কোন প্রশ্ন ছিল না।

আগে অধিকারের ধারনাটা ছিল সামাজিক। অধিকারগুলোকে দেখা হত ঐতিহ্যিক বা ঐতিহাসিক হিসাবে। এছাড়া প্রাকৃতিক অধিকারের ধারনা ছিল–কিছু কিছু অধিকার প্রাকৃতিকভাবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু এরমধ্যে আরেকটা ধারনা আসছে তা হল ‘ইনএলিয়েনেভল’ রাইটস–অনস্বীকার্য এমন কিছু অধিকার যা যখন হরণ করা হয় বা নিয়ে নেয়া হয় তখন আর রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কেউ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারেনা। এমন অধিকারের ধারনার আগমন ঘটে এই সময়কালে।

দাস ব্যবস্থার মধ্যে পাবলিক স্ফেয়ারে সবার অন্তর্ভুক্তি ছিল না। আধুনিক অর্থে গণতন্ত্রের মানে হল জনগণ নিজেরা সিদ্ধান্ত নিবে এবং জনগণ নিজেরাই তাদের সরকার পদ্ধতি ঠিক করবে।বাস্তবিকভাবে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠার পরেও আমরা দেখলাম আগে যেরকম দাস এবং স্বাধীন মানুষের বিভাজন ছিল এখন যেন সেটাই সম্পত্তির মালিকানার ভিত্তিতে বিভাজনে রূপান্তরিত হল। বিভাজনটা আরও বেশি তাৎপর্যময় হয়ে উঠল। আপনি নাগরিক হিসেবে এটার অন্তর্ভুক্ত কিন্তু আপনি আসলে কার্যকর ভাবে আরেকজনের মত, আরেকটা শ্রেণির মত রাজনৈতিক পরিসরে নিজের স্বর এবং নিজের উপস্থিতি নিয়ে হাজির হতে পারছেন না। ফলে সেখানে স্বর অনুচ্চ হয়ে যাচ্ছে অথবা গরহাজির হয়ে যাচ্ছে। একেই ইটালিয়ান রাজনীতিক এন্টোনিও গ্রামশি প্রথম একটা ধারনার মধ্যে নিয়ে আসলেন যাকে বলা হয় সাবঅলটার্ন।

ইতিহাস চর্চা কথাটার মানে কি? আমরা যখন পিছনের সময়, ঘটনা নিয়ে আলোচনা করি তখন আমরা আসলে একটা বিশেষ ধরনের স্বর জনপরিসরের মধ্যে উচ্চকিত করি। তার দ্বারাই নির্ধারণ করি কি ধরনের রাজনীতি, রাষ্ট্র, সরকার, জীবনব্যবস্থা আমাদের থাকা দরকার। তার মধ্যে বিপুল একটা অংশের স্বর যদি না থাকে সেই স্বর উপস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। এই প্রয়োজনের চেষ্টা বা দাবিটা হল সাবল্টার্ন নিয়ে ইতিহাস চর্চার একটা মুখ্য উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে খুব ইম্পরট্যান্ট একটা প্রশ্ন গায়ত্রী করলেন যে, আসলে কি এটা রিপ্রেজেনটেটিভ কাজ, অন্যকেও প্রতিনিধিত্ব করা? আপনি আরেকজনের হয়ে কথা বললে সেটাতো তার কথা হয়না। কিংবা কথা বললেই তো সেটা কথা হয়ে যায় না, সেটা অপরকে শুনতে হয়। স্পিকিং ইজ নট টকিং। এটা হল কথোপকথন, যখন অন্যে আপনাকে শোনে এবং রিকগনাইজ করে। যে কথা বলতে পারে এবং যার কথা অন্যে শোনে তার মানে সে জনপরিসরের অংশ। তাহলেতো সে আর সাবঅলটার্ন হতে পারে না। যখন আপনি কথা বলতে পারেন তারমানে আপনার সত্তা অলরেডি হাজির এবং অপরের কাছে সেটা স্বীকৃত। যদি তাই হয় তাহলেতো আপনি আর সাবঅলটার্ন না। ক্যান দ্য সাবঅলটার্ন স্পিক এর মধ্যে দার্শনিক প্রশ্নটা ছিল এই। এবং এটা কি আরেকজন করতে পারবেকিনা আপনার হয়ে। ইতিহাসে আপনি তার স্বর লিখলেই তা দিয়ে তার রাজনৈতিক সত্তার উপস্থিতি নির্ধারিত হয়ে যাবে না। যদিও ডেফিনেটলি তার পক্ষে একটা মতাদর্শিক রাজনৈতিক লড়াই তৈরি হওয়ার একটা বাস্তব পরিস্থিতি ও শর্ত নির্মাণ করতে পারেন।

আমরা তাহলে আবার ফিরে যাই, রাজনীতি বলতে গ্রিক যামানায় যেটা ছিল একটা ভারচুয়াস পাবলিক লাইফ– কিভাবে সবচেয়ে ভাল উন্নত জনজীবন আপনি যাপন করতে পারেন। এটাই রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যে একে অপরের সাথে বসবাস করার লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পরবর্তীতে ইতিহাস চিন্তার অন্য পরিবর্তনগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। গ্রিক চিন্তায় রাজনীতি এবং ইতিহাসের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। মানুষ মরণশীল, এই মরণশীলতাকে সে অতিক্রম করে যেতে পারে যদি সে একটা কিছুর দ্বারা নিজের অমরত্বকে নিশ্চিত করতে পারে। সেটা কিভাবে হতে পারে?মানুষ তার কীর্তি-কর্মকাণ্ডের দ্বারা অপরের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। সে যে বিশেষ কাজগুলো করবে সেই কাজগুলোর মধ্যদিয়ে সে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। প্রকৃতির বাইরে মানুষ নিজে যা কিছু করে, প্রকৃতির মধ্যে সে চিরদিনের জন্য যে স্বাক্ষরটা রেখে যায় তাই তৈরি করে ইতিহাস। ইতিহাসের কোন ‘অনিবার্যতা’ ইতিহাসের কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন তখন মানুষের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল না।

মানুষ প্রাকৃতিক জগতের মত তার ইতিহাসকে স্থায়ী করতে চায়। এ কারণে সে তাই করতে চায়, যা তাকে স্থায়ী করে তুলবে। ফলে তার কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিকতা স্থান পেতে থাকে। যা আস্তে আস্তে ইতিহাস হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। গ্রিক চিন্তার মধ্যে মানুষতার কর্মকাণ্ডের মধ্যে যা কিছু করে তাকে ধরে রাখার, তাকে স্মরণ করার যে চর্চা ছিল এটাই হিস্ট্রি,ইতিহাস ধারণার সারকথা।

২: বীরভোগ্যা ইতিহাস

বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে প্রায়ই ইতিহাসের খুটিনাটি নিয়ে খুনশুটি করবার মতন একটা প্রবণতা চলে আসে। সাতই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এই ব্যাপারটা আরও বেড়ে গেছে হুট করে। একধরণের ঐতিহাসিক শুদ্ধতার একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা প্রায়ই স্কোর সেটেল করার চেষ্টা করি- সাতই মার্চের ভাষণই স্বাধীনতার ঘোষণা ছিলো কিনা, সাতই মার্চের ভাষণের শেষে বঙ্গবন্ধু জিইয়ে পাকিস্তান বলেছিলেন কিনা, ঠিক কোন মাইক্রোসেকেন্ডে বঙ্গবন্ধুর মানসপটে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি স্বাধীনতার দাবি হয়ে উঠেছিল-এইধরণের খুটিনাটি নিয়ে আমাদের ইতিহাস আগ্রহীরা আর ইতিহাসবেত্তারা অনেক আলোচনা-প্রতিআলোচনা করতে লেগেছেন।
তবে যতই মজাদার-মশলাদার এই ধরণের আলোচনাকে মনে হোকনা কেনো-এই আলোচনার একটা বিচ্ছিরি সমস্যা আছে। এই লাইনের কথাবার্তার প্রধান ফলাফল হইলো গ্রেট মেন হিস্টরি স্টাইলে ইতিহাস লেখা যেইটা ইউরোপ পয়দা করসে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট মার্কা সম্রাটের সাম্রাজ্য টিকায়ে রাখার জন্যে আর সেইখান থেকে ইউরোপিয় কায়দায় শিক্ষিত হইয়া একাডেমিশিয়ান হয়ে সম্মান লাভ করতে আমরা পূর্বের লোকজনেরা টুকলিফাই করসি। এই এভিডেন্স বেইজড ইতিহাস রচনার স্টাইলের প্রধান সমস্যা হইলো এই যে এইটা এভিডেন্স বেইজড-খালি প্রমাণের হদিস রাখে, মননের হদিস রাখেনা।

আমরা এককালে যেমন গল্পে, মহাকাব্যে ইতিহাস রচনা করতাম-সেখানে আমরা ধইরাই নিতাম যে ইতিহাস একটা ন্যারেটিভ-একটা কাহিনীর মতন। সেটা এবসল্যুট কোন সত্যি নয়, তার মাঝে কিছুটা অবশ্যই লেখকের উদ্ভাবন। কিন্তু ইউরোপিয়ান একাডেমি আমাদের শিখায়ে গেলো যে ইতিহাস হইলো গোয়েন্দা রিপোর্টের মতন যা যা ঘটে গেছে তা তা টুকলিফাই করে ফেলার একটা ব্যাপার। ঝামেলা হইলো এই যে এই টুকলিফাইটুকুন মানুষে করে। আর প্রত্যেকটা মানুষেরই একটা মতাদর্শ থাকে, একটা শ্রেণীমূল থাকে, একটা পরিচয় থাকে আর সেই পরিচয় তার গোয়েন্দা রিপোর্টের মধ্যে না এসে পারেই না। একারণে সহিহ-ইউরোপিয়ান গ্রেট মেন ইতিহাসও কিন্তু এক ধরণের একটা গল্প লেখার কাজও করে। একটি এভিডেন্স থেকে আরেকটি এভিডেন্সের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটা টেক্সট দিয়ে ভরে দেয়ার চেষ্টা করে।

অথচ কে কোন এভিডেন্স দেখতেসে সেইটা নির্ভর করে সে কি দেখতে চাইতেসে তার উপর। আর ইউরোপিয় একাডেমির ক্ষেত্রে হিস্টোরি ইজ রিটেন বাই দ্য ভিক্টরস। কাজেই দেইখেন ওদের ইতিহাসে আমরা পূর্বের লোকজন কেমন আধামানুষ অমানুষ নামানুষ টাইপের কারণ ওরা অম্নেই আমাদের ভেবেটেবে আসছে আর তারপর তাদের সাদা চশমার ওইপারে যা দেখসে সেইটারেই এভিডেন্স বলে টুকলিফাই করসে। এই এভিডেন্স দেখার বায়াসটা কিন্তু না চাইতেও চলে আসতে পারে। অনেকসময় আমাদের আইডিওলজি আমাদের মাঝে এমনভাবে গেথে যায় যে আমরা টেরও পাইনা যে আমাদের মধ্যে দিয়ে আমাদের আইডিওলজি কাজ করে যাচ্ছে। কাজেই ইতিহাস, সে যতই কাষ্ঠল শুষ্ক হোক না কেনো, একটা কাহিনীমার্কা ব্যাপার।আর এই ন্যারেটিভ রূপটা আরও বেশি বের হইতে শুরু করে যখন শক্ত প্রমাণের অভাব দেখা দেয় অথবা কনফ্লিক্টিং প্রমাণাদি পাওয়া যায়। তখন আমাদের আবার ওই উক্তিকেই প্রমাণ হিসেবে ধরে নিতে হয়। ঘুরেফিরে সেই উক্তি বনাম উক্তির খরগোশের গর্ত।

এই পর্যায়ে চলে আসে ক্ষমতার দ্বন্দ। যার ক্ষমতা বেশি তার ন্যারেটিভ টিকে থাকে-যার ক্ষমতা কম তারটা ঝরে যায়। আর এই ক্ষমতার দ্বন্দের পাকে পড়ে এইধরণের ইতিহাস সাধারণ মানুষের (নন গ্রেট আওয়াম) এর ইতিহাসটাকে এড়ায়ে যায়। বঙ্গবন্ধু মার্চ মাসের কোনদিন কি ভাবতেসিলেন বা সাতই মার্চে ভাষন দেয়ার সময়ে সেইটাকে স্বাধীনতার ঘোষণা ভাইবা দিসিলেন কিনা, সেটাকে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন-কিন্তু এইটা দেখতেসেন না যে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের নিয়ন্ত্রক নন- তিনি ইতিহাসের অংশ। সেইসময়ে অনেক কিছুই হচ্ছিলো যেটা কারও নিয়ন্ত্রণে ছিলো না-কারো ইচ্ছায় হচ্ছিল না। অনেক কিছুই মানুষ করেছে সময়ের প্রয়োজনে। পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই। অনেক সময় মানুষ যেই মুজিবের আইকন ভেবে যুদ্ধ করেছে সেই মুজিব হয়তো বাস্তবের মুজিবের থেকে অনেক আলাদা। এই ধরণের একটা নুয়ান্সড ছবি আমরা পাই জহির রায়হানের গল্পে-যেইটাকে ইউরোপিয়ান স্টাইলড বাংগাল একাডেমিয়া ইতিহাস হিসেবে পাতে নিবেনা, কিন্তু আমি তবু আপনাদের পড়ে দেখতে অনুরোধ করি–

তাহলে কীসের জন্যে লড়ছি আমরা? বন্ধুরা নানাজনে নানারকম উক্তি করেছিল। কেউ বলেছিল,আমরা প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে লড়ছি। ওরা আমাদের মা-বোনদের কুকুর-বেড়ালের মতো মেরেছ তাই। তার প্রতিশোধ নিতে চাই। কেউ বলেছিল,আমরা আসলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছি। ওই শালারা বহু অত্যাচার করেছে আমাদের ওপর। শোষণ করেছে। ওদের তাড়াবার জন্য লড়ছি। কেউ বলেছিল,অতশত বুঝি না মিয়ারা। আমি শেখ সাহেবের জন্য লড়ছি। কেউ বলেছিল,কেন লড়ছি জান? দেশের মধ্যে যত গুণ্ডা,বদমাশ,ঠগ,দালাল,ইতর, মহাজন আর ধর্ম-ব্যবসায়ী আছে তাদের সবার পাছায় লাথি মারতে। ওদের কথাগুলো শুনছিলাম। ভাবছিলাম। মাঝে মাঝে আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে তর্ক করছিলাম। কিন্তু মন ভরছিল না। কিসের জন্যে লড়ছি আমরা? এত প্রাণ দিচ্ছি,এত রক্তক্ষয় করছি? হয়তো সুখের জন্যে। শান্তির জন্যে। নিজের কামনা-বাসনাগুলোকে পরিপূর্ণতা দেবার জন্যে। কিংবা,শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে।নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে। অথবা,সময়ের প্রয়োজন। সময়ের প্রয়োজন মেটাবার জন্যে। (সময়ের প্রয়োজনে, জহির রায়হান)

তাইলে আমরা যদি মুজিব কি ভাবসিলেন সেইটা নিয়ে সময় কাটাই-আমরা মুজিব কি ভাবসিলেন সেইটার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়তো সাধারণ জনগণ, সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা আর সাধারণ রাজাকারেরা কি ভাবসিলো সেইটা। সাতই মার্চের ভাষণ আসলে কি করসিলো সেইটা বুঝতে গেলে তাই আমাদের বুঝতে হবে যে জনগণের মনে সেইটা কি ধরণের এফেক্ট ফেলসিলো। সেই ইতিহাসটা আমাদের খুঁড়ে বাইর করতে হবে সাহিত্য, স্মৃতি আর আত্মজীবনীর মতন আনঅর্থোডক্স জায়গা থেকে কারণ মননের সালতারিখের লগ কোন সরকার রাখেনা। সেইদিন থেকে ইতিহাসটারে দেখতে চেষ্টা করলে হয়তো আমরা এই বিতর্কিত এবং খুটিনাটি নিয়ে বিতর্কযোগ্য ইতিহাসের ধারা থেকে বের হয়ে অন্যরকম একটা ইতিহাস লেখতে পারবো যেটা হাড্ডি কাষ্ঠল গোয়েন্দা রিপোর্টের মাঝে ইতিহাসকে আটকায়ে না রেখে একটা মানবিক ইতিহাস লেখতে বা বুঝতে আমাদেরকে সাহায্য করবে।

অবশ্যই আমাদের এপিস্টেমে প্রামাণিক খুটিনাটি সিধা করে নেয়ার একটা জায়গা আছে, কিন্তু সেটা মহাগুরুত্বপূর্ণ কোন জায়গা না। বঙ্গবন্ধু (বা জিয়া-চুজ ইওর পয়জন) স্বাধীনতার ঘোষণা দিসে আর সাথেসাথে বাঙালি যুদ্ধে ঝাপায়া পড়সে, এই অসত্য চিন্তাভাবনা থেকে আমাদের বের হতে হবে। একেক মানুষ একেক কারণে যুদ্ধে গেছে আর একেক জায়গায় একেক সময়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু আর শেষ হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস খুব সুন্দর আর জটিল একটা ইতিহাস। এটাকে সরকারী দিনতারিখ দিয়ে আর বাহান্ন ছেষট্টি ঊনসত্তর একাত্তরের মতন কয়েকটা সালে বেধে ফেললে আমাদের একটা বড়ো ভুল হবে। আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ সালতারিখ আর মহান লোকজনের অনেক নিচেরতলায় বসত করা আরেক ফাল্গুন আর জীবন থেকে নেয়া গল্পগুলো মিস করে যাবো। আমাদের ইতিহাস আমরা লিখে ফেলবো আমাদের কলোনাইজ করতে আসা ব্রিটিশ সাহেবদের ল্যান্ড সার্ভেমার্কা চোখ দিয়ে। আমাদের খাইষ্টা বাঙ্গাল চোখে আমাদের খাইষ্টা বাঙ্গাল ইতিহাস আমাদের দেখা হবেনা। সেইটা হবে খুব আফসোসের একটা ব্যাপার।

কাজেই যখনই আমরা ঐতিহাসিক বিতর্কে জড়াবো-আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে আমরা ইতিহাসকে কয়েকটা খুটিনাটিতে রিডিউস করে ফেলতেসি কি না। আবার বলি, খুটিনাটি সিধা রাখার দরকার আছে-বিশেষত যারা সেই খুটিনাটি থেকে রাজনৈতিক মাইলেজ বাইর করতে পারে তাদের তো মহা দরকার আছে, কিন্তু তারচেয়েও বেশি দরকার আছে খুটিনাটি হয়ে উঠতে পারে না এমন খুনশুটির ইতিহাসটাও জানার চেষ্টা করা (বিশেষত যারা রাজনৈতিক গাড়ি হাঁকানোর চেয়ে পথের সিনারি এপ্রিশিয়েট করতে বেশি আগ্রহী তাদের জন্যে)। নাহলে আমাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে নিজেদের জ্ঞান হবে আমাদের দেশ, জাতি আর ইতিহাস নিয়ে লেখা উইকিপিডিয়া আর্টিকেলের মতন। সেইরকম বুলেট পয়েন্ট মার্কা ইতিহাস নিয়ে ঘুঁটি হওয়া যায়, দাবাড়ু হওয়া যায়না। বুলেট পয়েন্ট মার্কা ইতিহাস লিখতে থাকলে আমাদের ইতিহাস হয়ে যাবে কেমন ক্ষমতাবানদের চিৎকারের দাপটের ইতিহাস। স্বরহীনদের যন্ত্রণার কথা সেখানে রয়ে যাবে অনুপস্থিত।

৩: জনগণতন্ত্রের ভবিষ্যত

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিত নিয়ে কমবেশী সবাই চিন্তিত, চলমান সংকটের অনিশ্চয়তা থেকে থেকে বেরুবার পথ স্পষ্ট নয়। স্পষ্ট নয় এই অর্থে যে, একেবারে প্রাথমিক উপায় হিসাবে সকলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নাই, কিম্বা দেখা যাচ্ছেনা। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যে আকার ধারণ করেছে, তাতে করে একটি নির্বাচন মোটেও কোনো অর্থপূর্ণ পরিবর্তন ঘটাবেনা। যদি ধরেও নেয়া হয়, অন্তত জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে এবং অর্থনীতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে আশু সমাধান নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা। তাও একমাত্র পূরণ হতে পারে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বাধ্য হলে কিম্বা বিদায় নিলে।

কিন্তু কখন একটা সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী মেনে নিতে অথবা চলে যেতে বাধ্য হয়? এই প্রশ্নের উত্তরে সহজেই যে কেউ বলবেন, জনগণের আন্দোলনের মুখে। জনবিক্ষোভ এবং গণবিদ্রোহে সরকারের পতন ঘটে এবং ফলশ্রুতিতে জনগণ নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়। আপ্ত বাক্যের মত এই কথা উচ্চারণ করলেও অনেক ক্ষেত্রে, আদতে এটা বলতে আসলে কি বুঝায়, এবং বাস্তবে কখন এরকম ঘটনা ঘটে অনেকের কাছেই তা পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশে ঠিক এই জায়গাটিই অনুপস্থিত, এটা বিরোধীদলের আন্দোলনে ক্রমশ প্রকট হয়ে ধরা দিচ্ছে। জনগণ কখন নতুন সরকার চায় এবং তার জন্য বিক্ষোভে ফেটে পড়ে? জীবন দিয়ে লড়ে? জনগণ এবং সরকার, তথা জনগণের সরকার— আধুনিক রাজনীতির এই দুটি মৌলিক ধারণা কিভাবে এবং কেন তৈরি হল এক নজর দেখে নেয়া যাক।

‘জনগণ’ নামক ধারণাটি আধুনিক রাজনীতির বিকাশে একটা বৈশিষ্ট্যসূচক মাত্রা নিয়ে হাজির হয় ফরাসি বিপ্লব থেকে। যাকে বলা হয় মাল্টিচুড বা মাসেস। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবার আগে, যখন বা যেখানেই মানুষের অসন্তোষ দানা বেধে বিক্ষোভ বা বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে, বলা হয় তা ছিল প্রতিকার চাইবার জন্য। যখন কোন শাসক অন্যায় ও অবিচারের মাত্রা ছাড়িয়ে যেত, নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করত তখন কোন একটা সম্প্রদায় বা পুরো একটা গোষ্ঠী বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে, সময়ে সময়ে বিদ্রোহ করে বসেছে। আর সেই বিদ্রোহের লক্ষ্য হতো নিপীড়ন থেকে পরিত্রাণ এবং অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া। এই চাওয়াটা থাকত, রাজা বা সম্রাটের কাছে। অন্যায়ের অবসান চাওয়ার বা পাওয়ার জায়গাটিও তখন পর্যন্ত ছিল খোদ রাজা, বা যিনি শাসন করছেন তার কাছে। ধর্মীয় বিশ্বাস বা প্রথাগত ন্যায়-নীতির যে ধারণা সে সমাজে প্রচলিত তার আলোকেই বিদ্যমান শাসকের কাছে, সেই শাসনব্যস্থার অধীনে প্রতিকার প্রত্যাশা করা হত। দাবী নিয়ে দরবারে হাজির হত। একারণে, যদি কখনো কোথাও বিদ্রোহ সরাসরি রাজার বিরুদ্ধেও পরিচালিত হত, তার লক্ষ্য ছিল ন্যায়ানুগ হতে দাবী জানানো কিম্বা একজন ন্যায়বান রাজাকে ক্ষমতায় আসীন করা, খোদ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন নয়। অর্থাৎ বিদ্রোহ শাসকের পরিবর্তন চাইলেও সরকার বা শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন ইস্যু হয়ে উঠেনি। শাসকের পরিবর্তন ছাড়িয়ে সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নে উপনীত হওয়ার এই জায়গা থেকেই আধুনিক রাজনীতির সূচনা। এটা যুগান্তকারী, তথা এটা নতুন যুগের আরম্ভ। জনগণ এখন আর কেবল বিদ্রোহ বা বিক্ষোভ সংগঠনকারী নয়, বরং সরকার প্রতিষ্ঠা করার কর্তা।

নিজেদের সরকার নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করার এই মুহূর্তকেই পশ্চিমে তথা আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে বিপ্লব বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। এটা একই সাথে, যেহেতু, রাজা ও রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাসহ জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার বাইরে থেকে তৈরি বা বহাল যাবতীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পদ্ধিতির অবসান, তাই নতুন রূপ ও কাঠামোরও প্রস্তাবনা। এখানে বিপ্লবী পরিবর্তন মানে, জনগণের নিজের সরকার—যা সে নিজে গঠন করে এবং যার বৈধতা তাকে প্রতিনিধিত্ব করার মধ্য থেকেই কেবল উৎসারিত। অর্থাৎ যতক্ষণ তা জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার ততক্ষণ তার বৈধতা স্বীকৃত, প্রতিন্ধিত্ব না থাকলে সেই সরকার বৈধ নয়। সরকারের রূপ এবং কাঠামো কি হবে, তার বৈধতা প্রায়োগিকভাবে কি প্রক্রিয়ায় হাসেল করতে হবে তা নির্ধারণের নীতিগত বন্দোবস্ত থেকেই গঠনতন্ত্র বা ‘সাংবিধানিকতার’ উদ্ভব।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিপ্লব বলতে আমরা আজকাল যে অর্থ বুঝি অথবা একটা বিশেষ ধরনের রাজনীতিকেই বিপ্লবের সাথে একাকার করে ফেলি, এখানে মোটেই তা বুঝানো হচ্ছেনা, অন্তত এই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থটা মোটেই তা ছিলনা। বরং আমরা পরিষ্কার তফাত দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এখানে আরো লক্ষণীয় বিষয় হল বিপ্লবের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য সরাসরি ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ বা নতুন একটি রাষ্ট্রের অভ্যূদয় ঘটানোও ছিলনা। না ফরাসি বিপ্লব না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধ— যাকে আধুনিক রাষ্ট্র বা বিপ্লবের প্রথম দুটি উদাহরণ ধরা হয়— কোনোটির বেলায়ই তা বলা যাবেনা। বরং আমরা দেখি যার পরিণতিতে এই দুটি রাষ্ট্র নতুন করে, নতুন ধরনের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠীত হয়েছে তার সূচনায় ছিল শাসনের অবসান ঘটিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা—যখন জনগণ নিজেরাই, নিজেদের অংশগ্রহণে নির্ধারণ করতে চেয়েছে কি ধরনের সরকার ব্যবস্থা তারা চায়।

পাশ্চাত্যে যেসব ইতিহাস ‘বিপ্লব’ বলে প্রতিষ্ঠিত নতুন সরকার গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন ধরণের রাষ্ট্র গঠনে তা পরিণতি লাভ করেছে।

এটা আগের মত আর কোনোভাবেই, রাষ্ট্র বা শাসকের সদাচরণ, নীতি-নিষ্ঠা এমনকি ন্যায়ানুগ থেকে শাসনকার্য পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। বঞ্চনা, অত্যাচার-অবিচার ক্ষোভ-বিক্ষোভের কারণ হিসাবে অবশ্যই বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটিয়েছে, কিন্তু তার অবসান কল্পে ভিন্নতর যে সমাধান বেছে নেয়া হয়েছে, সেখানেই গুণগত পার্থক্য। এর পর থেকে কেন্দ্রীয় বিবেচ্য বিষয় আর ন্যায়-অন্যায়ের অনুসরণ অথবা প্রথাগত বা স্বীকৃত আইনি অধিকার ভোগ করতে পারা না পারার প্রশ্ন থাকেনি। বরং এসমস্ত কিছুকে নিশ্চিত করার আবশ্যিক শর্ত বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে, জনগণের নিজের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

মনে রাখতে হবে, অধিকার বা মৌলিক অধিকারের ধারণা সুপ্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল, এবং এর প্রায় সবই একটি রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেও ভোগ করা যেতে পারে, যেত। উদাহরণত বলা যায়, ব্রিটিশ আইনশাস্ত্রবিদ ব্ল্যাকস্টোন মৌলিক অধিকার বলে যে তিনটিকে চিহ্নিত করেছেন: জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি’র অধিকার এবং এই তিনটি অধিকার থেকে জাত বা এগুলোকে পরিপূরণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় অপরাপর অধিকারের স্বীকৃতি ব্রিটেনের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেও ছিল; অথবা, ইসলামী আইনের উদ্দশ্য হিসাবে ইমাম গাজজালী যে পাচটি বিষয় (দ্বীন, জীবন, মেধা/চিন্তা, পরিবার এবং সম্পত্তি) সুরক্ষিত করাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন তাও সুলতানী শাসন কাঠামো কিংবা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেও যথেষ্ট পরিমাণে পালিত হতে পারে, হয়েছে।

তাহলে, আমরা দেখতে পাচ্ছি একেবারে নতুন ধারণাটি হচ্ছে, জনগণের সরকার তথা সরকারের রূপটি কেমন হবে তা নির্ধারণ এবং গ্রহণ করবার এখতিয়ার। এই এখতিয়ার আর সমস্ত অধিকার ভোগ এবং রক্ষণাবেক্ষণের উপায় মাত্র গণ্য করা যাবেনা। এটা একটি স্বতন্ত্র এবং স্বয়ংসম্পন্ন এখতিয়ার যা থেকে রাজনৈতিক সত্তার উন্মেষ ঘটে; এবং নিজেদের সামষ্টিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্র, রূপ কিম্বা কাঠামো নিরূপনের বৈধতা নিষ্পন্ন নয়। যখন তা আর থাকে না বা তার হানি ঘটে, তখন একটা-দুটো অধিকারের হানি ঘটেনা। খোদ রাজনৈতিকতার বিলয় ঘটে। যেকারণে রাজনৈতিকতা মাত্রই আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা, এই আত্মনিয়ন্ত্রণ মানে নিজস্ব-সরকার তৈরি করতে পারা। সেল্ফ গভার্নমেন্ট-এর এই ধারণাগত প্রত্যয় থেকেই আন্তর্জাতিক আইনে আত্মনিয়তন্ত্রণাধিকার বা সেল্ফ ডিটারমিনেশন যুক্ত হয়েছে।

রাজনৈতিকতা কোনো বিশেষাধিকার বা অপরাপর নাগরিক অধিকার ভোগের উপায় নয়। আজকাল আমরা যেমন শুনছি, ভোটের অধিকার আছে কি নাই। বিষয়টাকে যখন ভোটাভুটির দাবিতে আটকে সংকীর্ণ করে ফেলা হয়, তখন বিতর্কটাও মামুলি ভোটাধিকারের মামলায় পর্যবসিত হয়। শেষমেষ, বাংলাদেশে এখন যেমন এক পক্ষের কাছে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন আর মেয়াদ পূরণের যুদ্ধে গড়িয়েছে। অপর পক্ষের কাছে, ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ আর পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানানোর দুর্বল আন্দোলনে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কেন এটা দুর্বল থেকে যাচ্ছে, কেন এ দাবি থেকে বৃহত্তর আবেদন তৈরি হয়ে দুর্বার গণআন্দোলন সৃষ্টি হচ্ছেনা? এটা কি শাসক দলের হিংস্রতা, বোপরোয়া বলপ্রয়োগ ও আতঙ্কগ্রস্থ করে রাখতে পারার ফল? অস্বীকার করার উপায় নাই, এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন এবং এই পরিমানের রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের রাস্তা অন্যকোন সরকার গ্রহণ করে নাই। প্রকাশ্যে বুকে গুলি করার হুশিয়ারি, উসকানির মুখোমুখি দাড়িয়ে আন্দোলন করার বাস্তবতা এর আগে তৈরি হয়নি।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন কি জনগণ নিজের জীবন দিবে কেবল ভোটাধিকারের জন্য? বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচন কি আদৌ জনগণের সরকার নির্ধারণ ও গ্রহণ করবার যে আকাঙ্ক্ষা তার পরিপূরক? আমরা শুরুতে প্রশ্ন করেছিলাম, কখন জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে নিজের আকাঙ্ক্ষার সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য? এই যে আধুনিক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, যার ভিত্তি জনগণের রাজনৈতিক সত্তার উপলব্ধি, পরস্পর একত্রিত হয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়া। যা থেকে রাজনৈতিকতার শুরু এবং একই সাথে যা নিজেদের সম্মতিতে সরকার গ্রহণ করবার সূচনা বা চর্চার সমার্থক। জনগণের এই রাজনৈতিকতার সুরক্ষায়, এবং নিজেদের সরকার গঠন করবার গৃহীত ব্যবস্থাটি যখন ক্ষুন্ন হয় বা হয়েছে, তখনই গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। নিজেরা রাজনৈতিকভাবে গঠিত হওয়া এবং একই সাথে নিজেদের সরকার গঠন করার যুগপৎ প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় গাঠনিক ক্ষমতার(কন্সটিটুয়েন্ট পাওয়ার) প্রয়োগ। এটা কখনোই নির্বাচন দিয়ে ঘটেনা, একমাত্র গঠিত হয়ে যাবার পর সেই সুনির্দিষ্ট রূপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, যদি সত্যিকার অর্থে নির্বাচন জনগণের সরকার গ্রহণের চর্চাকে কার্যকর করতে পারে। কিন্তু যখন এটা ব্যর্থ হয়, ন্যূনতম সম্ভাবনাটুকুও তিরোহিত হয়, তখন অবশ্যম্ভাবীভাবেই গাঠনিক ক্ষমতাকেই আবার পুনরায় বিশুদ্ধ এখতিয়ার হিসাবে প্রয়োগ করতে হয়। এটা গণআন্দোলনের মাধ্যমেই সাধিত হয়।

প্রশ্ন হল, বাংলাদেশে সুস্পষ্টভাবে এই প্রয়োজন দেখা দিলেও রাজনৈতিকভাবে তা সেই অভিমুখে অগ্রসর হতে দেখা যাচ্ছেনা, কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বুঝা দরকার কেন এটা রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারছেনা। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ভঙ্গুর এবং বিপর্যস্ত বিরোধী দল হবার কারণেই তা ঘটছে বলে আমরা মনে করিনা। কারণ আমাদের প্রশ্নটির উত্তর সাংগঠনিক শক্তি, দক্ষ নেতৃত্ব বা নিপুণ কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারের বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পাল্টা বলপ্রয়োগ করে টিকে থাকার উপর নির্ভর করছেনা। এটা মূলত আন্দোলনের চরিত্র অর্থাৎ কখন একটা দাবি গণআকাঙ্ক্ষা ধারণ করে জনবিদ্রোহের সূচনা ঘটায়? সুনির্দিষ্ট করে বললে, কখন কোন দাবি গণবিস্ফোরণের সূত্রপাত করে, ফলত শাসকের পতন ঘটিয়ে জনগণ নতুন সরকার চায়?

আমরা দেখতে পাচ্ছি, আধুনিক রাজনীতির সূচনা বিন্দুতে ‘জনগণ’ নামক একটি সামষ্টিক কর্তাসত্তার উদ্বোধন ঘটেছে। এই সামষ্টিকতার অন্তর্গত একটা দিক হল কর্তৃত্ব, ক্ষমতা এবং আইনের নতুন বৈধতা নির্মাণ, আপরটি হল সমবায়িক জীবনের রূপটি কি হবে তা নিজেরা সম্মিলিতভাবে ঠিক করা—যার অভিব্যক্তি ঘটে স্বেচ্ছা-রূপান্তরের ঘটনায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। এর ভেতর দিয়ে একই সাথে আমরা দেখব রাষ্ট্রের ধারণাগত পরিবর্তন এসেছে। ফলত চরিত্রকেও বদলিয়ে দিয়েছে। বলা হয়ে থাকে, আগে শাসকের বা রাজার যে সর্বময় ক্ষমতা ছিল, যা নিরঙ্কুশ, নিরবিচ্ছিন্ন এবং নিজ সত্তার অন্তর্গত(ঐশ্বরিক উৎস হতে ন্যস্ত) তা এখন সমগ্রের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে, এক থেকে বহুতে বিস্তৃত হয়েছে। এতে রাজতান্ত্রিক কাঠামোর বদল ঘটেছে, রাজা উচ্ছেদ হয়েছে কিন্তু নিরঙ্কুশ এবং সর্বময় কর্তৃত্বের ভিত্তিটি বলবৎ আছে। যার মৌলিক অনুমানটি ‘সার্বভৌমত্ব’র ধারণায় নিহিত। যাকে ‘নির্দেশ প্রদানের সর্বোচ্চ ক্ষমতা’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

সরকার বিরোধী আন্দোলন বা সরকার পরিবর্তনের যে কোন আন্দোলনে, আমরা বাংলাদেশে আইনি রক্ষণশীলতা দেখতে পাই। উল্টো করে বললে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে যাতে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে তা ধাবিত না হয় সেই যুক্তির আমদানী দেখি। যেটা আদতে জনগণের অন্তর্নিহিত গাঠনিক ক্ষমতাকে গোড়াতেই অস্বীকার করে বসে। এটা ঠিক আন্দোলনের সাফল্য বা স্বক্ষমতায় উপনীত হতে পারা না পারার মামলা নয়। এটা মনে করে আন্দোলন হল শুধুমাত্র একটি সরকারের জায়গায় আরেকটি সরকারকে আনয়ন, নিয়োগ বা নির্বাচন করা। ফলে সবসময়ই তা নির্বাচিত সরকার মূলক দাবির মধ্যে আটকে থাকে। কেমন সরকার চাই সেই প্রশ্নে বা সেই সরকারের রূপরেখা কেমন হওয়া দরকার তা নির্ধারণ করার দিকে অগ্রসর হয় না। প্রশ্নটি জনগণ কেমন সরকার চায়, অর্থাৎ কেমন সরকার হলে পরে তাদের সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষার রূপায়ন হতে পারে?

এই প্রশ্নটা এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য মুখ্য বিষয়।কেমন জনগণতন্ত্র আমরা চাই তার দ্বারা নির্ধারিত হয় কি কি অধিকারের বঞ্চনা আমরা বোধ করছি;এবং কি কি অধিকার নিশ্চিত করতে চাচ্ছি।সেটা কি রূপের মধ্য দিয়ে করবো তার সাথে সরকারের রূপটা নির্ভর করে।একারণে,আধুনিক রাজনীতির বিকাশ বা উদ্ভবকালে কেন্দ্রীয় বিবেচ্য বিষয় ছিল সরকার।যার তাৎপর্যপূর্ণ অভিব্যক্তি ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।সেখানে পরিষ্কার ঘোষণা আছে যে,মানুষের একটি শাশ্বত প্রাকৃতিক অধিকার আছে,কেমন সরকার সে চায় তা নির্ধারণ করার।ফলে কেমন সরকার তারা চান তার দাবির মধ্যে দিয়ে এ বিদ্রোহটা সংঘটিত হয়েছিল।প্রশ্নটা ছিল ফর্ম অব গভর্নমেন্ট।কি প্রকৃতির সরকার হলে বা সাংবিধানিক ব্যবস্থা থাকলে পরে এই এই অধিকারগুলো—এই এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারে।বাংলাদেশেও আমরা এখন ‘কেমন সরকার চাই’ এই প্রশ্নে আছি।কিন্তু আমরা দেখছি এই কেমন সরকার চাওয়ার দাবিটার পেছনে যে নীতিগত দিক আছে,তা নিয়ে বিরোধী শিবিরের কাছে কোন বক্তব্য নাই।‘কেমন সরকার আমরা চাই’ -এই প্রশ্নটার উত্তর বা আমরা এমন একটা সরকার করব যার ফলশ্রুতিতে এই যে একটা বৃত্তের মধ্যে আমরা আবর্তিত হচ্ছি এখান থেকে আমরা বের হতে পারব।এটা এখন বাংলাদেশের রাজনীতির মুখ্য বিষয়।যারা এটা সামনে নিয়ে আসতে পারবেন এবং এটাকে কেন্দ্র করে যারা সংগঠিত হবেন,আমরা মনে করি তাদের জন্য খুব দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন হবে না।

বিরোধী শিবিরের সংকট শুধু সাংগঠনিক নয়,তার সাথে আদর্শিক সংকটও আছে।দুই দলের স্বার্থের জায়গা বা অন্যান্য বিষয়গুলোতে খুব বেশি ফারাক নাই।যদিও আওয়ামী লীগের একটা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রকল্প আছে,কিন্তু বিপক্ষ শিবির এই দিক থেকে প্রায় দিশাহীন। তারা কি চায়, কি করবে, এটা কাউকে বুঝাতে পারছে না। তারা নির্বাচন চাচ্ছে,তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাচ্ছে, এর পরে আর কি চাচ্ছে? এ বক্তব্য তাদের কাছে নাই।

ফলে আমরা মনে করি বর্তমান বিরোধী শিবিরের যে ব্যর্থতা, এটা যতটা না সাংগঠনিক তার চাইতেও বেশি রাজনৈতিক, এবং দার্শনিক। এখানকার বাস্তবতায় বাংলাদেশে যেকোন অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করতে প্রাথমিক প্রশ্নটিই হবে ‘কেমন সরকার চান?’ সেই উত্তর দেয়া।

কেমন নির্বাচন চাই তা দিয়ে অন্তত গণআন্দোলন হবে না। নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে দিয়ে স্বরহীনদের মুক্তি আসবে না। স্বরহীনদের স্বরায়নের গণআন্দোলন করতে গেলে জনগণের রাজনৈতিক কর্তাসত্তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের অংশীদারিত্বের বোধ তৈরি করতে হবে, তাদের মাঝে স্বরহীনদের স্বর শোনবার প্রচেষ্টা ও আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে হবে আর বীরভোগ্যা ইতিহাসের বৃত্ত থেকে তাদেরকে বের করে আনতে হবে। তা করা না গেলে এই দেশে জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে যাবে। একের পর এক ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক দলের আবর্তে ঘুরতে থাকবো আমরা।

কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত জনগণতান্ত্রিক সরকার গঠন করার যে আশাবাদ সামরিক শাসনামলে তৈরি হয়,নব্বইয়ের এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও যার একটা আবেদন ছিল তার পরিণাম সকলের কাছে এখন স্পষ্ট।একথা এখন নিশ্চিত করেই বলা যায়। নিছক নির্বাচনের দাবীদাওয়া গণআন্দোলন সৃষ্টির মত কোন আবেদন আর আদৌ তৈয়ার করতে পারছেনা,পারার কথা নয়।কেবলমাত্র, রাজনৈতিক ঐক্য রচনা,এবং ঐক্যবদ্ধ সেই মৈত্রী আগামীতে কোন কোন মূলনীতির উপর স্থাপিত হয়ে নবরূপে একটি সরকার গঠন করতে চায়,তার দ্বারাই জনগণের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিকতা পুনরুদ্ধারে অংশীদার হবার শর্ত তৈরি করবে।

ইতিহাসের কর্তৃত্ব যদি আমাদের হাতে নিতে হয় তবে আমাদের রাষ্ট্রকে পুননির্মান আমাদের করতে হবে একেবারে গোড়ার থেকে। জনগণতন্ত্রের অধিকার এবং স্বরহীনদের শ্রবণের চাহিদা গড়ে তুলতে হবে তৃণমূল পর্যায়ে। জনসমাজে মহান ত্রাতার অপেক্ষার বদলে শক্তিশালী ও গণমুখী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলবার প্রচেষ্টা গড়ে তুলতে হবে। তবেই দেশে ধীরে ধীরে জনগণতন্ত্র স্থাপিত হবে। হুট করে একটি নির্বাচন জিতে যাওয়ার চাইতে এই কাজটি অনেক বেশি অজাকজমপূর্ণ, কঠিন ও সময়সাপেক্ষ-তবে দীর্ঘমেয়াদী বদল চাইলে এই দূরূহ লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই আমাদের এগুতে হবে।

 

লেখকঃ মুসতাইন জহির ও অনুপম দেবাশীষ রায়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই রচনায় সর্বজনতন্ত্রকে Republic এর এবং স্বরহীনকে Subaltern এর পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য কোন লেখক বা চিন্তক অন্য কোন অর্থে এই শব্দগুলোর ব্যবহার করলে তার সাথে এই রচনার কোন যোগ নেই।

লেখার শুরুতে দেয়া ছবিটি বিনায়ক চতুর্বেদী সম্পাদিত একটি বইয়ের প্রচ্ছদ। যারা সাবঅল্টার্ন/ পোস্টকলোনিয়ালিজম নিয়ে আরও জানতে চান তারা দেখতে পারেন।

 

Facebook Comments
Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *